ভরণপোষণ পাওয়া আপনার অধিকার

তিথির (ছদ্মনাম) বিয়ে হয়েছে প্রায় তিন বছর। এর মধ্যে কোলজুড়ে এসেছে একটি সন্তান। বিয়ের পরই জানা গিয়েছিল স্বামী মাদকাসক্ত। এ থেকে বের করে আনার চেষ্টাও কম করেনি তিথি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। সন্তান জন্মানোর পর স্বামী তিথিকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেন। তিথিকে দেন না কোনো ভরণপোষণ, এমনকি একমাত্র সন্তানের জন্যও কোনো টাকা পাঠান না। তিথি লেখাপড়া তেমন একটা করেননি যে চাকরি করবেন, আবার বাবার বাড়ির আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। এখন কীভাবে তিথি আদায় করবেন নিজের আর সন্তানের ভরণপোষণ। তিথি হয়তো জানেন না, আইন তাঁর ভরণপোষণের অধিকার নিশ্চিত করেছে। মুসলিম আইনে আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা তাঁদের স্ত্রী, সন্তানসন্ততি, মা-বাবা, যাঁরা আর্থিকভাবে অসমর্থ, তাঁদের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।

ভরণপোষণ কারা পাবেন
স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে বিয়ে বর্তমান থাকা অবস্থায় ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার লাভ করেন। ছেলেসন্তান সাবালক না হওয়া পর্যন্ত এবং মেয়েসন্তান বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত বাবার কাছ থেকে ভরণপোষণ লাভ করার অধিকারী। ছেলেসন্তান সাত বছর পর্যন্ত এবং মেয়েসন্তান বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত যদি মায়ের কাছে কিংবা মায়ের মা, অর্থাৎ নানির কাছে থাকে, তবু বাবা তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।

এ ছাড়া পঙ্গু, অক্ষম, পাগল এবং মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী সাবালক সন্তানও বাবার কাছে ভরণপোষণ পাবে। তবে সন্তান যদি অন্যায়ভাবে বাবার সঙ্গে থাকতে অস্বীকার করে কিংবা যে শিশু তার নিজস্ব সম্পত্তির আয় থেকে নিজের ভরণপোষণ করতে সক্ষম, সে শিশুর ভরণপোষণ দিতে বাবাকে বাধ্য করা যাবে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আলাদাভাবে বসবাস করলেও স্ত্রী স্বামীর কাছে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার রাখেন। যেমন ১. স্ত্রীকে তাৎক্ষণিক দেনমোহর পরিশোধ না করলে ২. স্বামীর নিষ্ঠুরতার কারণে ৩. স্বামী যদি অভ্যাসগতভাবে খারাপ ব্যবহার করেন ৪. দীর্ঘকাল স্ত্রীর কাছ থেকে স্বামী দূরে থাকলে ৫. অনুমতি ছাড়া স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে।

পরিমাণ
ভরণপোষণের পরিমাণ স্বামী-স্ত্রীর সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সংগতির ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় নিকাহনামায় উল্লেখ থাকে, স্বামী মাসিক কত টাকা ভরণপোষণ হিসেবে দেবেন। সাধারণ অবস্থায় স্বামী তাঁর নিজ গৃহেই স্ত্রী বা স্ত্রীদের খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান দিয়ে থাকেন। আইনসংগত বা যুক্তিযুক্ত কারণে যখন স্ত্রী আলাদা বসবাস করেন, তখন স্বামী নগদ অর্থ দ্বারা ভরণপোষণ জোগাবেন।

তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী কেবল ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ পাবেন। অর্থাৎ, তালাক কার্যকর হওয়ার পর স্ত্রী মাত্র তিন মাসের জন্য ভরণপোষণ পাবেন। তবে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে যে ইদ্দত পালন করতে হয়, সেই সময়ের জন্য স্ত্রী কোনো ভরণপোষণ পাবেন না। গর্ভবতী থাকলে সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত যেহেতু তালাক কার্যকর হয় না, তাই সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে হবে।

আদালতে যাওয়ার আছে অধিকার
আইনসম্মত স্বামী যদি স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ না দেন, তাহলে পারিবারিক আদালতে প্রতিকার চাওয়া যায়। ১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ অনুযায়ী এ অধিকার রয়েছে। সন্তান ও বৃদ্ধ মা-বাবাও আদালতের মাধ্যমে ভরণপোষণ পাওয়ার জন্য মামলা করতে পারেন।

চেয়ারম্যান বা মেয়রের কাছেও আবেদন করা যায়
স্ত্রী খোরপোশ দাবি করে স্বামীর বিরুদ্ধে চেয়ারম্যানের বা মেয়রের কাছে আবেদন করতে পারবেন। আবেদন পাওয়ার পর চেয়ারম্যান বা মেয়র স্ত্রী ও স্বামী উভয় পক্ষের পছন্দমতো একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে সালিসি পরিষদ গঠন করবেন। সালিসি পরিষদ স্ত্রীর দাবির যৌক্তিকতা যাচাই করে ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ করে সিদ্ধান্ত দেবে এবং সেই মোতাবেক একটি প্রত্যয়নপত্র প্রদান করবে।


লেখক: তানজিম আল ইসলাম , আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
প্রথম আলো থেকে সংগ্রহীত

বিয়েটা হলো মা-বাবার অমতে…

Couple-in-Loveবাড়ির সবচেয়ে ছোট, শান্ত আর চুপচাপ কলেজপড়ুয়া মেয়েটি একদিন হঠাৎ উধাও হয়ে গেলেন। খোঁজ করতে করতে তাঁর ঘরে পাওয়া গেল সাবেক গৃহশিক্ষকের লেখা একতাড়া চিঠি, যার কোনো কোনোটিতে এ রকম একটি ঘটনার পরিকল্পনার আভাস। কী ঘটেছে, তা নিয়ে আর সন্দেহ রইল না কারও। মা শয্যাশায়ী হলেন। বাবা লাইসেন্স করা বন্দুক নিয়ে চেঁচাতে লাগলেন। এমন লক্ষ্মী একটা মেয়ে এমন কাজ করতে পারে, বিশ্বাসই করলেন না বড় ভাইয়েরা। কাজেই সব দোষ গিয়ে পড়ল বেচারা গৃহশিক্ষকের ওপর। তাঁর নামে অপহরণের মামলা হলো, প্রভাব খাটিয়ে থানায় ধরে আনা হলো। কিন্তু মেয়ে সাবালক এবং স্বেচ্ছায় তাঁর সঙ্গে গেছে প্রমাণিত হওয়ায় পুলিশ তাঁকে ছেড়েও দিল। কিন্তু ভাইয়েরা ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। তাই একদিন রাস্তায় মেয়ের ভাইয়েরা মারধর করলেন প্রেমিকপ্রবরকে। পালিয়ে বিয়ের সাধ মিটিয়ে দেওয়ার জন্য হাত-পা প্রায় ভেঙেই দিলেন। বর্ণনা করছিলেন ঘটনার নায়ক নিজেই। ২০ বছর আগে মফস্বল শহরের বেচারা গৃহশিক্ষক আর বর্তমানের এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। সে যে কী সময় গেছে! হ্যাঁ, এখন দুই পরিবারের সবাই বিষয়টা মেনে নিয়েছেন বটে, বড় ভাইয়েরা বোনজামাইকে যথেষ্ট ভালোবাসেন এখন; কিন্তু সেই মারের দাগ এখনো হাঁটুতে রয়ে গেছে।

হুট করে কাউকে না জানিয়ে পরিবারের অমতে বিয়ে করে ফেলা সেই রোমিও-জুলিয়েটের আমল থেকে শুরু করে এখনকার দিনেও ঘটছে। কখনো কখনো দুই পরিবারে এমন ঘটনার প্রতিক্রিয়া হয় ভয়াবহ। কেবল সদ্যবিবাহিত ছেলেমেয়ের ওপর তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়েন তা নয়, কখনো কখনো তাঁরা নিজেরাও জড়িয়ে পড়েন নানা কোন্দল, মারামারিতে—এমনকি রক্তপাতও দেখা যায় এমন ঘটনাকে কেন্দ্র করে।

বিয়ে মানে কেবল দুটি ছেলেমেয়ের নয় বরং দুটি পরিবারের বন্ধন। বিয়ের আগে-পরে দুই পরিবারের নানা অনুষ্ঠান-আচার পালনের মাধ্যমে এই সম্পর্ক রচিত হয়। তাই হুট করে না জানিয়ে বিয়েতে এই প্রথা ও স্বাভাবিকতা ব্যাহত হয়। ফলে ভালোভাবে কেউই বিষয়টি মেনে নিতে পারেন না। আর এসব ক্ষোভ আর ক্রোধ গিয়ে পড়ে সেই ছেলেমেয়ে দুটির ওপর। এক ভয়ংকর বৈরী সময় পার করতে হয় নববিবাহিত দম্পতিকে। কিন্তু এই ক্ষোভ যদি রীতিমতো জিঘাংসা আর নিষ্ঠুরতায় পরিণত হয়, তখন? সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদটি একটু মনে করিয়ে দিচ্ছি।

গত ১৮ জুন ঢাকার খিলক্ষেত থানার নিকুঞ্জ মডেল কলেজের ছাত্রী মনিরা পারভীনকে নিয়ে পালিয়ে বিয়ে করেন নাসির হোসেন। প্রথম দিন এক বন্ধুর বাড়িতে থাকলেও পরদিন পরিবারের আশ্বাসে বাড়ি ফেরেন তাঁরা। কিন্তু বাড়ি ফেরার পরই নাসিরের বাবা, চাচা ও অন্য আত্মীয়রা চড়াও হন মনিরার ওপর। নাসিরকে অন্য একটি ঘরে আটকে রেখে প্রচণ্ড মারধর করা হয় মনিরাকে। ইট ও কাঠ দিয়েও পেটানো হয়। গুরুতর জখম মনিরা ২২ জুন মারা যান। (সূত্র: প্রথম আলো, ২৬ জুন)

আমাদের সমাজের দৃষ্টিতে ‘পালিয়ে বিয়ে করা’ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, কিন্তু সেই অপরাধের শাস্তি কি ছেলে বা মেয়েটিকে একেবারে মেরে ফেলা? পরিবারের সম্মান কি একটা তরতাজা তরুণ প্রাণের চেয়েও বেশি হয়ে দাঁড়ায়? প্রতিবেশী দু-একটি দেশে মেয়েদের প্রায়ই শিকার হতে হয় ‘অনার কিলিং’-এর। এই অনার কিলিং মানে আর কিছু নয়, পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে দোষী মেয়েটিকে হত্যা করা। মেয়েদের প্রাণ কি এই দুনিয়ায় এতই ঠুনকো আর সস্তা?

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাহবুবা নাসরীন বলেন, সন্তানেরা যদি নাবালক হয়, তবে এই বিয়ে যে বৈধ হবে না এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানো পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে আপাতত বিষয়টা মেটানো যায়। দুই পরিবার একসঙ্গে বসে বিষয়টা মীমাংসা করতে পারে। আলোচনায় পরিবার ও পাড়ার মুরব্বিদেরও নেওয়া যায়। যদি তাঁরা সাবালক হন, তবে ধীরে-সুস্থে বিষয়টা মেনে নিয়ে কীভাবে একে সামাজিক রূপ দেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলতে পারে। কিন্তু সহিংস হওয়া, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা, এমনকি প্রাণে মেরে ফেলার মতো ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অন্যায়। তাঁর সঙ্গে একমত জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী। তিনি বলেন, মেয়ের বয়স ১৮ বছর ও ছেলের বয়স ২১ বছর হলে আইন অনুযায়ী তাঁরা বিয়ে করতে পারবেন। এটি নিয়ে অভিভাবকেরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হয়ে ছেলের সম্পর্কে খোঁজখবর নিন। ছেলেটি মাদকাসক্ত, বিবাহিত ইত্যাদি সমস্যা থাকলে মেয়েকে বুঝিয়ে বলতে হবে।

 সবচেয়ে বড় কথা, বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ছেলেমেয়েরা পরিবারের কারও সঙ্গে পরামর্শ বা আলোচনা না করার অর্থ হলো পরিবারে তাঁদের বন্ধুস্থানীয় কেউ না থাকা। তাই অভিভাবকদের উচিত, সন্তানের আরও কাছাকাছি যেতে চেষ্টা করা, বন্ধুর মতো সবকিছু জানতে চেষ্টা করা, যাতে সন্তান অনাকাঙ্ক্ষিত ও হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত হুট করে না নেয়।

লিখেছেনঃ  তানজিনা হোসেন
প্রথম প্রকাশ – দৈনিক প্রথম আলো | জুলাই ০৩, ২০১৩

হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা উচিত

আমাদের দেশে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের বিয়ে তাদের শাস্ত্রমতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। হিন্দুধর্মাবলম্বীদের বৃহত্তম দেশ ভারত হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন ও বিচ্ছেদসংক্রান্ত আইন বহু আগেই (১৯৫৫) প্রণীত হয়ে বলব আছে। এমনকি ভারতের একজন বিধবাও দ্বিতীয় দার পরিগ্রহ করতে পারেন।

আমাদের দেশে হিন্দু বিবাহবিচ্ছেদ ও বিধবা বিবাহ প্রচলন আইন প্রণীত না হওয়ায় আইনগতভাবে কোনো হিন্দু পুরুষ বা মহিলা বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন না এবং একজন বিধবাও আবার বিয়ে করতে পারেন না।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হলেও সারা জীবন ক্ষেত্রবিশেষে পৃথক বাসস্থানে অবস্থান করতেও বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন না। অনুরূপভাবে একজন যুবতী হিন্দু মহিলা তাঁর স্বামী রোগে-শোকে বা দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করলেও আবার বিয়ে করতে পারেন না। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে প্রণীত হিন্দু বিধবা বিবাহ প্রচলন আইন (১৮৫৬) ভারতে আইন হিসেবে গৃহীত হলেও আমাদের দেশে আদৌ এ ব্যাপারে কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়নি।

হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন

হিন্দু নারীদের বিয়েসংক্রান্ত প্রতারণা, বিয়ে-পরবর্তী দালিলিক প্রমাণ সৃষ্টির লক্ষ্যে ও সহজে হিন্দু নারীদের আইনি সুরক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন হিন্দুধর্মাবলম্বীদের জন্য ঐচ্ছিক রেখে ‘হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন-২০১২’ সংসদে পাস করা হয়। বিদেশ ভ্রমণ, অভিবাসন ইত্যাদি ক্ষেত্রেও বিবাহ নিবন্ধন-সম্পর্কিত দালিলিক প্রমাণ একটি অপরিহার্য বিষয়।

১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৫ ধারার মাধ্যমে মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক এবং নিবন্ধন না করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মুসলিম শরিয়া আইন অনুসারে মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ ঘটানো যায় এবং বিধবা মুসলিম নারীও আবার বিয়ে করতে পারেন।

কোনো কোনো হিন্দু ধর্মীয় নেতার মতে, হিন্দু বিয়ে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণে সাত পাকে বাঁধা বিধায় এ বিয়ের মাধ্যমে আত্মার সঙ্গে আত্মার, মাংসের সঙ্গে মাংসের ও অস্থিতে অস্থিতে মিলন ঘটায়। বিয়ের নিবন্ধন আইন প্রণীত হলে হিন্দু বিয়ের মূল ভিত্তি নষ্ট হবে বলেও তাঁদের ধারণা। নিবন্ধনের ফলে একজন হিন্দু মহিলার একজন হিন্দু পুরুষের সঙ্গে শুধু সম্পর্ক স্থাপিত হবে, স্বামীর অবর্তমানে স্বামীর পরিবারের কোনো দায়বদ্ধতা থাকবে না—এমনটাই দাবি তাঁদের।

অনেকেই এটাকে খোঁড়া যুক্তি হিসেবে উড়িয়ে দিতে চান। তাঁদের বক্তব্য হলো, বিবাহ নিবন্ধন হিন্দু বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-নীতিতে কোনোভাবেই খর্ব করবে না। বিবাহ নিবন্ধনের মাধ্যমে শুধু বিয়ে প্রমাণের জন্য একটি অতিরিক্ত দালিলিক প্রমাণ সৃষ্টি হবে।

আইনের ৬ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘হিন্দু ধর্ম, রীতি-নীতি ও আচার-অনুষ্ঠান অনুযায়ী হিন্দু বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর ওই বিবাহের দালিলিক প্রমাণ সুরক্ষার উদ্দেশ্যে, বিবাহের যেকোনো পক্ষের নির্ধারিত পদ্ধতিতে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধক নির্ধারিত পদ্ধতিতে বিবাহ নিবন্ধন করিবেন।’ অনেক আইনজ্ঞ ও বিশিষ্টজনের মতে, কোনো আইন ঐচ্ছিক হতে পারে না, আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য হলো আইনে বিধিবিধান প্রতিপালনের বাধ্যবাধকতা।

তাঁদের মতে, হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হলে সাত পাক ঘোরা ও অন্যান্য আচার পালনে কোনো সমস্যা হবে না। গত ২৩ ডিসেম্বর প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন না থাকার কারণে কাননবালার বিড়ম্বনা তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, ১৭ বছর আগে কাননবালাকে তাঁর দুই সন্তানসহ ফেলে রেখে তাঁর স্বামী চলে যান এবং দ্বিতীয় বিয়ে করেন। গাজীপুরের স্বামী পরিত্যক্ত কাননবালা এখন একজন আশ্রয়হীন ভাসমান নারী।

কাননবালার দাবি, তাঁদের বিবাহের নিবন্ধনমূলক কোনো দালিলিক প্রমাণ না থাকায়ই তাঁর স্বামী তাঁকে এবং সন্তানদের অস্বীকার করার শক্তি পেয়েছেন। কাননবালা তাঁর জীবনের ঘটনাপ্রবাহ থেকে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার দাবি তুলেছেন সরকারের কাছে। দেশের আর্থ-সামাজিক ধর্মীয় ও যুগের চাহিদার কারণে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা উচিত বলে মনে করি।

Hindu Marriage Media, Brahman Marriage Media, Kshatriya Marriage Media, Chhettri Marriage Media, Vaisya Marriage Media, Sudra Marriage Media, Hindu

কেন পরকীয়ায় এত জটিলতা ?

পরকীয়া কি সত্যিই রোমান্টিক !  বিবাহিত পুরুষ এবং নারী কখনও কারো সাক্ষাতে হঠাৎ প্রেমে পড়ে যান , বিষয়টি অত্যন্ত গোপনে লালন করতে থাকেন । অনেকে এই সম্পর্কের উপসংহারে আসতে পারেন আবার অনেকেই পারেন না । যারা পারেন সেই নারী কিংবা পুরুষরা যখন দেখেন তার ভালবাসা সত্যিই জীবনকে অর্থবহ করেছে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন । কিন্তু তারা নিজের অজান্তেই এক ধরনের জটিলতাকে জীবনসঙ্গী করে নেন ।

বিবাহ একটি অত্যন্ত জটিল প্রকাশ্য চুক্তি । আর এই বিয়ের ঘটনা যখন দুইজন বিবাহিত নারী-পরুষের মধ্যে সংঘটিত হয় , তখন সেই জটিলতা হয় অকল্পনীয় । বিবাহিত জীবনে অন্য  কোন নারী কিংবা পুরুষের প্রেমে পড়ার অনেক কারণ রয়েছে ।  কিছু মানুষ আছে যাদের বিবাহিত জীবন মানসিক কিংবা শারীরিকভাবে সুখি নয় , তাই অন্য কোথাও সুখ খোঁজার চেষ্টা করে । কেউ কেউ বিবাহিত জীবনের বাহিরে সম্পর্ক তৈরী করাকে একটা ফ্যাশান হিসেবে নেয় , যাদের ক্ষেত্রে জটীলতা কম হয় । আবার কেউ কেউ প্রাকৃতিকভাবেই নিজের অজান্তে বিপরীত লিঙ্গের প্রেমে পড়ে যান । তবে যে কারনেই  হোক নতুন সম্পর্কের পরিণতি আসলে ,পুরানো সম্পর্ক কোন না কোনভাবেই বয়ে বেড়াতে হয় । বিশেষজ্ঞদের মতে পরকীয়া সবসময় মধুর, যা একঘেয়ে বিবাহিত জীবনকে প্রাণ দেয় , কিন্তু যখন ঐ সম্পর্ককে বিয়ে পর্যন্ত গড়ানো হয় , তখন শুরু হয় জটীলতা , বাস্তবতা ঐ মধুর জীবনকে অম্ল করে তোলে দ্রুত ।

পরকীয়া সম্পর্কের পর বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রী উভয়ই নিরাপত্তাহীনতা ও আস্থাহীনতায় ভোগে । কেননা উভয় মনে করে যেকোন সময় জীবনসঙ্গী আবারো অন্য কারো প্রেমে পড়তে পারে । একজন নারী কিংবা পুরুষ মনে করে কেউ যদি দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ইতি টেনে সন্তানদের উপেক্ষা করে ঘর ছাড়তে পারে, সে একদিন হয়ত আমার সাথেও প্রতারণা করতে পারে । এই চেতনা কখনই মরেনা এবং একসময় চাপ এমন হয় যে তা হ্যান্ডেল করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে ।

পরকীয়ার বিয়েতে একটা বিষয় জন্ম নেই , যা সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয় , তা হলো  নারী কিংবা পুরুষ সবসময় নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করে তারা কোন ভুল করেনি কিন্তু নিজের ঘরভাঙার বেদনা তাদেরকে সবসময় অনুতপ্ত করে । আমাদের উপমহাদেশে পরিবারপ্রথা এখনও যথেষ্ট শক্ত । যেকারণে পরকীয়া এবং বিয়ে দুটোই পরিবার , বন্ধু ও সমাজে ঘৃন্য হিসেবে গৃহিত হয় । যেকারনে একাকী উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয় , এই নিয়ে দুজনের ভুল বোঝাবুঝির অন্ত থাকেনা । আগের ঘরে সন্তান থাকলে সেই মা কিংবা পিতা ঐ সন্তানদের নিয়ে এক বিরাট জটিলতায় পড়েন , যা একসময় ছেলে-মেয়ের জীবন নষ্ট হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াই । কাজেই পরকীয়া করলে এই সকল জটীলতা মোকাবেলা করার  প্রস্তুতি নিন ।

– সংগ্রহিত

সন্দেহের ভূত…

সন্দেহের ভূত অনেকের মাথাতেই চেপে বসে। দাম্পত্যেই সাধারণত বেশি দেখা যায় এমন পরিস্থিতি। কখনো স্বামী, কখনো স্ত্রী মনে করেন যে তাঁর সঙ্গীর অন্য কারও সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। যদিও তা বাস্তবে সত্য নয়। এই সন্দেহপ্রবণতাকে বলা হয় মরবিড জেলাসি, যার আরেকটি পোশাকি নাম ওথেলো সিনড্রোম। শেক্সপিয়ারের নাটকের চরিত্র ওথেলো এই সন্দেহের ভূতের কবলে পড়ে তাঁর স্ত্রী ডেসডিমোনাকে হত্যা করেছিলেন।

ভ্রান্ত বিশ্বাস, খুঁতখুঁতে মনোভাব থেকে এ সমস্যা হয়ে থাকে অনেকের। এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। সাধারণত ব্যক্তিত্বের ধরন, পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব, আর্থিক অসংগতি, নিজের যৌন দুর্বলতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, মাদকে আসক্তি, মানসিক রোগ ইত্যাদি কারণে সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে ব্যক্তি। সন্দেহের কারণে অতি উৎকণ্ঠা, বিষণ্নতা, খুঁতখুঁতে বা মারমুখী আচরণ, ঘুমের সমস্যাও দেখা যায়। সন্দেহ দিনের পর দিন চলতে থাকলে দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল দেখা যায়, পারিবারিক সম্প্রীতি নষ্ট হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো সন্দেহের বশবর্তী হয়ে সন্দেহভাজনকে হত্যা, সন্তান হত্যা, গুরুতর আঘাত বা আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

সন্দেহের বিষয়টি যখন বড় আকার ধারণ করে, তখন সেটাকে বলা হয় প্যারানয়েড ডিলিউশন। যাঁর মধ্যে এ সমস্যা থাকে, তিনি তাঁর সঙ্গীকে অবিশ্বাস করেন, বিশ্বাস করেন আশপাশের সবাই তাঁর ক্ষতি করতে চায়, কখনো মনে করতে পারেন তাঁর কাছের মানুষেরা তাঁর খাবারে বিষ মিশিয়ে দিচ্ছে ইত্যাদি। অপর দিকে ওথেলো সিনড্রোমের ক্ষেত্রে সন্দেহটি খুবই সুনির্দিষ্ট, সঙ্গীর অন্য কারও সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে—এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের মধ্যেই সন্দেহ সীমাবদ্ধ।

সন্দেহের ভূত তাড়াতে:

দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে সাধারণ ভুল-বোঝাবুঝি বা সন্দেহ তৈরি হলে বিষয়টিকে বড় হতে না দিয়ে শুরুতেই তা নিয়ে একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করুন।
আপনার সন্দেহটি সঠিক কি না, তা বারবার যাচাই করে দেখুন।
সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া সঙ্গীকে দোষী সাব্যস্ত করবেন না, সন্দেহের ঘটনাটি তাঁর দিক থেকেও দেখুন।
সন্তানদের এই বিষয়ে জড়াবেন না।
গোপনে নজরদারি এড়িয়ে চলুন, গোয়েন্দার ভূমিকায় না থেকে বন্ধুর ভূমিকায় বিষয়টি জানার চেষ্টা করুন।
অধীনের কর্মচারী, কাজের লোক, গাড়িচালক বা নিরাপত্তাকর্মীদের কাছ থেকে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন না।
আপনাদের সম্পর্কে ফাটল ধরাতে তৃতীয় কেউ ষড়যন্ত্র করছে কি না, তা যাচাই করুন।
আপনি নিজে সন্দেহের শিকার হলে, সাময়িক সমাধানের জন্য মিথ্যা বলবেন না।
হঠকারী আচরণ এড়িয়ে চলুন।যদি মনে হয়, এটি সাধারণ ভুল-বোঝাবুঝির চেয়ে কিছু বেশি বা দুজনের কারও মধ্যে কোনো মানসিক সমস্যা রয়েছে, তবে দেরি না করে দ্রুত মানসিক রোগবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

আহমেদ হেলাল (প্রথম আলো)

স্বাস্থ্যকর ভালোবাসা

প্রকৃত অর্থে ভালোবাসার কোনো মৌসুম নেই, নির্দিষ্ট কোনো দিন বা মাসও নেই। ভালোবাসার অনুভব যে কারও মনে সঞ্চারিত হতে পারে যেকোনো সময়। সর্বব্যাপী এই ভালোবাসা কেবল প্রেমিক-প্রেমিকা বা কবি-সাহিত্যিকদেরই মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু নয়, বিজ্ঞানী ও গবেষকদেরও এর প্রতি রয়েছে প্রবল আগ্রহ। তবে তাঁদের আগ্রহের কারণটা ভিন্ন এবং বলতে পারেন নন-রোমান্টিকও। মানব স্বাস্থ্যের ওপর ভালোবাসার প্রভাবই তাঁদের প্রধান ঔত্সুক্য। তাঁদের গবেষণালব্ধ ফল ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ ব্যক্তিদের জন্য উদ্দীপকই বটে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভালোবাসা স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক। তবে এখানে ভালোবাসা বলতে আকর্ষণের প্রাথমিক উদ্দামতা, মোহগ্রস্ততা বা কেবল নর-নারীর আদিম প্রেমকে বোঝানো হচ্ছে না; ভালোবাসা বলতে অন্তরঙ্গ ও উপভোগ্য একটি স্থায়ী সম্পর্কের ওপর জোর দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ভালোবাসার ইতিবাচক প্রভাব বুঝতে গবেষণা করা হচ্ছে বিবাহিত ব্যক্তিদের ওপর। অসংখ্য গবেষণায় দেখা গেছে, সুখী দম্পতিরা দীর্ঘায়ু হন; তাঁদের হার্ট অ্যাটাক ও ক্যান্সার হওয়ার হারও অসুখী দম্পতি বা অবিবাহিত ব্যক্তিদের চেয়ে কম। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিবাহিত মহিলাদের হূদরোগ, লিভার সিরোসিস ও আত্মহত্যাজনিত কারণে মৃত্যুর আশঙ্কা একাকী ব্যক্তিদের তুলনায় ২০ শতাংশ কম। অন্যদিকে একাকী পুরুষদের এই আশঙ্কা সুখী বিবাহিত ব্যক্তিদের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি।

নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও-ভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ অন আনলিমিটেড লাভ-এর গবেষক ইসথার এম স্টার্নবার্গ বলেন, যেকোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক চাপ শরীরে কর্টিসোল হরমোনের নিঃসরণ বাড়ায়। এই কর্টিসোল দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। ভালোবাসা সেই চাপ কমাতে সাহায্য করে। ফলে কমে যায় কর্টিসোল নিঃসরণও। ওয়াশিংটনের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের গবেষকেরাও ভালোবাসার রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতার বিষয়টি সমর্থন করেন। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যানডেস পার্ট বলেন, স্থিতিশীল, দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসার বন্ধন শরীরে এনডরফিন নামের এক ধরনের রাসায়নিকের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। এনডরফিন আবার ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রাকৃতিক ঘাতক কোষের পরিমাণ বাড়ায়।

প্রগাঢ় ভালোবাসা বার্ধক্য বিলম্বিত করে, যৌবনের স্থায়িত্ব বাড়ায়। ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক হার্টম্যাথ ইনস্টিটিউট স্বেচ্ছায় ভালোবাসা অনুভবের এক অনুশীলন উদ্ভাবন করে এবং গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সেই অনুশীলনটি করায়। নিয়মিত অনুশীলনের ছয় মাসের মাথায় বার্ধক্যরোধী হরমোন হিসেবে পরিচিত ডিহাইড্রোএপিএন্ড্রোস্টেরন বা ডিএইচইএ হরমোনটি তাদের দেহে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যায় এবং নয় মাসের মাথায় তা ৯০ শতাংশ বাড়ে।

হূদ-স্বাস্থ্যের ওপরও ভালোবাসার ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। ১০ হাজার বিবাহিত পুরুষের ওপর এক গবেষণা চালান আমেরিকান গবেষকেরা। উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিসের মতো হূদরোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে জীবনযাপন করছিলেন তাঁরা। ফলে হূদরোগের কারণে বুকে তীব্র ব্যথা হওয়ার ঝুঁকি ছিল সবারই। তাঁদের দুটি দলে ভাগ করা হয়। প্রথম দলে ছিলেন সেই সব পুরুষ, যাঁরা স্ত্রীর সত্যিকারের ভালোবাসায় সিক্ত। অন্যদিকে যাঁরা মনে করতেন স্ত্রীরা তাঁদের ভালোবাসেন না, তাঁরা ছিলেন দ্বিতীয় দলে। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, দ্বিতীয় দলের পুরুষদের মধ্যে ওই ধরনের তীব্র বুকে ব্যথা হওয়ার হার ছিল প্রথমোক্ত দলের প্রায় দ্বিগুণ।

২০০৭ সালে হিউম্যান কমিউনিকেশন রিসার্চ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, ভালোবাসার অনুভূতি কেবল কাগজে লেখার মাধ্যমেই কমানো যায় হূদরোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কোলেস্টেরল! পাঁচ সপ্তাহব্যাপী গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের প্রতিদিন তিনবার ২০ মিনিট করে তাঁদের ভালোবাসার মানুষটিকে উদ্দেশ করে মনের অভিব্যক্তি লিখতে বলা হয়। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, তাঁদের রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমে গিয়েছিল উল্লেখযোগ্য হারে।

এমনকি কেবল ভালোবাসা-জড়ানো নিবিড় আলিঙ্গনও স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনায় পরিচালিত এক গবেষণায় অংশ নেওয়া যুগলেরা প্রথমে পাশাপাশি বসে গল্প করেন, এরপর গভীর ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরেন একে অন্যকে। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, মহিলাদের ক্ষেত্রে কর্টিসোল হরমোন এবং রক্তচাপ দুই-ই হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে নারী-পুরুষ উভয়েরই শরীরে বন্ধনের হরমোন বলে পরিচিত অক্সিটোসিনের নিঃসরণ বেড়েছে। সাইকোসোমাটিক মেডিসিন জার্নালে এ সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

শারীরিক বেদনা উপশমেও ভালোবাসার ভূমিকা রয়েছে। এমআরআই পরীক্ষায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের যে অংশ ব্যথার অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, সুখী দম্পতিদের সেই অংশ অধিক কার্যকর হয়ে থাকে। প্রায় সোয়া লাখ ব্যক্তির ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, বিবাহিত ব্যক্তিদের মাথা ব্যথা, কোমর ব্যথা-জাতীয় উপসর্গ অবিবাহিতদের চেয়ে কম হয়। প্রকৃত ভালোবাসা জীবনকে সুখময় করে, মানসিক চাপ মোকাবিলা সহজ করে, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা কমায়, কমায় মাদকাসক্তির আশঙ্কাও।

ভালোবাসার যে স্বাস্থ্যকর একটা দিক আছে, তা জেনে হয়তো প্রেমিক-প্রেমিকারা আনন্দিতই হচ্ছেন। ভালোবাসা হতে পারে বাবা-মা, ভাই-বোন, সন্তান বা সহপাঠী-সহকর্মীর প্রতি। এমনকি পোষা জীবটির প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসাও আপনাকে দিতে পারে স্বাস্থ্যগত সুবিধাটুকু। তাই ভালোবাসুন। ভালোবাসুন আপনার সঙ্গী/সঙ্গিনীকে, আপনার আত্মীয়-বন্ধু-পরিজনকে, ভালোবাসুন মানুষ এবং সৃষ্টির সব জীবকে। ভালোবাসুন এবং সুস্থ থাকুন।

ছিপছিপে শরীর শুষ্ক ত্বক!

কম খেয়ে ওজন তো কমালেন, ত্বক আর চুলের দিকে নজর আছে তো? না খেয়ে শুকনো মুখটায় লাবণ্যের কমতি মনে হচ্ছে? কিংবা হাত দিলেই মুঠোভর্তি চুল উঠে আসছে না তো?

চটজলদি মেদ ঝরাতে গিয়ে অনেকেই দিনের পর দিন আধপেটা খেয়ে থাকেন। কখনো আবার না খেয়ে থাকেন দীর্ঘ সময়। অনেক দিন ধরে এমন চলতে থাকলে শরীরের ওজন হয়তো খানিকটা কমে ঠিকই। কিন্তু অন্যান্য অঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির ছাপ পড়ে যায়। সেটা কেমন হতে পারে, জানতে চেয়েছিলাম বারডেম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ পথ্য ও পুষ্টিবিদ শামছুন্নাহার নাহিদের কাছে। তিনি বলেন, ‘খাওয়াদাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়ে ওজন কমিয়ে কাঙ্ক্ষিত সৌন্দর্য আমরা পেতে চাই। কিন্তু কখনো দেখা যায় তার উল্টোটা ঘটছে। এমন অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় চুল ও ত্বক।’

এ অবস্থা থেকে কীভাবে রক্ষা পাওয়া যায়, সে সম্পর্কেও জানালেন শামছুন্নাহার নাহিদ—
বিশেষ কোনো ডায়েট অনুসরণ করার সময় পানি আর পানীয়-জাতীয় খাবার খেতে হবে বেশি করে।
অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন সি, এ, ই এবং আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। অর্থাৎ সবুজ, হলুদ, কমলা ও সাদা রঙের শাকসবজি ও ফল খেতে হবে প্রতিদিন।
ক্যারোটিন এবং ভিটামিন এ-সমৃদ্ধ ফল ত্বকের কোষ মেরামত করে ত্বককে সতেজ করে তোলে। আর এটা খাদ্যতালিকায় না রাখলে ত্বক ধীরে ধীরে মলিন হয়ে যায়। এ ধরনের কয়েকটি ফল হলো আপেল, কলা, জাম, খেজুর, আঙুর, পেঁপে ইত্যাদি।
আঁশযুক্ত শাকসবজি রাখতে হবে খাদ্যতালিকায়। ত্বককে সতেজ ও সুস্থ রাখবে এ সবজিগুলো।
ডায়েট করার সময় নিয়ম করে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা ঘুম খুব জরুরি। এ সময় ঘুমের ব্যাঘাতে চেখের নিচে কালি পড়তে শুরু করে।
আর রাত জেগে দিনে ঘুমালে ওজন কমানো কিন্তু কঠিন হয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে শরীর তার স্বাভাবিক সৌন্দর্যও হারায়।
ওজন কমাতে চাইলে খেতে হবে সুষম খাদ্য। আর কত ক্যালরি খাওয়া হলো তার হিসাব রাখতে হবে। ওজন কমাতে প্রয়োজন সঠিক মানের, প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ কিন্তু কম ক্যালরিযুক্ত সুষম খাদ্যের।
তাই প্রতিদিনের খাবার তালিকা থেকে মাছ, মাংস, ডাল, ডিম, দুধ, দই, ঘোল ও ছানা একদম ঝেড়ে না ফেলে খেতে হবে হিসাব করে।

কী ধরনের ক্ষতি হয়:

খাদ্যতালিকায় আমিষের অভাবে চুল ঔজ্জ্বল্য হারায়। চুলের আগা ফাটতে শুরু করে। চুল পড়তেও পারে। খাদ্যতালিকায় ভিটামিন এ-সমৃদ্ধ খাবার না থাকলে চুল রুক্ষ ও প্রাণহীন হয়।

অন্যদিকে ভিটামিন ই চুলের ঘনত্ব বৃদ্ধিতে আর ভিটামিন সি ত্বকের সৌন্দর্য বাড়াতে সাহায্য করে। কিন্তু খাদ্যতালিকায় এগুলো না থাকলে ঠিক উল্টোটা ঘটে।

এ ছাড়া ত্বক শুষ্ক, রুক্ষ ও লাবণ্যহীন হয়ে যায়, চোখের নিচে কালি পড়ে এবং ত্বকে বলিরেখা পড়তে শুরু করে

সিদ্ধার্থ মজুমদার

ব্যায়ামের সময়

আমরা আগের তুলনায় নিজেদের স্বাস্থ্য, সুস্থতা এবং সুন্দর ফিগারের বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন। আমরা জানি সু-স্বাস্থ্যের জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করার কোনো বিকল্প নেই। তবে ব্যস্ততা আমাদের জীবনে এভাবে জড়িয়ে রয়েছে যে মাত্র একঘণ্টা সময় খুঁজে বের করাও কঠিন।

সকালে অফিসের জন্য অনেকেই ব্যায়াম করার সুযোগ পাই না। অফিস থেকে ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। বাড়ি ফিরে আবার কত কাজ…ব্যায়াম করার সময় নেই। জানি এইতো বলবেন, কিন্তু সুস্থ থাকতে হলে কিছুটা সময় বের করতেই হবে।

কীভাবে? জেনে নিন:

সকাল

অনেকে ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসেই ব্যায়াম শুরু করেন। তবে এসময় ভারী ব্যায়াম না করাই ভালো। কারণ এক্সারসাইজের জন্য শরীরে যথেষ্ট পরিমানে এনার্জি থাকা প্রয়োজন
সময়ের অভাব থাকলে ঘুম থেকে ওঠার আধ ঘণ্টা পর হালকা জগিং বা মর্নিং ওয়ার্ক করুন
ঘুম থেকে ওঠার পর ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে কয়েক ঘণ্টা পর ব্যায়াম করুন
মনে রাখবেন কখনোই খালি পেটে ব্যায়াম করা যাবে না

বিকেল

ব্যায়াম করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে দুপুরের পর বিকেলে। মানে ঘুম থেকে ওঠার ৬ ঘণ্টা পর এবং ১২ ঘণ্টার মধ্যে
যাদের ভারী এক্সারসাইজের পরিকল্পনা রয়েছে তারা দিনের বেলার যেকোনো একটি সময় বেছে নিন
লাঞ্চ করার পর বসে না থেকে হালকা হাঁটুন।

সন্ধ্যা

বাড়ি ফেরার পথে কিছুটা পথ হেঁটেই অাসুন
হাঁটার সময় খেয়াল রাখবেন যেন ১০ মিনিটে ১ কিলোমিটার পথ যেতে পারেন
সন্ধ্যা বেলা এক্সারসাইজ করতে পারেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে অবশ্যই এক্সারসাইজ করার আগে রিল্যাক্স করুন। যাতে এক্সারসাইজ করার সময় ক্লান্ত ভাব না থাকে।
যোগব্যায়াম করার জন্য সন্ধ্যা সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
এসময় আপনি ট্রেডমিল বা সাইক্লিংও করতে পারেন

শারীরিক ক্ষমতা ও বয়স অনুযায়ী ব্যায়াম করবেন, ব্যাক পেইন বা শ্বাসকষ্ট থাকলে সব ধরনের ব্যায়াম করতে পারবেন না। তাই ব্যায়াম শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতো খাবার এবং জীবন যাপনের সঠিক পদ্ধতিগুলোও মেনে চলুন।

এখন শীতে অনেকেই ব্যাডমিন্টন খেলছেন তাদের আলাদা করে ব্যায়াম না করলেও চলে। ভারী ব্যায়াম করতে হলে অবশ্যই অনেক সময় নিয়ে ওয়ার্ম আপ করে নিন। নিয়মিত ব্যায়াম করে সুস্থ থাকুন…

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর

বিবাহ ও পারিবারিক জীবনে দাম্পত্য সমস্যার কারণ ও ধরণ

বিবাহ হলো একটা জটিল বাস্তবতা।তাই দাম্পত্য জীবন একেবারে সম্পূর্ন সমস্যা ও সংকটমুক্ত নয়।দাম্পত্য জীবনের চলমান বাস্তবতা চোরের মত যে কোন সময় ইচ্ছা অনিচ্ছা সত্ত্বেও যে কোন সমস্যা প্রবেশ করতে পারে।সমাজবিজ্ঞানীদের মতে দাম্পত্য সমস্যা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার।বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রুপে এর আবির্ভাব ঘটে।দাম্পত্য সমস্যা মূলত সৃষ্টি হয় দুজনের প্রয়োজনের চাহিদা থেকে।অর্থাৎ একজনের ও প্রয়োজনের চাহিদার সাথে অন্যজনের প্রয়োজনের চাহিদার মধ্যে সংঘর্ষ।

এই লেখায় মূলত দাম্পত্য সমস্যার কারণ ও ধরণ গুলো উল্লেখ করা হলোঃ

কারণ গুলো হলো বাহক অর্থাৎ যার জন্য সমস্যাগুলো দাম্পত্য জীবনে আসে,আর ধরণ গুলো এর হাবভাব অর্থাৎ এর রকম ও গুরুত্ব হিসেবে এর প্রভাব।

ক) সমস্যার কারণঃ এটাকে আমরা সমস্যার agent বলতে পারি।অর্থাৎ যার বা যাদের দ্বারা এই সমস্যার সৃষ্টি বা কারণ। দাম্পত্য সমস্যার পিছনে ৩ রকমের agent রয়েছে। তাহলো- ১) ব্যক্তি নিজে  ২।বিবাহের মূল উপাদানে এবং ৩। বাইরের বা পারিপার্শ্বিক কারণ।

১) ব্যক্তি নিজে কারণঃ বিবাহ একজন পুরুষ এবং একজন নারীর দাম্পত্য বন্ধন। স্বামী স্ত্রী উভয়ে এক হলেও তারা নিজস্ব বৈশিষ্ঠে ও স্বতন্ত্র জীবনবোধ নিয়ে সমৃদ্ধ।এখানে ব্যক্তি হিসেবে স্বামী স্ত্রী নিজেরাই দাম্পত্য সমস্যার কারণ হতে পারে।

যেমন-স্বামী স্ত্রীর শারীরিক কারণঃ
শারীরিক দীর্ঘকালীন রোগ ব্যাধি,অসুস্থ্যতা, শারীরিক দূর্বলতা, শারীরিক অক্ষমতা, ছোঁয়াছে রোগ, মানসিক বিকারগ্রস্থতা, ট্রমাটীক, সাইকিক, নিয়োরটিক, সিজোফ্রেনিক ,এলকোহলিক, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ইত্যাদি।

ব্যক্তিত্বঃ অন্তর্মূখী
যেমনঃ ঘরকোনা, চাপা স্বভাব, হীনমন্য, সন্দেহবাটিক, সংকীর্ণচেতা, নিঃসঙ্গ ও নিয়ন্ত্রণহীন আবেগ। আবার অন্যদিকে বহির্মূখী যেমন- অতিরিক্ত হৈহুল্লুর স্বভাব, সময় জ্ঞানের অভাব, বাইরে বাইরে সময় কাটানো, বন্ধু সার্কেল নিয়ে আড্ডা মারা, দায়িত্বজ্ঞান হীনতা ইত্যাদি।

দুর্বল ব্যক্তিত্বঃ পরনির্ভরশীলতা সিদ্ধান্তহীনতা, দায়িত্ব নেওয়ার অক্ষমতা, অন্যের কথায় কান দেওয়া, গোপনীয়তা রক্ষা না করার দুর্বলতা, মেরুদন্ডহীন হীনমণ্য, আস্থার অভাব, খুঁতখঁতে স্বভাব, নিজস্বতা রক্ষা করার দুর্বল মানসিকতা, সন্দেহপ্রবণ ইত্যাদি।

ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বঃ আত্ন-অহমিকা, ব্যক্তিমর্যাদা ক্ষুন্ন করা, দমনীয় ভাব, নমনীয়তার অভাব, কতৃত্বপরায়ণতা, অতিরিক্ত মেজাজ ও আবেগ প্রবণতা, গ্রহণশীলতার অভাব, প্রবল আত্ন-মর্যাদা বোধ, স্বার্থপরতা, পেশী শক্তি প্রয়োগ প্রবণতা, অস্বচ্ছলতা, গোয়াতুর্মি ভাব, অনাস্থা আপোষহীন মানসিকতা, জেদ, জবাবদিহিতার ভাব, দোষ খোঁজার মানসিকতা ইত্যাদি।

২।বিবাহের মূল উপাদানঃ দুজন নর-নারীর পারস্পারিক সন্মতির বিনিময়ই বিবাহ।সন্মতির মধ্যে যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে সেটাই বিবাহের মূল উপাদান।আর দাম্পত্য জীবনে বিবাহ প্রতিশ্রুতি এই উপাদানের অনুপস্থিতি এবং এর অভাবই দাম্পত্য সমস্যার কারণ।

যেমন- ভালবাসার অভাব, বিশ্বাস ও বিশ্বস্ততার অভাব, যৌনাচার,বহুগামিতা, দৈহিক যৌন সম্পর্কে অক্ষমতা, পুরুষত্বহীনতা, সমকামিতা, যৌনবিকৃতি, পাশবিকতা, যৌন মিলনের অনিহা এবং এড়িয়ে চলা, সন্তান দানে অক্ষমতা, দায়িত্বজ্ঞানহীন ভবঘুরে, ভুল সঙ্গী নির্বাচন।

৩।পারিপার্শ্বিক কারণঃ এখানে বাইরের কোন শক্তি বা তৃতীয় কোন শক্তি বা পক্ষ পারিপার্শ্বিক কোন এজেন্ট দাম্পত্য সমস্যার কারণ হয়ে আসে।এর মধ্যে পিতা, মাতা, ভাই বোন, শশুর শাশুড়ি, দেবর ননদ, ননাশ, কোন মিথ্যা গুজব, অন্যের পক্ষপাতিত্য মনোভাব, অন্যের অতিরিক্ত আবেগ সোহাগ, ঈর্ষা প্রতিহিংসা, মদ-নেশা। অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা, বেকারত্ব চাকুরী পেশা, অসৎ ব্যবসা, মোবাইল, ফেসবুক, বন্ধুত্বের সম্পর্ক, অসততা, অতীত টেনে আনা রকমারি, বশ করা চাকুরীর তাগিদে দূরে অবস্থান।

খ) সমস্যার ধরণঃ

এই দাম্পত্য সমস্যার যে কারণগুলো রয়েছে এইগুলোর আবার গুরুত্বের মাপকাঠিতে তিন রকম এর পর্যায় বা ধরণ রয়েছে।

এই গুলো হলো –
ক।মৌলিক সমস্যা, ২।অ-মৌলিক সমস্যা ও ৩।অযৌক্তিক বা বিরক্তিকর সমস্যা।

১।মৌলিক সমস্যাঃ বিবাহের যে মূল ভিত্তি এবং দাম্পত্য সম্পর্কে (Basic Problem) যে মূলশক্তি এবং নীতি তার মধ্যে যে দুর্বলতা এবং অভাবই হলো এই মৌলিক সমস্যা।আর যখন এই মূলভিত্তি এবং শক্তি দুর্বলতা প্রকটভাবে দাম্পত্য সম্পর্কে সক্রিয় হয়ে ওঠে তখন দাম্পত্য জীবনটাকে ভয়ানক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।তখন সেটা দাম্পত্য জীবন টিকিয়ে রাখার জন্য বড় হুমকিস্বরুপ হয়ে দাঁড়ায়।বিবাহের মূল হলো পারস্পারিক ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা, একতা ও সম্পূর্ণ আত্ন-দান।পরস্পরের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মর্যাদাদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকা পারস্পারিক দাম্পতিক দায়িত্বশীলতায় স্বচ্ছলতা এবং সর্বোচ্চ নিশ্চয়তা দান।

এক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর পারস্পারিক ভালোবাসার অভাব,অবিশ্বস্ততা, পর-পুরুষ পর নারীতে আসক্তি,সম্পর্কে বহুগামিতা,ব্যভিচার,শারিরিক দুর্বলতা অক্ষমতা,শারীরিক যৌন সম্পর্ক গড়তে ব্যর্থতা এবং অনীহা, যৌন বিকৃতি এবং সমকামিতা, একেবারেই ভুল সঙ্গী নির্বাচন, মানসিক বিকার গ্রস্থতা, ব্যক্তিত্বে দুর্বলতা, পরনির্ভরশীলতা, সন্দেহবাতিকতা এবং দায়িত্ব কর্তব্যে উদাসীনতা এবং অবহেলা, প্রতারণা, অসততা, নেশাসক্তি।

২।অ-মৌলিক সমস্যাঃ এটা মূলে কোন সমস্যা নয় যা দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট করে দেওয়া বা শেষ করে দিতে পারে তবে এটা প্রতিদিনের সম্পর্কের মধ্যে অশান্তি অস্থিরতা এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যায়।

যেমন-মদ-নেশা, শারীরিক মানসিক নির্যাতন, সবকিছুতে সামান্য কিছুতে উত্তেজনা-রাগারাগি, অধৈর্য ও তর্কাতর্কি, দুর্বল ব্যক্তিত্ব, গুজবে বিশ্বাস করা, সময় সমর্থন না দেওয়া, টাকা পয়সা বেতনভাতার অস্বচ্ছতা, পেশাগত গোপনীয়তা, মিথহ্যাচার, তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ও বাড়াবাড়ি, অভাব-অর্থ সংকট ও বেকারত্ব, যৌন সম্পর্কে স্বার্থপরতা এবং অবিবেক হওয়া,স্বামী বিদেশে থেকে স্ত্রী সন্তান্দের জন্য টাকা না পাঠানো, স্বামী স্ত্রীর কাজ ও মর্যাদার লড়াই, ব্যক্তিত্বের সংঘাত দ্বন্দ্ব, অসামাজিক কার্যকলাপ, অর্থনৈতিক জীবন ও ব্যবসা।

৩।বিরক্তিকর সমস্যাঃ

এই সমস্যা সচরাচর দাম্পত্য জীবনে সম্পর্কে এবং পরিবারে একটু না একটু লেগেই থাকে বা স্বামী স্ত্রীর উভয়ের অসচেতনতার জন্য বা ইচ্ছাকৃত হয়ে থাকে।এইগুলি হলো বিরক্তিকর সমস্যা যা সয়ে যায়, আবার সময় সময় মাথা গরম করে আবার অবান্তর জ্বালান্তর সৃষ্টি করে।

যেমন- ছোট ছোট বিষয়ে খুঁত ধরা, পরস্পরকে appreciate না করা, সময়মত কিছু না করা, সময় না দেওয়া, পক্ষাবলম্বন করা, যার যার বাবা মার পক্ষে কথা বলা, ঠিক সময়ে ঘরে না ফেরা, একে অন্যের সমন্ধে এবং তাদের পরিবার নিয়ে খোঁচা মেরে কথা বলা, সময়মত বাজার না করা, মোবাইলে লুকিয়ে বা এড়িয়ে কথা বলা, দাম্পত্য যৌন সম্পর্কে পরস্পরকে না বোঝা, মিথ্যা কথা বলা, কাজের সঠিক মূল্যায়ন না করা, পরস্পরের কাজের খোঁজ খবর না রাখা, অসুস্থতায় খেয়াল না করা, পরস্পরের যত্নে খেয়ালে ঘাটতি, সংসারের প্রয়োজনে বেখেয়ালীপনা, নেশায় বদ অভ্যাস, জেদ,কথা ও আচরনে রুক্ষতা,পরস্পর কথা বন্ধ করে দেওয়া, রান্না-বান্নার ব্যাপারে বিরুপ মন্তব্য করা, পরস্পর চাহিদা পূরনে খেয়ালীপনা এবং অনীহা,গুজবে কান দিয়ে ভুল বুঝা,অতীত টেনে আনা, স্বামী স্ত্রির কথা অন্যকে বলে দেয়া, কোন ঘটানা লুকানোর চেষ্টা,সন্তান না হওয়ার ব্যাপারে পরস্পরকে দোষারোপ করা, প্রয়োজনে ডাক্তারের কাছে না যাওয়া, বৌ শাশুড়ি ও শুশুরের মধ্যে আন্তরিকভাবে গ্রহন না করার জের, অহেতুক সন্দেহ, কোন কিছু চাওয়া পাওয়ার অধৈর্য হওয়া,অতিরিক্ত পীড়াপীড়ি, অন্যেরটা দেখে তুলনা করা, সংসার স্রোতে নতুনত্বের অভাব, বিনোদনের অভাব, সংসারে অভাব, গায়ে হাত তোলা, পারিবারিক কড়াকড়ি নিয়ম, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রন করা, অবহেলার কারণে এই সব বিরক্তিকর সমস্যাগুলি বড় আকার ধারণ করতে পারে।

আবার অন্যদিকে উভয়ের সচেতনতা, প্রয়োজনীয় আন্তরিক পদক্ষেপ এবং পারস্পরিক ক্ষমা,সহনশীলতার মধ্য দিয়ে অনেক মৌলিক গুরুতর সমস্যারও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ উন্মুক্ত করতে পারে।

ডঃ ফাদার মিন্টু এল, পালমা

নিঃসঙ্গ জীবন বয়ে আনে হতাশা

বর্তমান কর্মব্যস্ত পৃথিবীতে যারা একাকী বসবাস করেন তাদের হতাশায় ভোগার আশঙ্কা প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায় বলে জানিয়েছেন ফিনিশ গবেষকরা। গবেষণায় বলা হয়, নিঃসঙ্গ নারীদের জন্য বাসস্থানের পরিবেশ এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে সামাজিক আনুকূল্যের অভাব ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জরিপে দেখা যায়, গত তিন দশক ধরে পশ্চিমা দেশগুলোতে একা বসবাসকারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে প্রতি তিনটি বাড়ির মধ্যে একটি বাড়িতে বসবাসকারী পরিবারের সদস্যসংখ্যা মাত্র একজন। একা বসবাসকারীদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করার জন্য কোনো না কোনো ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলেছে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সক্রিয় একটি সংস্থা। জনস্বাস্থ্য বিষয়ক জার্নাল ‘বায়োমেড সেন্ট্রাল’ এ প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয় বলে শুক্রবার জানিয়েছে বিবিসি।

এ গবেষণায় ফিনল্যান্ডের ৩ হাজার ৪ শ’ ৭১ জন হতাশাগ্রস্ত মানুষের মানসিক মন্দা রোধে ওষুধ ব্যবহারের প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করা হয়। এদের মধ্যে ১ হাজার ৬শ’ ৯৫ জন পুরুষ ও ১ হাজার ৭শ’ ৭৬ জন নারী। তাদের জীবনযাপন সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করার পর দেখা যায়, ২০০০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে বসবাসকারীদের তুলনায় একা বসবাসকারীদের মধ্যে হতাশাগ্রস্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি।

গবেষক দলের প্রধান ড. লরা পুলক্কি-রাবাক বলেন, এ ধরনের গবেষণাগুলোতে সাধারণত ঝুঁকিগুলো খুব পরিষ্কারভাবে প্রকাশ পায় না। এমনকি এদের মধ্যে কতজন মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বাইরে আছে তাও পরিষ্কার নয়। তবে পরিবারের সঙ্গে বসবাসকারীদের জন্য বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ থাকায় তারা মানসিক ও সামাজিক সহযোগিতা পায় বলে তাদের মধ্যে হতাশাগ্রস্ত হওয়ার প্রবণতা কম দেখা দেয়। আর আলোচনা না করতে পারার কারণেই বেশি হতাশায় ভোগেন একা বসবাসকারীরা।

সুত্রঃ- দৈনিক ইত্তেফাক