মানবিক সম্পর্ক

মানুষ সর্বদা দলবদ্ধ ও সামাজিক জীব। তাই আসঙ্গ লিপ্সা মানুষের আজন্মের অভিলাষ। একাকিত্বে মানুষের যন্ত্রনা অনেকগুণ বেড়ে যায় এবং মানুষ ক্রমাগত অসুস্থ হয়ে পড়ে। এজন্য মানুষ একের পর এক সম্পর্ক গড়তে থাকে। তবে সম্পর্কগুলি মানুষের মধ্যে চিরস্থায়ী নয়, মানুষ সম্পর্ক ভাঙ্গে আবার নতুন করে গড়ে তোলে। এভাবে ভাঙ্গা গড়ার স্রোতধারাই জীবনের বহমানতা এবং চির সত্য।

আসলে সম্পর্কগুলি বহতা নদীর মত, সে কখনও সুমধুর তালে বয়ে যেতে থাকে আবার মাঝে মাঝে বাঁক নেয়। তাই জীবনের ঘাঁটে ঘাঁটে এর পরিবর্তন সাধিত হয়। আবার কখনও নতুনত্বের বিচিত্র রূপ নিয়ে সে আপন গতিতে বয়ে চলে। এই বয়ে চলার মধ্যে কোন কোন ঘাঁটে থাকে সংস্কারের জোয়ার আবার কোন কোন ক্ষেত্রে জীবনের জোয়ার। আবার সম্পর্ক প্রবাহের বুকে কখনও সোনার তরী ভেসে বেড়ায় যেখানে তরিখানা অসংখ্য ধনে ভরে থাকে আবার কখনও সেখানে হতাশার ছবিচিত্র জেগে থাকে। এটা মানুষে মানুষে সম্পর্কের স্বাভাবিক রূপ। জন্ম থেকেই মানুষের জীবনের আকাশে সম্পর্কগুলি মেঘের মত এসে এসে জমা হতে থাকে, তার মধ্যে কোন সম্পর্কে কার আগ্রহ বেশি তা দিয়ে তৈরি হয় তাঁর জীবনের গল্প।

প্রথমে ঘর থেকেই সম্পর্কগুলির পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়। তারপর বিশাল পৃথিবী জুড়ে মানুষের সম্পর্ক কখনও ভেঙ্গে যায় আবার কখনও জেগে থাকে। কারণ মানুষ সবার আগে পারিবারিক তারপর সামাজিক । তবে যে সম্পর্ক জেগে থাকে নতুন করে তার পরিবর্তন সাধিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। যদি তার পরিবর্তন না ঘটে তাহলে সে মৃত হয়ে যায়, যে মৃত সম্পর্ক নিয়ে মানুষ চিরদিন ধরে বেঁচে থাকতে পারেনা। কারণ ক্রমাগত বদলের মধ্য দিয়ে মানুষ বর্তমান থেকে ভবিষ্যতে যায়। এই বদলের মধ্যেই থাকে সম্পর্ক ভাঙ্গা গড়ার মন্ত্র, আবার কখনও কখনও প্রয়োজন। জীবনের একটা সময় প্রায় সকল মানুষই পার করে যখন সম্পর্ককে সে স্বার্থের কারনে টিকিয়ে রাখে, আবার কখনও অভ্যাসের কারনে, কখনও কখনও মনুষ্যত্বের কাঁধে ভর করে রক্তের বন্ধনে সম্পর্ক টিকে থাকে।

কখনও কখনও মানব চরিত্রে মনুষ্যত্ব ও ভালবাসা দ্বৈত রূপে প্রকাশিত হয়। দেখা যায় মানুষের ভালোবাসার আকুতি দু-একটা সম্পর্কে থাকলেও অধিকাংশ সম্পর্কেই ভালোবাসা ক্ষণিকের জন্য জন্মে আবার তা আকস্মিক ভাবেই শেষ হয়েও যায়। তাই ভালবাসাহীন সম্পর্কের মাঝে থাকে লেফট রাইট করার প্রবণতা যা মানুষকে অনেকটা একঘেয়ে করে রাখে এবং সুযোগ পেলেই যে সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়। আবার কখনও তা জেগে থাকে  শুধুমাত্র মনুষ্যত্বের কারণে এই টিকে থাকা সম্পর্কের কোন কোন ক্ষেত্রে দায় থাকে কিন্তু দায়িত্ববোধ সেখানে অনুপস্থিত। এ থেকে প্রমাণিত হয় মানুষের ভালবাসার সম্পর্কটি গড়ে ওঠে ক্ষণিকের জন্য। যখন কোন কোন ক্ষেত্রে মানুষকে দীর্ঘ মেয়াদী ভালোবাসায় আপ্লূত করে রাখে তখনই মানুষ হয়ে ওঠে অতিমানব।

মানুষের প্রতি ভালোবাসা অনুভব করাই মানবিকতার লক্ষণ। তাই সম্পর্ক সবসময়ই মানবিক হওয়া বাঞ্ছনীয় বলে আমরা মনে করি। পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবই ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্কের সোপান, সব সম্পর্কই ভাঙতে পারে আবার সব সম্পর্কই নতুন করে মানুষ গড়তে পারে। তবে সম্পর্কের একটি মেয়াদ থাকে। এই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন ও পরিবর্তিত রূপে মানুষ মানুষের কাছে আসতে সক্ষম, নাহলে মানবিক সম্পর্ক মরে যায়। মরে যাওয়া সম্পর্ককে কেউ নতুন করে বাঁচিয়ে তুলতে পারে না, কেবল পরিবর্তনের ভেতর দিয়েই আবার মরে যাওয়া সম্পর্কটি নতুন প্রভাতের মত এসে মানুষের চোখে আলো দেয়, আশা দেয়। আসলে আমরা পরিবর্তনশীলতায় বিশ্বাসী। জীবন ও আশা পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল, যেখানে পরিবর্তন নেই সে জায়গাটি মানুষ বাদ দিয়ে সামনে চলে যায় অন্যকোনদিকে, যেখানে মানুষ পরিবর্তনের জোয়ার অনুভব করে। অপরিবর্তনীয় জায়গাটি অচলায়তনের মত একা পড়ে থাকে যাকে মানুষ কখনই কামনা করে না।

মানুষ আশা নিয়ে বেঁচে থাকে। আশা সমাজ জীবনকে পূর্ণ করে তুলতে পারে। বেঁচে থাকার আশা জীবনকে করে গতিশীল, মোহময়। পৃথিবীতে মানুষের বেঁচে থাকার আকুতিই মানুষে মানুষে সম্পর্ক সৃষ্টির মহান উদ্দেশ্য। সম্পর্কগুলো আবর্তিত ও পরিবর্তিত হতে থাকে মানব সমাজের সাংস্কৃতিক নিয়মে। সম্পর্ক নানা কারণে পরিবর্তিত হতে পারে । যেমন বাংলাদেশে যে মেয়ের বিয়ে হয়না সে বাবার বাড়ির মমত্ব হারিয়ে ফেলে, কারণ বিয়ে হওয়া মানে তার প্রতিষ্ঠা পাওয়া। আর মেয়েটি প্রতিষ্ঠা পায়নি বলেই এই কঠিন সত্য তার সম্মুখে এসে হাজির হয়। যদিও ধীর গতিতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার নিয়মের পরিবর্তন ঘটছে কিন্তু সব সমাজে সব দেশে এখনও এই নিয়ম বলবত আছে, মানে পরিবর্তন ঘটেনি। যে পরিবারটিতে তার জন্ম হয়েছিল সময়ের স্রোতে তার চরিত্রের পরিবর্তন ঘটেছে। সময় এবং সম্পর্ক একই সুত্রে ঘূর্ণয়মান, একে অতিক্রম করা যায়না। আর সম্পর্কের বাঁক এভাবেই ঘুরে মরে।

সম্পর্ক কখনও মধুর হয়, কখনও দ্বন্দ্বময় হয়, কখনও আধিপত্যময়, কখনও শত্রুতা মূলক হয়, আবার কখনও বন্ধুত্বের হাতছানিতে অসম্ভব সুন্দর হয়ে যায়। আধিপত্য মানব জীবনের এবং সম্পর্কের আর একটি বিষয়। মানুষ বেঁচে থাকার মধ্যে চায় একটি সুন্দর সম্পর্কের ভীত। পরিবার যদি আধিপত্য প্রধান হয় তবে বেঁচে থাকার মধ্যে সুখের বদলে তিক্ততা দর্শনীয় হয়ে ওঠে বেশি। আধিপত্যের রূপ বিভিন্ন ধারায় মানুষের মধ্যে বাসা বাঁধে। যেমন স্বামী আধিপত্য বিস্তার করে স্ত্রীর উপর। পিতা মাতা উভয়ের আধিপত্য সন্তানের উপর। সন্তানের আধিপত্য অপেক্ষাকৃত দুর্বল লোকটির উপর। অর্থাৎ সবল মানুষটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল লোকটির উপর আধিপত্য বিস্তার করে থাকে। তবে এই আধিপত্য বিস্তারের মধ্যেও কখনও ভালবাসা থাকে যেমন সন্তানের প্রতি মানুষের ভালবাসা অমোঘ।

এভাবে যতদিন মানুষ একের উপর অন্যে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে ততদিনই সম্পর্ক একটি করে নাম নিয়ে টিকে থাকে। যখন সময়ের পরিবর্তনে একের প্রতি অন্যের আধিপত্য ম্লান হয়ে আসে তখন সম্পর্কটাও ফিকে হয়ে আসতে থাকে। আধিপত্যও ফিকে হয় সময় ও জীবনের পরিবর্তনের সাথে, তারপর মানুষ দূরে সরে যেতে  থাকে। একে বলা যেতে পারে আধিপত্যময় সম্পর্ক।

গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় এই আধিপত্যময় সম্পর্কের মধ্যে একটি স্বার্থের স্পষ্ট রেখা ফুটে থাকে। যে মানুষ কাউকে সম্পর্কের দ্বারা নির্ভরশীল করে রাখে সে আধিপত্যের মালিক, আর যে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য, সমাজের জন্য কারো উপর নির্ভর করে থাকে, তখনকার সময়ের জন্য সে অপেক্ষাকৃত দুর্বল। দুজনেরই সম্পর্কটা সেই সময়ের জন্য মূলত স্বার্থের কারনে টিকে থাকে।

স্বার্থ ছাড়া সম্পর্ক হয়না। যেমন মা বাবার সাথে মানুষের সম্পর্ক থাকে উভয়ের স্বার্থের সম্পর্ক। কথাটা শুনে অনেকেই চমকে যাবে। বলবে মা বাবার চেয়ে নিঃস্বার্থ সম্পর্ক হয়না, এর মধ্যে কোন স্বার্থের ব্যাপার নেই, কিন্তু আসলে তা নয়। আমরা দেখেছি বাবা মায়ের সন্তানদের মধ্যে যে বেশি প্রতিভাবান তাঁর প্রতি তাদের আকর্ষণ বেশি। এটা স্বার্থের বহিঃপ্রকাশ, কারণ ঐ সন্তানটি তাঁদেরকে সমাজের প্রশংসা ও প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। এক কথায় মা বাবা সন্তানকে লালান পালন করার কারণ হল নিজের ছায়া তারা সন্তানের মধ্যে দেখতে পায় এবং একটি শিশুকে মানুষ করে তোলার মধ্যে একটি নির্মল আনন্দ অনুভুব করে। এটা মানব সত্তার একটি বৈশিষ্ট্য এবং এক ধরণের স্বার্থ। আর সন্তান অসহায় অবস্থায় মা বাবার কাছে যে আশ্রয় পায় তেমন নির্ভরশীলতার আশ্রয় পৃথিবীর কোথাও নেই। কিন্তু সন্তান বড় হয়ে একসময় নিজের জীবনের চাপে মা বাবা থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যেতে থাকে। তারপর এক সময় বাবা মার আবেদন ফুরিয়ে যেতে থাকে তখন কেবল ভালবাসা দিয়ে আর মানবতা দিয়ে অনেকেই সেই সম্পর্ককে সৌন্দর্য মণ্ডিত করে রাখতে পারেনা। এটা একধরনের স্বার্থপরতা।

সময় অনুসারে সম্পর্কের রূপের ভিন্নতা প্রকাশ পায়। এমনতর ভিন্নতাই বলে দেয় কোনটি মানুষের স্বার্থ আর কোনটি নিঃস্বার্থ সম্পর্ক। নিঃস্বার্থ সম্পর্ককে খুঁজে মরা যায় কিন্তু কোথাও পাওয়া যায় না। হয়তো যেখানে পূর্ণ মানুষের বাস সেখানে পাওয়া যেতে পারে। যেমন মানুষ জানে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শ্রেষ্ঠ, একে অন্যকে ছাড়া জীবনের পথে চলতে পারে না। এ সম্পর্কটি মূলত ভালবাসার সম্পর্ক। অথচ স্বার্থান্ধ মানুষেরা এটাকে প্রথার মধ্যে বেঁধে ফেলেছে। তাই স্বামীর আধিপত্য স্ত্রীর উপর এমন ভাবে বর্তে থাকে যা অনেক সময় স্ত্রী গ্রহণ করতে পারে না। স্ত্রীর বেঁচে থাকার স্বার্থ সেই সম্পর্কের মধ্যে নিহিত থাকে বলে স্ত্রী পায় স্বামীর কাছে সংসারে ভালভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। এই নিশ্চয়তা যদি রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারে তাহলে বিয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় মানুষের সংস্কারগুলি পাল্টে যেতে থাকে আর ঘন ঘন বিবাহ বিচ্ছেদ দেখা দিতে থাকে। কারন তখন স্ত্রীকে আর স্বামী নামক প্রভুর দায় মেনে নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। যা মানুষের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়, যেখানে স্বামীস্ত্রীর মধ্যে সুসম্পর্কের কোন দায় থাকেনা, আর সেখানেই পাওয়া যায় প্রকৃত সম্পর্কের বিষয়টি। আবার যে সম্পর্কগুলো নির্দ্বিধায় মৃত্যু পর্যন্ত টিকে থাকে সেখানে ভালবাসাও থাকে এবং স্বার্থও থাকে। ভালবাসা মানে একের প্রতি অন্যের প্রকৃত প্রেম ও নির্ভরতা বেশি থাকে, আর স্বার্থ মানে দুজন দুজনার কাছে এত অভ্যস্ত হয়ে যায় তখন তারা মনে করতে থাকে এত সহমর্মিতা হয়ত পৃথিবীর আর কোথাও নেই। যখন মানুষ একের প্রতি অপরে গভীর মমতা ও স্বচ্ছন্দ নির্ভরতার আবেদন অনুভব করে এবং একে অন্যের উপস্থিতি জীবনের জন্য অনিবার্য বলে মনে করতে থাকে তখন সম্পর্কটি হয়ে যায় সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকার অভিপ্রায়। তবে বিয়ের ভুমিবিস্তারে স্বামীস্ত্রীর সম্পর্কের সাথে পরবর্তী প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাই মূলত মানুষের কাছে বড় হয়ে দেখা দেয়, তাই ভালোবাসার সম্পর্কের চেয়ে দৈহিক সম্পর্কটাই হয়ে যায় মুখ্য। দেহকে ঘিরেই তখন ভালবাসা জন্ম নেয়। আসলে দৈহিক সম্পর্কই হল মানব সমাজ টিকিয়ে রাখার একটি ব্যবস্থা। মানব ধারা টিকে থাকার জন্যই মানুষের জৈবিক সম্পর্ক যা সকল যুক্তির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিতে পৃথিবীতে টিকে থাকে এবং সমাজকে টিকিয়ে রাখে। তাই সম্পর্কটি জটিল হলেও এই সম্পর্কটি মানব সমাজের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও আকাঙ্ক্ষিত।  বন্ধুত্ব একটা মধুর সম্পর্কের দিক নির্দেশক। যে সম্পর্কটি শুরু হয় সমমনা দুটি মানুষের একই রকম ভাবনার মধ্য দিয়ে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের ধারায় দুটি মানুষ আর সমমনা থাকেনা, বিভিন্ন কারণে বন্ধু দুজন এক সময় দুরকম ভাবতে শুরু করে। তখন বন্ধুত্বের সম্পর্কটি পানসে হয়ে যায় এবং তা ভেঙ্গে যেতে বাধ্য হয়। কারণ বন্ধুত্বের কংকাল বহন করা মানুষের কাছে ভীষণ ভাবে ওজন দায়ক ও অসহনীয় মনে হতে থাকে। মানুষ বিশ্বাস করে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্বার্থহীন সম্পর্ক। কখনও কখনও তা হলেও  সকল ক্ষেত্রে তা নয়। কোন কোন ক্ষেত্রে স্বার্থই হয়ে ওঠে বন্ধুত্বের মুখ্য বিষয়। সে ক্ষেত্রে যতক্ষণ স্বার্থ থাকে ততক্ষণই সম্পর্ক থাকে তারপর অন্য কোথাও মানুষ বন্ধুত্বের হাতটি বাড়ায়। যার কারণে বন্ধুত্বের সম্পর্ক একসময় ভেঙ্গে যায় আবার নতুন বন্ধুত্ব তৈরি হয়। এভাবে সম্পর্ক গুলি আপন গতিতে ও অস্তিত্বে একজন থেকে আর একজনে ক্রমাগত ভাবে প্রবাহিত হয়। এই সম্পর্ক প্রবাহকে মানব প্রবাহের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। সম্পর্ক প্রবাহিত হয় বলেই পৃথিবীতে মানব ধারা টিকে আছে। পৃথিবীর মানব ধারার মধ্যে সম্পর্ক যেমনি গুরুত্বপূর্ণ তেমনি স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্বার্থান্ধতা কোনক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটা দুর্বল মানুষের প্রতি সবল মানুষের অন্যায় করার অভিসন্ধি। যদি এক শ্রেণী ক্রমাগত লাঞ্ছিত হতে থাকে তাহলে সেখানে ধীরে ধীরে শত্রুতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে । মানুষে মানুষে শত্রুতার সম্পর্ক কখনও কাম্য নয়।

পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই মানবিক সম্পর্ক রক্ষা করতে হয়।  আর সম্পর্কের জন্যই মানুষের চরিত্রে মানবিকতা বেশি বেশি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে দুইপক্ষকেই মানবিক হতে হয় এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট হতে হয়। একপক্ষ সম্পর্কের ব্যাপারে নির্বিকার থাকলে আর একপক্ষ সেই সম্পর্ককে ধরে রাখে না । মানুষের মধ্যে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে সম্পর্কটি নতুনত্ব পায়, কিন্তু যদি পরস্পরের প্রতি কোন শ্রদ্ধাবোধ না থাকে তখন মানবিক সম্পর্কটিও ধীরে ধীরে নিঃশেষ হতে থাকে। সম্পর্কগুলির সর্বদাই পরিচর্যা প্রয়োজন। পরিচর্যা ছাড়া কোন সম্পর্কই টিকে থাকতে পারেনা। পরিচর্যার মাধ্যমেই মানবিক সম্পর্ক টিকে থাকে। মানবিক সম্পর্কই  মানুষের একমাত্র সাধনা। নির্লিপ্ততা কোন সম্পর্কের ধারক নয়। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে মানুষের জীবন ধারার পরিবর্তন হয় এবং তার সাথে সাথে মানুষের সম্পর্কগুলোরও পরিবর্তন ঘটিয়ে সে বেঁচে থাকে। পরিবর্তন মানুষকে নেশার মত আকৃষ্ট করে। তাইতো আধুনিক জীবনের সম্পর্কগুলো পরিবর্তিত হয়ে সুন্দর ও মানবিক রূপ গ্রহণ করুক এটাই মানুষের কাম্য।

লিখেছেনঃ রোজানা নাসরীন, টরন্টো

দাম্পত্ব্য সম্পর্কে ক্ষমতার ভারসাম্য

সম্পর্কের গুরুত্ব যার কাছে কম তার হাতেই বেশি ক্ষমতা চলে আসে। এই সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে একে অপরের প্রতি বিশ্বাসেই।

সম্পর্কের মধ্যে ‘ক্ষমতা’ শব্দটাকে টেনে আনতে আমরা কেউই পছন্দ করি না। একটা সুস্থ সম্পর্কে থাকবে একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা এবং সব কিছু ভাগ করে নেওয়ার আশ্বাস। কিন্তু সহযোগিতা এবং শেয়ার, এই দুটো করতেই তো দু’জন মানুষকে লাগে। দু’জনের মধ্যে একজন যদি সেটা না করতে চায়?

আসলে সম্পর্কের গুরুত্ব যার কাছে কম তার হাতেই বেশি ক্ষমতা চলে আসে। অন্যজন যতই ভালবাসাকে বেশি প্রাধান্য দিক। ডিনারের প্ল্যান থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ কোনও বিষয়, সবই যদি একজনের সিদ্ধান্ত মতো চলে তাহলে মুশকিল! অন্যজনের অসম্মতির যেন কোনও অর্থই নেই! এর ফল?

সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাটা শুধুমাত্র একজনের দখলে থেকে যায়। হয়তো না চাইতেই সে অন্য জনের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে, যে তার মতামতের কোনও গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা নেই।

সম্পর্ককে ধরে রাখতে এই সমস্যার সমাধান কিন্তু করতে হবে ধৈর্য্য ধরে। কীভাবে?

  • প্রথমত যেটা করতে পারেন তা হল পার্টনারের এই স্বভাব মেনে নেওয়া। তার সিদ্ধান্তগুলোই মেনে চলা। এতে সাময়িকভাবে সমস্যার সমাধান হয়তো হবে, পাওয়া যাবে কিছুটা সহযোগিতার আশ্বাস। তবে দীর্ঘদিন এইভাবে চলা নিশ্চয়ই সম্ভব নয়। ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙবেই। নিজেকে গুরুত্বহীন করে রাখতে কেউ কত দিন পারে?
  • দ্বিতীয়, সহযোগিতা পাওয়ার জন্য লড়াই করা। এতে কিন্তু দুটো ফল হতে পারে। আপনার পার্টনার যদি নিজের ভুল বুঝতে পারেন, তাহলে তো সমাধানও আপনারা পেয়ে গেলেন। কিন্তু তিনি যদি ভাবেন যে আপনি অকারণে ঝগড়া করছেন? তাহলেও কিন্তু বেশি আঘাত পাবেন আপনিই।
  • এতেও সমাধান না হলে স্পষ্ট করে অন্যজনকে বলে দিন যে তিনি আপনার পাশে না থাকলেও আপনি নিজের কাজ নিজে করতে সক্ষম। আসা করা যায় এতে আপনার পার্টনার নিজের ভুল বুঝবেন। তবে আপনি নিজে যদি এই সম্পর্কের উপর খুব বেশি মানসিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে থাকেন তাহলে হয়তো এই কাজটা আপনি নিজেই করে উঠতে পারবেন না।

তবে কি কোনও সমাধান সত্যিই নেই এই সমস্যার? আছে। আর সেটা লুকিয়ে আছে আপনাদের দু’জনের ভিতরেই। একে অপরের প্রতি বিশ্বাসে।

একটি সম্পর্কে যখন দু’জন দু’জনকে বিশ্বাস করেন তখন কোথাও না কোথাও এই বিশ্বাসটাও থাকে যে তাঁরা একে অপরকে ছেড়ে যাবেন না। দু’জনের উপরেই প্রভাব ফেলবে এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন অন্যজনের ছোট-ছোট প্রয়োজন এবং ইচ্ছেগুলোকেও গুরুত্ব দেবে, থাকে এই বিশ্বাসও।

মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তো শুধু ‘ক্ষমতা’য় সীমাবদ্ধ নয়। বন্ধুত্ব, ভালবাসা, সম্মান এই সবের কাছেই হেরে যাবে ক্ষমতার লড়াই।


পছন্দের পার্থক্য

দু’জন আলাদা মানুষের মধ্যে যে পছন্দের পার্থক্য থাকবে এ তো স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু অনেক সময় এর থেকেই আসে মতবিরোধ। কিন্তু খেয়াল মতবিরোধ যেন ঝগড়ার আকার না নেয়।

সম্বন্ধ হোক বা অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ, নিজের সঙ্গী এবং নতুন জীবন নিয়ে সকলের মনেই একটা স্বপ্ন থাকে। তবে অনেকসয়মই মনের মিল হলেও দেখা য়ায় সঙ্গীর সঙ্গে নানা বিষয়ে পছন্দের পার্থক্য রয়েছে। বিয়ের দিন যত এগিয়ে আসে, নতুন জীবন শুরু করার আগে সঙ্গীকে নিয়ে কনফিউশন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে দু’জনের মধ্যে যদি পছন্দ অপছন্দের পার্থক্যটা বেশি হয় তাহলে তা আরও বড় হয়ে দেখা দেয়।

সাব্বির আর ফারজানার গল্পটাই ধরুন না। বিয়েটা ঠিক হয়েছিল সম্বন্ধ করেই। তারপর দু’জনেই একবছর সময় চেয়ে নেয় মেলামেশা করার জন্য। দু’জনের পরিবারেরও সকলেই এই সম্পর্কে খুশি। কিন্তু একটা সমস্যা ফারজানাকে প্রায়ই ভাবিয়ে তোলে। সাব্বিরকে তাঁর এমনিতে খুবই পছন্দ। হ্যান্ডসাম চেহারা, ভাল চাকরি, সুন্দর পার্সোনলিটি। কিন্তু ফারজানার সঙ্গে তাঁর পছন্দের আকাশপাতাল তফাৎ। ফারজানার পছন্দ লেটেস্ট বলিউড মুভি। আবার সাব্বির ভালবাসে থিয়েটার, নাটক। ফারজানা কন্টিনেন্টাল ডিশ প্রেফার করে। সাব্বির আবার বাঙালি কিংবা মোগলাই খানা ছাড়া মুখেই তুলবে না। বিয়ের পর ফ্ল্যাট উত্তরা হবে নাকি বসুন্ধরা, সেখানেও মতবিরোধ। ফলে টুকটাক ঝামেলা লেগেই থাকে। যদিও ঝগড়া মিটেও যায়। কিন্তু রিয়ার প্রশ্ন, ছোটখাট সব বেশিরভাগ বিষয়ে যদি মতের অমিল হয়, তাহলে সারা জীবন একসঙ্গে কাটানো যে মুশকিল! এদিকে বিয়ের দিন ক্রমশ এগিয়ে আসছে।

•  আমাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা, মতামত নিয়েই গড়ে ওঠে আমাদের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব। এই ব্যক্তিত্বই আকর্ষণ করে অন্য ব্যক্তিত্বকে। আপনার প্রিয় মানুষটির স্বাতন্ত্রর জন্যেই তো তাকে ভালবাসেন। সেই নিজস্বতাকে বাদ দিয়ে মানুষটিকে তো কল্পনাই করা যায় না। সেইজন্যে যাঁকে ভালবাসেন তাঁর ভালমন্দ সব মিলিয়েই বাসুন। তবে তার মানে কিন্তু আপনার পছন্দ অপছন্দ বিসর্জন দেওয়া নয়। নিজেদের ব্যক্তিগত পছন্দের সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা সম্পর্ক বজায় রাখার একটা প্রধান শর্ত। আপনার সঙ্গী যদি সেটা না বোঝেন, তা হলে একটু কৌশলী হওয়ার দায়িত্ব আপনার উপরেই বর্তাবে। তবে একটা মানুষকে বদলে ফেলার চেষ্টা করলে ভুল করবেন।

• যখনই কোনও পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ভাববেন, তখন একবার সঙ্গীর মতামত নিন। ওঁর মতামতকে গুরুত্ব দিন। এভাবে যদি আপনি ওঁর পছন্দ-অপছন্দকে মেনে চলেন। তা হলে উনিও আপনার মতামতকে গুরুত্ব দেবেন। ফলে নিজেদের মধ্যে অশান্তিও কমে যাবে।

•  নিজেকে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ও আপডেটেড রাখার চেষ্টা করুন। তা হলে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার সপক্ষে যুক্তিটা ভাল করে সাজাতে পারবেন। প্রয়োজনীয় তথ্য থাকলে অন্যকে কনভিন্স করতে সুবিধে হবে।            

•  নিজের পছন্দ-অপছন্দ কখনও জোর করে আপনার সঙ্গীর উপর চাপাবেন না। ওঁকে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করার স্বাধীনতা দিন। এরপর যদি উনি আপনার উপর কিছু চাপিয়ে দিতে যান, তা হলে নিজের উদারতার কথা মনে করিয়ে দিন।

•  খাওয়াদাওয়া, জামাকাপড়, বেড়াতে যাওয়া, এইসব সিদ্ধান্ত ,সবসময় নিন সঙ্গীর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে। তাহলে দুজনে মতামতই গুরুত্ব পাবে। একজন হুকুম করছেন, অন্যজন সেই হুকুম মেনে চলছেন, সিচুয়েশনটা যেন কখনই এরকম না হয়।

•  আপনার সঙ্গী যদি আপনাকে ডমিনেট করতে চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁর সঙ্গে তর্কাতর্কিতে না গিয়ে একটা ছোটখাট চুক্তি করে নিন। একে অন্যের কথা মেনে চলা এবং নিজের স্বাধীন মতামতের মিশেল দিয়ে তৈরি করুন আপনাদের চুক্তির শর্ত। পুরো ব্যাপারটা সিরিয়াস পর্যায়ে টেনে না গিয়ে, একটা মজার আবহে রাখুন। এতে কাজ বেশি হবে। 

প্রথম দেখা, প্রথম কথা

যাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন, তাঁকে কোনওদিন দেখেননি! কিছুই জানেন না তাঁর ব্যাপারে। মনের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বশে রেখে বরং উপভোগ করুন মুহূর্তগুলোকে।  গল্পগুজবের ফাঁকে চিনে নিন পরস্পরকে। এটাই ব্লাইন্ড ডেট-এর সার্থকতা সেখানেই।

সম্পূর্ণ অচেনা-অজানা একজন মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ।  অবশ্য এ আবার যে-সে সাক্ষাৎ নয়, একেবারে ব্লাইন্ড ডেট! তবে ব্লাইন্ড ডেট-এর সঙ্গে আর পাঁচটা ডেট-এর তফাৎ হল, এক্ষেত্রে আপনি উলটোদিকের মানুষটির ব্যাপারে কিছুই জানেন না।  মনের মধ্যে এক ধরনের চাপা উৎকণ্ঠা আর উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করাই দায়! সাধারণত, বন্ধুবান্ধব বা পরিচিতরাই আয়োজন করেন এ ধরনের ডেট।  তবে, ডেটিংয়ে পৌঁছে আপনার অনুভূতি কীরকম হবে, সে নিশ্চয়তা কেউই দিতে পারবেন না! তা বলে কি ব্লাইন্ড ডেটে যাবেন না? অন্তত একবার তো এরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতেই পারেন। শুধু মাথায় রাখুন কয়েকটি বিষয়:

  • কোনও প্রত্যাশা নিয়ে যাবেন না। যদি ভাবেন আপনার স্বপ্নের মানুষটিকে আপনি খুঁজে পাবেন, তাহলে আশাহত হতে পারেন।  আপনার প্রিন্স চার্মিংয়ের কথা ভেবেছেন আর বাস্তবের মানুষটি একেবারে আলাদা হতে পারে।
  • কথাবার্তার শুরুতেই উলটোদিকের মানুষটার সম্পর্কে কোনও ধারণা তৈরি করে ফেলবেন না। কারও ব্যাপারে সম্যক ধারণা তৈরি করতে একটা ব্লাইন্ড ডেট মোটেও যথেষ্ট নয়। তবে গল্পগুজবের মাধ্যমে একটা প্রাথমিক ধারণা তৈরি হয়েই যাবে।  তার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিন ভবিষ্যতে আবার এই লোকটির
  • সঙ্গে দেখা করবেন কি না। মনে রাখবেন, প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যেই কিছু না কিছু ইন্টারেস্টিং এলিমেন্ট থাকে। সেই ছোট ছোট দিকগুলো উপভোগ করার চেষ্টা করুন।
  •  যদি মনে হয় একেবারে ভুল লোকের সঙ্গে ডেটিং করে দিনটাই মাটি হয়ে গেল, তাহলেও আফশোস করবেন না। খাওয়াদাওয়া, ড্রিংক উপভোগ করুন।  আগে থেকেই ঠিক করে নিন কোনও নতুন রেস্তরাঁয় যাবেন, কোনও নতুন ডিশ ট্রাই করবেন।  যদি খুব বোরিং লাগে, তাহলে সংক্ষিপ্ত কথায় সেরে ফেলুন।
  • একেকজন মানুষের ব্যক্তিত্ব একেক রকমের।  হতেই পারে যে উলটোদিকের মানুষটির সঙ্গে
  • প্রেম সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি অন্য নানা বিষয়ে বেশ খোঁজখবর রাখেন। তাহলে সেই বিষয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করে তোলার সুযোগটা হারাবেন না যেন।  বন্ধুত্ব রাখা যেতেই পারে।
  •  অতিরিক্ত খাবার গ্রহন করে ফেলবেন না। আর সেন্স অফ হিউমার বজায় রাখা দু’পক্ষের জন্যই জরুরি।

স্বামী এবং বন্ধুত্ব

পাঁচবছর প্রেম করার পর দিয়া বিয়ে করে সৌরভকে। এমবিএ-র টিউশন ক্লাসে প্রথম আলাপ। তারপর দু’জনে চাকরি পেয়ে যাওয়ার পর, বিয়ে। কিন্তু সম্পর্কটা বড্ড তাড়াতাড়ি বদলে গেল। সৌরভ কর্পোরেট জগতের সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে অনেক উঁচুতে পৌঁছে গেল। কিন্তু দিয়ার এই ইঁদুর দৌড়ের জীবন বেশিদিন ভাল লাগল না। চাকরি ছেড়ে নিজের বুটিক খুলল দিয়া। এই ব্যবসার সূত্রেই আলাপ নির্মাল্যর সঙ্গে। ও পেশায় ফোটোগ্রাফার।  কাজের সূত্রেই বন্ধুত্ব গাঢ় হয়েছে। কিন্তু কখনও কখনও দিয়ার খুব অনুশোচনা হয়। দিয়া ভাবে ও কি ঠিক করছে? স্বামীকে কি ও ঠকাচ্ছে? এই বন্ধুত্বের পরিণতিই বা কী?

জীবনের অনেক ক্ষেত্রে আমরা এই ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হই। কমিটেড রিলেশনে থেকে বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব নিয়ে আমাদের মধ্যে নানা টানাপড়েন কাজ করে। অনেক সময় এই বন্ধুত্বই কোনও রিলেশনে ঝগড়া, মনোমালিন্য, সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এইসব ক্ষেত্রে মাথা গরম না করে ঠান্ডা মাথায় ডিশিসন নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

আসলে সংসারের বাইরে ফ্রেন্ড সার্কল থাকা খুব প্রয়োজন। স্কুল কলেজের পুরনো বন্ধু, প্রতিবেশি, অফিস কোলিগ বা অন্য কেউযাঁর সঙ্গে সময় কাটাতে আপনার ভাললাগে তিনিই আপনার বন্ধু। বন্ধুত্ব সাংসারিক একঘেয়েমি থেকেও মুক্তি দেয়। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ ঘটায়। হতেই পারে আপনার বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ পুরুষ। হয়তো অন্যদের থেকে আপনারা একে অপরকে বেশি বোঝেন। একে অন্যের সমস্যাগুলো গভীরভাবে অনুভব করেন। এই সম্পর্কে অপরাধবোধের কোনও জায়গা নেই। কিন্তু এই সম্পর্ককে বন্ধুত্বের পর্যায়েই রাখুন। এমন কিছু করবেন না যা নিয়ে পরে অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়তে হয়। আপনার দাম্পত্যের প্রাইভেসির মধ্যে বন্ধুকে না ঢোকানোই ভাল। ভবিষ্যতে অশান্তি হতে পারে। বন্ধুর ব্যাপারে স্বামীকে কখনও অন্ধকারে রাখবেন না। সম্পর্কের খঁুটিনাটিতে না গিয়ে বন্ধুর ব্যাপারে ওঁকে জানিয়ে রাখুন।

• আপনার স্বামী এবং বন্ধু দুজন সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। দুজনেরই নির্দিষ্ট কিছু দোষগুণ রয়েছে। হয়তো আপনার স্বামীর কোনও ঘাটতি রয়েছে যা বন্ধুর মধ্যে নেই। এই গুণের জন্যে তাঁকে অ্যাডমায়ার অবশ্যই করবেন কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও মনে রাখুন যে এর জন্যে কোনও মানুষ পুরোপুরি খারাপ হয়ে যান না। তাছাড়া স্বামীর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন পরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং সন্তান। নতুন বন্ধুত্বে এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো মনে রাখবেন।

• স্বামীর সঙ্গে আপনার বন্ধুর আলাপ করিয়ে দিন। হয়ত ওরাও একে অপরের বন্ধু হয়ে উঠবেন। বন্ধুর পরিবারের সঙ্গেও ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলুন। ছুটির দিনে নিমন্ত্রণ, একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার মতো অ্যাক্টিভিটি দুই পরিবারকে কাছাকাছি আনবে।

সঙ্গীর সন্তানই প্রায়োরিটি

যাঁকে মনে ধরেছে, তিনি হয়তো কারওর মা কিংবা বাবা। তা বলে প্রেমে বাধা কোথায়! প্রেমিক বা প্রেমিকার সন্তান থাকলেও দিব্যি সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন। শুধু সন্তানকে প্রায়োরিটি দেওয়া জরুরি।

কে ভবিষ্যতের সঙ্গী হিসেবে ভেবে নিয়েছেন, হতেই পারে তিনি একটা সময়ে বিবাহিত ছিলেন! আর তিনি হয়তো এক বা দুই সন্তানের মা কিংবা বাবা।কিন্তু এসবে কি আর প্রেম আটকায়! যাঁকে মনে ধরেছে, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করবে, সেটা স্বাভাবিক। আর সেই ইচ্ছের সৌজন্যেই নিয়মিত ডেটিং। কফিশপে, রেস্তরাঁয়, লং ড্রাইভে…সঙ্গী সেই বিশেষ বন্ধুটি। কিন্তুটি তাঁর সন্তানকে তো অগ্রাহ্য করলে চলবে না! তিনিও তা চাইবেন না। হ্যাঁ, নিজেরা কিছুটা সময়ে একান্তে কাটাতেই পারেন। 

কিন্তু একই সঙ্গে জরুরি হল হবু সঙ্গীর সন্তানকে আপন করে নেওয়া। সন্তান-সহ কাউকে ডেট করার আগে কয়েকটা বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। আপনি হয়তো আগ্রহী তাঁর ছেলে বা মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে! তবে উত্তেজনায় খুব তাড়াহুড়ো করে ফেলবেন না। আগে নিজেকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করুন। সাধারণত, এই পর্যায়ে এসে ক্যাজ়ুয়াল ডেটিংয়ের ইচ্ছে আপনার সঙ্গী প্রকাশ করবেন না।তিনি যদি আপনাকে জীবনসঙ্গী নির্বাচন করবেন বলে ভাবেন, তা হলে আপনারও প্রয়োজন নিজেকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করে তোলা। শুধুমাত্র প্রেমিক বা স্বামী নয়, সম্পর্কের অব্যবহিত পর থেকেই আপনাকে বাবা-মা বা কেয়ারগিভারের দায়িত্ব সামলাতে হবে। 

আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, সেই দায়িত্ব নিতে আপনি তৈরি তো! বাচ্চাটির সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। একজন নতুন মানুষকে সে তার জীবনে জায়গা করে দিতে চলেছে—এর প্রতিক্রিয়া এক একটি বাচ্চার এক একরকম। তাই, ওর মনোজগৎটা বোঝা একান্ত দরকার। ডেটিংয়ের জায়গা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সন্তানকে প্রায়োরিটি দিতে হবে। কোনও কিড-ফ্রেন্ডলি কাফে বা পার্কে যেতে পারেন। ডেটিংয়ের যাবতীয় পরিকল্পনা শেষ মুহূর্তে বাতিলও হতে পারে! সৌজন্যে সন্তানের শরীর খারাপ বা পরীক্ষার চাপ। সেরকম পরিস্থিতির জন্যও তৈরি থাকতে হবে। সঙ্গীকে ভালবাসার অর্থ এখানে তাঁর ছেলেমেয়েকেও সমান ভাবে ভালবাসা। আর এটি সচেতন সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই সম্ভব। উনি যদি তাঁর প্রাক্তন স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে সন্তানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কারণে যোগাযোগ রাখেন, তা হলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন না। 

যদি কোনও কারণে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়, সেক্ষেত্রে সঙ্গীর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলুন, সন্তানের সামনে নয়।সন্তানের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আপনার সঙ্গী ও তাঁর প্রাক্তন নিতেই পারেন। কিন্তু প্রাক্তনের সঙ্গে তিনি ঠিক কতটা সম্পর্ক রাখবেন, সে ব্যাপারে পারস্পরিক সিদ্ধান্তে আসা চাই। সুত্রঃ সানন্দা

সম্পর্কে জেলাসি

কোথা থেকে যেন উড়ে এসে জুড়ে বসেছে ঈর্ষা আপনাদের সম্পর্কের মাঝে। অনেক সময় অতি মাখোমাখো দাম্পত্যের মধ্যেও প্রায় ঘুণপোকার মতো হানা দেয় ঈর্ষাভাব। যা ক্রমশই সম্পর্কে তিক্ততা আনে। দু’জনের সম্পর্কে ঈর্ষার সমস্যা হলে কী করবেন? 

নতুন সম্পর্ক শুরু করার সময় দু’জনকেই কিছুটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। দুটো মানুষ তো দু’রকম হবেনই। এক ছাদেক নীচে মানিয়ে থাকার প্রথম ধাপ অ্যাডজাস্টমেন্ট। কাউকে হয়তো একটু বেশি করতে হয়, কাউকে কম। কিন্তু সবচেয়ে কাছের মানুষটির কাছ থেকে সেই ত্যাগস্বীকারে মূল্য পাওয়া যায় না, উলটে সকলেই তাঁর সাফল্য, তাঁর কেরিয়ার নিয়েই প্রশংসায় মেতে ওঠেন তখন নিজের অজান্তেই সেই মানুষটার প্রতি বিদ্বেষ জন্মাতে পারে। আর থেকই আসে জেলাসি। আসলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের নানা জটিলতার মধ্যে একটি অবশ্যই একে অপরকে হিংসা।

সঙ্গীর সাফল্য বা চরিত্রের কোনও একটি দিক সম্বন্ধে নেতিবাচক চিন্তা জমে জমেই এই হিংসার জন্ম। এতে মিশে থাকে কিছুটা বঞ্চনার দুঃখ এবং হয়ত কিছুটা অভিমানও। এই নেগেটিভ ইমোশন খুব দ্রুত তার কুপ্রভাব ছড়িয়ে দেয় শরীর-মনে এবং দাম্পত্য পরিণত হয় শুধুমাত্র এক মামুলি নিয়মরক্ষার খেলায়।

‘মানছি আমার স্বামী আমার থেকে অনেক বেশি কেরিয়ারিস্টিক, অনেক বেশি সফল। কিন্তু আমিও তো ফ্যামিলির জন্যে, বাচ্চার জন্যে অনেক ত্যাগস্বীকার করেছি। পড়াশোনায় ভাল হওয়া সত্ত্বেও কেরিয়ারে মন দিতে পারিনি। সত্যি কথা বলতে গেলে, আমার এফর্টের জন্যে আজ ও এত সফল, আমাদের মেয়ে পড়াশোনায় এত ভাল আর সংসার এত সহজে চলে। কিন্তু সবাই কেন ওর প্রোমোশন, ওর কেনা নতুন গাড়ি, ওর লাইফস্টাইল নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে। মেয়েও তো বাবা বলতে অজ্ঞান। আমার পরিশ্রম, আমার খাটনি নিয়ে তো কেউ ভুলেও কোনও মন্তব্য করে না। মাঝে মাঝে মন হয়, সব ছেড়েছুড়ে চলে যাই, তাহলেই সব বুঝবে মজা!’ আচ্ছা আপনার কী মাঝে মাঝেই এরকম মনে হয়? আপনার সবচেয়ে কাছের প্রিয় মানুষটিকে অজান্তে হিংসা করেন না তো? আপনার মনের কোণে স্বামীর সাফল্য, জনপ্রিয়তা বা অন্য কোনও কারণবশত  বিদ্বেষ জমা হচ্ছে না তো?

• নিজের মনের মধ্যে একবার উঁকি দিয়ে দেখুন তো, সমস্যাটা সত্যি কোথায়। আপনার স্বামীর কি সত্যিই দোষ আছে না আপনার মনের কোনও জমে থাকা ক্ষোভ সম্পর্কটা জটিল করে তুলছে। অনেকসময় হেরে যাওয়া বা জনপ্রিয়তা হারাবার ভয় থেকেও জেলাসি জন্ম নেয়। নিজের কাছে সত্‌ থেকে  ভাবনাচিন্তা কাটাছেঁড়া করলেই কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল সহজেই বুঝতে পারবেন।

• স্বামীর সাফল্য ভাগ করে নিন। ওঁর সাফল্যে যে আপনিও অংশীদার সেটা ভুলে যাবেন না। দুজনে মিলে একসঙ্গে এনজয় করুন।

• সিন ক্রিয়েট করবেন না। ছেলেমেয়ের সামনে তো নয়ই। স্বামী-স্ত্রী মধ্যে মতানৈক্য হওয়া স্বাভাবিক কিন্তু তাই নিয়ে কটূক্তি বা কাদা ছোড়াছুড়ি কুরুচির পরিচয়। এর আশ্রয় নিলে আপনি স্বামী এবং সন্তানের চোখে অনেকটাই ছোট হয়ে যাবেন।

• আপনার স্বামীর সঙ্গে একটা আউটিং অ্যারেঞ্জ করুন। বাচ্চাদের সঙ্গে না নেওয়াই ভাল। যেখানে আপনাদের প্রথম দেখা হয়েছিল, যেতে পারেন সেই জায়গায়। সাংসারিক চিন্তাভাবনা ভুলে গিয়ে আগের মতো দুজনে আড্ডা দিন। কথায় কথায় গল্পচ্ছলে নিজের মধ্যে চেপে রাখা কষ্টগুলো ওঁকে জানান। বুঝিয়ে বলুন আপনি ঠিক কীভাবে ওঁকে পেতে চান। ধীরে ধীরে আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে দূরত্বটা কমিয়ে আনার চেষ্টা করুন।

• নিজেকে আর একটু ব্যস্ত করে তুলুন। বাড়ির কাজকর্ম, ছেলেমেয়েদের তদারকি করা ছাড়াও যে বাইরে একটা বিশাল জগৎ আপনার জন্যে অপেক্ষা করে আছে, তার দিকে একটু চোখ ফেরান। পছন্দের কোনও হবি আবার নতুন করে শুরু করতে পারেন বা পার্ট টাইম চাকরিও নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে সাহায্য করবে। বাড়িতে বসে ছোটখাট হোম বেসড বিজ়নেস শুরু করতে পারেন। তাহলে মনের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে আত্মবিশ্বাসও বাড়বে।

অতীত সম্পর্ক এবং …

পুরনো প্রেমিকা বা স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কে ইতি টেনেছেন। অথচ মাঝেমধ্যেই আপনার জীবনে ঘুরে ফিরে আসছে সেই অনুষঙ্গ। হঠাত্‌ আপনার সঙ্গে যদি তাঁর দেখা হয়ে যায় আবার? তাও আবার বর্তমান সঙ্গীর উপস্থিতিতে! রইল পরিস্থিতি সামলানোর কিছু টিপস।

আমাদের অনেকের জীবনেই ‘এক্স’ সত্যিই একটা বড় ফ্যাক্টর! প্রেমের বা দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে গেলে এতদিনের খুব কাছের মানুষটা যখন প্রাক্তন বা ‘এক্স’ হয়ে যায়, তখন সম্পর্কের সমীকরণগুলোও খুব দ্রুত বদলাতে থাকে। নতুন সম্পর্ক তৈরি হলেও কোথাও একটা ফাঁকা জায়গা বোধহয় থেকেই যায়। সময়ের নিয়মে আপনি ও আপনার পুরনো সঙ্গী দু’জনেই যদি অন্য কাউকে বিয়ে করে নেন, তাহলেও একে অপরকে পুরোপুরি ভুলে যাওয়া অনেক সময় সম্ভব হয় না। আসলে, সম্পর্কে ইতি টানলেই যে মাথা থেকে পুরনো সঙ্গীকে ঝেড়ে ফেলতে পারেন না অনেকেই। আর পুরনো কারওর জায়গায় যদি নতুন কেউ আসে, তখন নতুন সেই সম্পর্কের উষ্ণতায় পুরনো দিনগুলো ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করে। 

কিন্তু হঠাত্‌ করে যদি কোনওদিন দেখা হয়ে যায় পুরনো প্রেমিকা বা স্ত্রীর সঙ্গে? অনেকেই এধরনের সিচুয়েশনের জন্য তৈরি থাকেন না বলে রীতিমতো এমব্যারাসড হয়ে পড়েন। অনেক সম্পর্ক শেষ হয় তিক্তভাবে। প্রেমে প্রতারিত হয়ে বা তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতির কারণে যদি আপনার ব্রেক আপ হয়ে থাকে, তখন পুরনো সঙ্গীটির প্রতি চাপা রাগ থেকেই যায়। হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে রাগের বহিঃপ্রকাশ আপনি আর নাও করতে পারেন। তবে পুরনো প্রেমিকের সঙ্গে দেখা হলে মাথা ঠান্ডা রাখাই শ্রেয়। আপনার বর্তমান সঙ্গীকে পুরনো সম্পর্কের ব্যাপারে খোলাখুলি জানাবেন। উনি যদি সত্যিই আপনাকে বিশ্বাস করেন তবে এ ব্যাপারে জানলেও তিনি আপনাকে ভুল বুঝবেন না। প্রাক্তন স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্স বা সেপারেশনের কারণটাও তাঁকে খোলাখুলি জানান। 

এমনটাও তো হতে পারে, আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার বর্তমান স্ত্রীর সঙ্গে আপনার পুরনো প্রেমিকা বা স্ত্রীর দেখা হয়ে গেল! ‘প্রাক্তন’ সিনেমার সেই দৃশ্যটার মতো! যেখানে ট্রেনের কামরায় উজানের বর্তমান স্ত্রীর সঙ্গে হঠাত্‌ই দেখা হয়ে যায় তাঁর প্রাক্তনের। বাস্তবে, এরকম অবস্থায় পুরনো সম্পর্কের কথা লুকোলে বর্তমান সম্পর্কের উপর তার অনর্থক প্রভাব পড়তে বাধ্য। কোনওদিন রাস্তায় বা শপিং মলে দেখা হলে হাসিমুখে তাঁর সঙ্গে বর্তমান সঙ্গীর আলাপ করিয়ে দিন।

Relationship ও কিছু জরুরী পরামর্শ!

কম-বেশি সবাই বলে থাকে, ‘সম্পর্কগুলো আগলে রাখা খুব কঠিন!’ তবে প্রকৃতপক্ষে এ কথাটি সত্য নয়। এটি কখনোই জটিল বা বেদনাদায়ক নয়। বরং একটি সুন্দর ও সাবলিল সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য আপনার ভালোবাসার প্রতি একটু সচেতনতা ও পজিটিভ মানসিকতাই যথেষ্ট। সাধারণত আমরা সবাই অলস প্রকৃতির। আমরা মনে করি, আমাদের সম্পর্কগুলো জাদুকরী তৈলাক্ত মেশিনের মতো করে আপনাআপনি ভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। আসলেই কি তাই? না, যেকোনো সম্পর্কই সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হলে আপনার সম্পর্কের প্রতি ভালোবাসা ও যথেষ্ট দায়িত্বশীল হতে হবে। নিচে নারীদের জন্য ‘রিলেশনশীপ’ সম্পর্কিত কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যা আপনার সম্পর্ককে করবে সুখময়।

নিজেকে ভালোবাসুনঃ নিজেকে ভালো রাখতে হলে সবচেয়ে বেশি যেটা জরুরি সেটা হলো, ‘নিজেকে ভালোবাসা’। আপনি নিজেকে যদি ভালো না বাসেন তাহলে নিজেতো ভালো থাকতে পারবেন‘ই না! এমনকি অন্য কাউকেও ভালো রাখতে পারবেন না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন,

“ভালো থাকার জন্য নিজের প্রতি করুণা ও মায়া দেখানোটা খুব বেশি জরুরি। এই জন্য অপরকে ভালোবাসার আগে নিজেকে নিয়ে ভাবুন। নিজেকে অপরের মতো ভালোবাসতে শিখুন। তবেই আপনি ভালো থাকবেন।”

আর যখন আপনি নিজেকে ভালোবাসতে ও ভালো রাখতে চাইবেন তখন স্বাভাবিকভাবেই আপনি নিজের প্রতি অনেক যত্নবান হবেন। এমনকি নিজের সম্পর্কের প্রতিও। যা আপনার ভালোবাসার মানুষটিকে আরও ভালোবাসতে সহায়তা করবে, গড়ে উঠবে একটি সুন্দর সম্পর্ক।

আবেগ, মানসিকতা ও শারীরিক সম্পর্কের সমন্বয় নিশ্চিত করুনঃ ‘আবেগ, মানসিকতা ও শারীরিক সম্পর্ক’ একটি সম্পর্কের মাঝে এ তিনটি জিনিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ তিনটি জিনিসের সমন্বয়েই আপনি আপনার সম্পর্কটিকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারবেন। আপনি যদি কেবল শারীরিকভাবে আপনার সঙ্গীর সাথে সংযুক্ত থাকেন, কিন্তু মানসিকভাবে দূরত্ব বজায় রাখেন এবং সম্পর্কের প্রতি কোনো আবেগ বা মোহ না থাকে তাহলে সে সম্পর্কটি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। অথবা আপনি যদি শুধু মানসিকভাবে তার সাথে সংযুক্ত হতে পারেন কিন্তু সম্পর্কের প্রতি কোনো আবেগ বা শারীরিকভাবে কোনো চাহিদা না থাকে তাহলে সে সম্পর্কটিও ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে ধাবিত হবে। তাই সম্পর্কটির সমস্তক্ষেত্রে আপনাদের মাঝে দৃঢ় বন্ধন থাকতে হবে।


আপনার সঙ্গীকে যথেষ্ট সময় দিনঃ আমরা সবাই জানি, আমাদের প্রত্যেকেরই একটি নিজস্ব জীবনধারা রয়েছে, ব্যক্তি স্বাধীনতা রয়েছে। এমনকি এটাও জানি যে, আমরা কখনো একা একা খুব বেশি সময় কাটাতে পারবো না। তাই বিভিন্ন প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে আমাদের বিভিন্ন ব্যক্তিদের সাথে সময় ব্যয় করতে হয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে, আপনি আপনার সঙ্গীকে যথেষ্ট সময় দিচ্ছেন তো? কারণ, শত ব্যস্ততার মাঝেও দিন শেষে প্রিয় মানুষটির সান্নিধ্য না পেলে নিজেকে বড্ড বেশি নিঃসঙ্গ মনে হয়।

তাই সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশে প্রিয় মানুষটির প্রতি মনোযোগ রাখাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার প্রতি মনোযোগ হারালে ধীরে ধীরে একটা সময় হয়তো আপনার সম্পর্কটিই হারিয়ে যাবে। তাই সবকিছুর মাঝেও আপনি আপনার জীবনসঙ্গীকে প্রতিনিয়ত সময় দিন। তাকে কখনো সঙ্গীহীনতা অনুভব করতে দিবেন না। বাসার বাহিরে থাকাকালীন ফোন কল অথবা টেক্স ম্যাসেজের মাধ্যমে কন্টাক্ট রাখুন। বাসায় এলে বিভিন্ন গল্প-গুজব, খুনশুটিতে মাতিয়ে রাখুন। এতে করে আপনাদের সম্পর্কটিও থাকতে সজিব ও প্রাণবন্ত।

পছন্দের প্রফেশনের যোগ্য জীবনসঙ্গী খুঁজতে

ভিজিট করুন বিবাহবিডি ডট কম আমাদের সার্ভিস সম্পর্কে জানতে ও ফ্রী রেজিষ্ট্রেশন করতে এই লিংকে আসুন

বিস্তারিত জানতেঃ ০১৯২২ ১১ ৫৫৫৫  এ কল করুন

তার কথাগুলো মন দিয়ে শুনুনঃ সাধারণত আমরা সবাই মনে করি যে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা শ্রোতা হিসেবে অনেক এগিয়ে। প্রকৃতপক্ষে এটি সত্য নয়। যেকোনো সমস্যা সমাধানে নারীদের তুলনায় পুরুষরা বেশি ধৈর্যশীল শ্রোতা হয়ে থাকে। একটু ভেবে দেখুন, আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কারো সাথে কথা বলছেন কিন্তু আপনি যার উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলছেন সে আপনার কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনছে না বা সেরকম গুরুত্ব দিচ্ছে না। তখন আপনি নিশ্চয়ই খুব বিরক্তিবোধ করবেন? এটাই স্বাভাবিক। ঠিক একইভাবে অন্যের ক্ষেত্রেও তাই ঘটে থাকে।

আর পুরুষেরা যেমন ভালো শ্রোতা ঠিক তেমনি তাদের সমস্যাগুলোও নিজ নিজ সঙ্গীদের সাথে গুরুত্ব সহকারে শেয়ার করে থাকে। তারাও চায় তাদের কথাগুলো কেউ একজন গুরুত্ব সহকারে শুনুক, উপলব্ধি করুক। শুধু যে সমস্যা সমূহই তা নয়, হতে পারে ভালোবাসা, ভালো লাগা সম্পর্কিত বিষয়াবলীও আপনার সাথে শেয়ার করতে চাইবে। এক্ষেত্রে আপনার উচিত তার কথাগুলো ধৈর্যশীল শ্রোতা হয়ে শোনা এবং নিজের মতামত প্রকাশ করা।

তাকে বদলানোর চেষ্টা করবেন নাঃ চোখের জল দিয়েই হোক বা জোড় করেই হোক! নারীরা তাদের জীবন সঙ্গীদের নিজের মতো করে নিতে চায়। তারা মনে করে, ‘আমি যদি তাকে কোনোভাবে বিয়ে করে ফেলতে পারি, তাহলে পরে সব ঠিক করে ফেলবো।’ অথবা, ‘আমি যদি তাকে মোবাইল ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতে পারি, তাহলে সে আমাকে যথেষ্ট সময় দিবে।’ নারীদের এ ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। মূলত একজন নারী যত সহজে নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে, পুরুষরা তত সহজে নিজেদেরকে পরিবর্তন করতে পারে না। অথবা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য কারো চাপে নিজের মাঝে পরিবর্তন আনতেও পছন্দ করে না।

আপনার জীবন সঙ্গীর প্রতিটা জিনিস আপনার পছন্দ নাও হতে পারে। এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে আপনি যদি আপনার পছন্দগুলো তার উপর চাপিয়ে দিতে চান বা তার মাঝে থাকা আপনার অপছন্দগুলো বদলে দিতে চান তাহলে হিতে বিপরীতও হতে পারে। তাই তাকে সরাসরি বদলে ফেলার চেষ্টা না করে তাকে ভালোবাসুন। ভালোবাসা দিয়ে তার মন জয় করে নিন। দেখবেন, আপনার ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে সে নিজেই বদলাতে শুরু করবে।

সমস্যা সমূহকে কখনো অবহেলা করবেন না : অতএব, এ জগতে কোনো মানুষই সবদিক থেকে পরিপূর্ণ নয়। প্রত্যেকটি মানুষই কোনো না কোনো সমস্যায় ভুগে থাকে। ঠিক তেমনি প্রত্যেকটি সম্পর্কের মাঝেই ছোটখাটো সমস্যা দেখা দেয়। আর হ্যাঁ, সমস্যা সমূহ ছোট অথবা বড় সব সমস্যারই তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।

আপনাদের সম্পর্কের মাঝেও হয়তো কোনো না কোনো সমস্যা থাকতে পারে। তা যত বড় বা ছোট সমস্যাই হোক না কেন! কখনো অবহেলা করবেন না। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সমস্যা হলেও আপনার সঙ্গীর সাথে শেয়ার করুন এবং দুজনে পরামর্শ করেই সমাধান করার চেষ্টা করুন। নতুন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্যাগুলোই একটা সময় সম্পর্কের মাঝে বিশাল বাধা সৃষ্টি করবে।

তার সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন: সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত নয় যেটা- ‘আমি বনাম তুমি’ বরং এমন হওয়া উচিত- ‘তুমি আর আমি মিলে আমরা’। মানে একটি সংবদ্ধ দল। যেখানে নিজেদের মধ্যে থাকবে না কোনো প্রতিযোগিতা, থাকবে না কোনো রেষারেষি। যা থাকবে, শুধুই সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোলাগা, ভালোবাসা ও একত্রে সারাটা জীবন কাটিয়ে দেবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।

সম্পর্কের মাঝে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা হয়তো আপনার মনের মতো নাও হতে পারে। আপনার চিন্তা-চেতনা সঠিক নাও হতে পারে। তাই সবকিছুই আপনার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা না করে আপনার সঙ্গীর অবস্থানে নিজেকে বসিয়ে বিবেচনা করুন এবং তার সিদ্ধান্তকে মেনে নিন পাশাপাশি তার সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি দেখান। দেখবেন, সে নিজেও আপনার সিদ্ধান্ত ও পরামর্শের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করবে। আর হ্যাঁ, নিজের মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে সম্পর্কের বোঝাপড়াটাও বেশ অসহনীয় হয়ে পড়ে।

ভিন্নতা সমূহকে গ্রহণ করুন : এ জগতে প্রত্যেকটি মানুষই ভিন্ন, প্রত্যেকটি মানুষেরই নিজস্ব কিছু সত্ত্বা আছে। প্রত্যেকটি মানুষের চিন্তাধারা, চাওয়া-পাওয়া ভিন্ন। কিছু কিছু বিষয়ে আচরণগত সাদৃশ্যতা থাকলেও দুটি মানুষের মধ্যে শতভাগ সাদৃশ্যতা কখনোই থাকবে না। ঠিক তেমনি, আপনার সঙ্গীর চিন্তাচেতনার সাথে আপনার চিন্তাচেতনার মিল নাও থাকতে পারে। এটা খুব সাধারণ একটি বিষয়।

তার অনেক আচরণই হয়তো আপনার ভালো লাগে না। হয়তোবা আপনার কোনো আচরণ তারও ভালো নাও লাগতে পারে। তাই বলে সাধারণ বিভিন্নতা নিয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করবেন না। দুজনার মধ্যবর্তী বৈসাদৃশ্যগুলো সহজেই গ্রহণ করে নেবার চেষ্টা করুন। তবে তার সাথে আপনার বৈসাদৃশ্যগুলো যদি খুব বেশি গুরুতর হয়, আপনার সহ্য-সীমা অতিক্রম করে ফেলে; তাহলে ভেবে নিবেন সে আপনার সমপোযোগী নয়।

কথায় আছে, “সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে।” ঠিক তাই, একটি সম্পর্কের মূল চাবিকাঠি থাকে নারীদের হাতেই। আবারো বলছি, নারীরা চাইলে তাদের ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবীটাও জয় করে নিতে পারবে। সবশেষে, একটি সম্পর্ক সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে আপনার ভালোবাসা ও সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাবোধই যথেষ্ট।

সম্পর্ক নিয়ে কেন অসুখী হই আমরা!

সাধারনত প্রতিটি মানুষের মাঝেই হতাশা, রাগ, অভিমান, বিষণ্ণতা মোটকথা কোনো না কোনো মানসিক সমস্যা একটু-আধটু থাকেই। যাকে উদ্বেগ বা প্যাথলজিক্যাল অ্যাংজাইটি বলা হয়ে থাকে। কিন্তু যখন তা আমাদের নিয়ন্ত্রনের বাহিরে চলে যায় তখন সেটি আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটাতে শুরু করে। বিশেষত Relationship anxiety বা সম্পর্কের উদ্বেগ আমাদের জীবনে এতোটাই বাজেভাবে প্রভাব ফেলে যা আমাদের আশে-পাশে থাকা আপন মানুষগুলোর সাথে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়।

‘সম্পর্কের উদ্বেগ’ যার সাথে কম-বেশি প্রত্যেকটি মানুষ সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে। এটি আপনার সম্পর্কের মাঝে ভালোবাসা বৃদ্ধির করার পরিবর্তে ভয়, সন্দেহ, ঈর্ষা, একঘেয়েমি ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে তোলে যা আপনার সুন্দর সম্পর্কটিকে দীর্ঘস্থায়ী হতে বাঁধা প্রদান করে।

আসুন দেখে নেয়া যাক যেসব কারণে আমরা অসুখী সম্পর্কের সম্মুখীন হই

অতিরিক্ত রাগ রাগ সাধারনত আবেগের একটি অংশ। যা প্রতিটি মানুষের মধ্যেই কম-বেশি বিদ্যমান। তবে এটি মানবজীবনে ইতিবাচক প্রভাবের চেয়ে নেতিবাচক প্রভাবই বেশি বিস্তার করে। কারণ, যখন একজন ব্যক্তি রেগে যায় তখন তার আপাদ-মস্তকে তাপের সৃষ্টি হয়। ফলে তার হিতাহিত জ্ঞান বলতে কিছু থাকে না। তখন সে নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।

‘অতিরিক্ত রাগ’ যা আমাদের আপনজনদের সাথে সুন্দর সম্পর্কগুলোর মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করে। অল্পতেই রেগে যাওয়া এবং সেই রাগগুলোর দীর্ঘ স্থায়ীত্বকাল সম্পর্কগুলোর মধ্যে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। রেগে গিয়ে অনেকেই অনেক অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে যার ফল তাকে সারাটা জীবন ভোগ করতে হয়। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো না। কারণ এই অতিরিক্ত রাগই আমাদের মধুর সম্পর্কগুলোতে অসুখী হবার অন্যতম কারণ।

বিশ্বাসের ঘাটতি: একটি সম্পর্কের মূল স্তম্ভই হলো বিশ্বাস। একটি সম্পর্কের মাঝে বিশ্বাস যত দৃঢ়তর সে সম্পর্কটি তত শক্তিশালী হয়ে থাকে। ঠিক তেমনি বিশ্বাস বিহীন একটি সম্পর্ক বড্ড নড়বড়ে যা সম্পর্কগুলোর মাঝে বিশাল দূরত্বের সৃষ্টি করে। বিশ্বাস হচ্ছে সম্পর্কের খুঁটি। যার উপর ভর করে সম্পর্কগুলো চলতে থাকে বছরের পর বছর।

সাধারনত কারো সম্পর্কে অবিশ্বাসের বীজ বপন হয় তৃতীয় পক্ষের কোনো ব্যক্তি দ্বারা অথবা নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণে। অবিশ্বাসের বীজ বপন হওয়া সম্পর্কগুলোর মাঝে সবসময় একধরনের দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে যা ধীরে ধীরে সেই সম্পর্কের মাঝে ফাটল ধরিয়ে দেয়। এভাবে চলতে চলতে একটা সময় সম্পর্কগুলোর মধ্যে পুরোপুরি বিচ্ছেদ হয়ে যায়। আর এভাবেই সুন্দর সুন্দর সম্পর্কগুলো বিচ্ছেদের মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবনকে অসুখী করে তুলি।

আর্থিকভাবে অসচ্ছলতা: আমরা যতই বলে থাকিনা কেন; ‘ভা্লোবাসার কাছে অর্থ মূল্যহীন’ কিন্তু বাস্তবতা ঠিক সেরকম নয়। ক্ষেত্র বিশেষ ভালোবাসা, অর্থ এবং ভালোবাসা ও অর্থ উভয়ই সম্পর্কগুলোর মাঝে পার্থক্য গড়ে তুলতে পারে। মানবজীবনে ভালোবাসা যেমন অপরিহার্য একটি জিনিস ঠিক তেমনি বেঁচে থাকতে হলে অর্থের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

বর্তমান সময়ে অর্থ ব্যতীত যেখানে এক কদম আগানো প্রায় অসম্ভব সেখানে অর্থ ব্যতীত ভালোবাসার মানুষগুলোর সাথে জীবন পাড়ি দেওয়া শুধুই স্বপ্ন। এই অর্থ যেমন প্রায় সকল সমস্যার সমাধান দিতে পারে ঠিক তার বিপরীত এই অর্থের অসচ্ছলতা একটি সম্পর্কের মাঝে শত সমস্যার সৃষ্টি করে। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরিয়ে দেয়। বর্তমান সময়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে অর্থ না থাকলে খুব আপন মানুষগুলোও দূরে সরে যায়। এতে সম্পর্কগুলোর মাঝে সুখ নামক জিনিসটা উধাও হয়ে যায়।

সম্পর্কের প্রতি অযত্নবান: যে সম্পর্ক যতবেশি যত্নবান সে সম্পর্ক ততবেশি দৃঢ়। একটি ভালো সম্পর্ক কখনোই একদিনে গড়ে উঠে না। তিলে তিলে যত্নসহকারে সম্পর্কগুলোকে ভালোবাসায় পরিণত করতে হয়। প্রতিটিক্ষেত্রে এই সম্পর্কগুলোকে যথাযথ যত্ন ও ভালোবাসার সহিত আগলে না রাখলে একদিন সে সম্পর্কগুলোর মাঝেও মরিচা ধরা শুরু করে।

প্রিয় মানুষগুলো আপনার কাছ হতে অনেক কিছুই আশা করে। তারা চায় আপনি তাদের প্রতি একটু যত্নবান হোন, তাদের চাওয়া-পাওয়াগুলোকে গুরুত্ব দিন। মোটকথা, যেকোনো জিনিসের যত্ন না নিলে যেমন তা অকেজো হয়ে যায় ঠিক তেমনই কোনো সম্পর্কের যদি যত্ন না নেওয়া হলে সেই সম্পর্কটিও আস্থাহীন হয়ে পড়ে। জীবন থেকে হারিয়ে যায় সুখ নামক জিনিসটি।

সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাহীন : প্রতিটি সম্পর্কই অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মানের। শ্রদ্ধা ও সম্মানে পরিপূর্ণ সম্পর্কগুলো অত্যন্ত সুন্দর ও সুখময় হয়ে উঠে। এবং সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কগুলো আরও পরিপক্বতা লাভ করে। এমনকি সম্পর্কগুলো অটুট থাকে জীবনাবসান অবধি।

কিন্তু কিছু মানুষ তাদের সম্পর্কগুলোকে সম্মান করে না বা করতে জানে না। অহমিকা, অবিশ্বাস ও শ্রদ্ধাহীনতায় সম্পর্কগুলো বরং অশান্তির খোরাকে পরিণত হয়। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাহীন সম্পর্কগুলোও খুব বেশি স্থায়ী হয় না। জীবনযুদ্ধের মাঝপথে এসে থমকে দাঁড়ায়। যেখান থেকে নতুন করে সুখ খুঁজে নেবার আর কোনো পথ থাকে না।

সম্পর্কের প্রতি অবহেলা: অবহেলা অত্যন্ত নিগৃহীত একটি জিনিস। কোনো ব্যক্তিই কারো অবহেলার পাত্র হতে চায় না। যে অবহেলিত হয় সে নিজেও হাজারো চেষ্টা চালিয়ে যায় তার ভালোবাসার মানুষটির কাছ থেকে অবহেলার পরিবর্তে একটু ভালোবাসা পেতে। অথচ অধিকাংশক্ষেত্রেই সময়ের সাথে সাথে ভালোবাসা পাবার চেয়ে অবহেলিত হবার পরিমাণটা আরো বেড়ে যায়।

সবকিছু সহ্য করা যায় কিন্তু ভালোবাসার মানুষগুলোর কাছ থেকে অবহেলা জিনিসটা সহ্য করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। অবহেলিত হতে হতে তা যখন মানুষটির ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করে ফেলে তখন সে শত কষ্ট হলেও সে পথ হতে মুক্তি পেতে চায়। কিন্তু তারপরও একটু ভালোবাসা পাবার জন্য প্রিয় মানুষটির শত অবহেলা উপেক্ষা করেও পথ চেয়ে থাকে। দিনশেষে একরাশ অবহেলা, হতাশা ও ব্যর্থতা নিয়েই বেঁচে থাকতে হয় মানুষটিকে।

অহংকার: অহংকার বা অহমিকা মানুষের অস্বাভাবিক, বিকৃত ও জঘন্যতম একটি স্বভাব। অহংকার শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের পতনের মূল কারণই নয়, এই অহংকার একটি সুন্দর সম্পর্ক পতনেরও অন্যতম কারণ।

একজন অহংকারী ব্যক্তি নিজেকে সবসময়ই বড় মনে করে থাকে। এবং তার পাশে থাকা মানুষটিকে সবসময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে থাকে। এতে করে একটি সম্পর্কের সাথে সম্পৃক্ত মানুষগুলোর মনে ঐ অহংকারী ব্যক্তির প্রতি একপ্রকার ঘৃনার জন্ম নেয়। যা তাদের মধ্যে বেশ দূরত্ব সৃষ্টি করে দেয়। বয়ে আনে অশান্তি। পতন হয় হাজারো যত্নে গড়ে তোলা একটি সুখী সম্পর্কের।

আপনজনদের সময় না দেওয়া: ব্যস্ততম জীবনের মাঝেও প্রতিটি মানুষ চায় তার প্রিয়জনদের সাথে কিছুটা সময় কাটাতে। আপনজনদের সাথে কাটানো সময়গুলো সবসময়ই মধুর হয়ে থাকে। তাদের সাথে কাটানো স্মৃতিগুলো সম্পর্কের গভীরতা আরো বাড়িয়ে দেয়। নিজেদের মধ্যে অপ্রকাশিত ভালোবাসাগুলো ফুটে উঠে খুব সহজেই।

কিন্তু বাস্তবতা কিছু মানুষকে সবসময়ই তার ভালোবাসার মানুষগুলো থেকে অনেকটা দূরে সরিয়ে রাখে। বাস্তবতার সাথে হেরে যাওয়া মানুষগুলো সবসময় এক ধরনের অপূর্ণতায় ভুগে। যদিও অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে। তবে যাই হোকনা কেন; ভালোবাসায় আপন মানুষগুলো যখন তাদের প্রিয় মানুষটির কাছ হতে প্রাপ্য সময় না পায় তখন তাদের মাঝেও সবসময় একধরনের বিষণ্ণতা বিরাজ করে।

সকলের মতামতকে প্রাধান্য না দেওয়া : যখন আপনি কারো সাথে একটি সম্পর্ক গড়ে তুলবেন তখন আপনাকে তার মতামতকে অবশ্যই প্রাধান্য দিতে হবে। একতরফাভাবে যেরকম একটি সম্পর্ক গড়ে উঠে না ঠিক তেমনই একতরফাভাবে কখনোই কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহন করা ঠিক না। সেক্ষেত্রে সম্পর্কগুলোর সাথে যুক্ত প্রতিটি ব্যক্তির মতামত মন দিয়ে শোনা এবং তাদের মতামতকে যথাসাধ্য প্রাধান্য দেওয়া অপরিহার্য।

কিন্তু যখন আপনি সেই সম্পর্কের সাথে সম্পৃক্ত কোনো কাজে তার মতামতকে প্রাধান্য না দিয়ে নিজের ইচ্ছে মতো সম্পন্ন করার চেষ্টা করবেন তখন সে নিজেকে মূল্যহীন মনে করবে। এমনকি এভাবে চলতে চলতে একটা সময় তা সম্পর্কের মাঝে মারাত্মকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

দিন শেষে জীবনযুদ্ধে তারাই বিজয়ী যারা শত ব্যস্ততা, ব্যর্থতা, ও অপূর্ণতা দূরে সরিয়ে রেখে আপনজনদের নিয়ে সুখে জীবনযাপন করছে। সুখ-দুঃখ মিলিয়েই জীবন। সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে আপন মানুষগুলোকে ভালোবেসে ভালো রাখাটাই সবচেয়ে বড় সার্থকতা। সবশেষে, ভালো থাকুন এবং ভালো রাখুন আপনার আপনজনদের।