সংখ্যাতত্ত্বে বিচ্ছেদ

ডিভোর্স শব্দটির আভিধানিক অর্থ বিবাহচ্ছেদ অথবা বিবাহবিচ্ছেদ। বিবাহিত নর-নারীর জীবিত অবস্থায় আইনগত বিবাহ-সম্পর্কের পরিসমাপ্তিই ডিভোর্স। শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গ্রামবাংলার নারীদের মুখ ও তাঁদের পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক কষ্ট। আমাদের সমাজে নারীর জন্য অভিশপ্ত জীবন বয়ে আনে ডিভোর্স। চিরায়ত নারীর কাছে স্বামীর ঘরই যেন সকল নিরাপত্তার এবং শান্তির আশ্রয়। পক্ষান্তরে পুরুষেরা ডিভোর্সের মাধ্যমে পুনর্বিবাহের সুপ্ত বাসনা কায়েমের সুযোগ খুঁজে পায়। এটা যেন সামাজিক রীতি। শহর অঞ্চলে ডিভোর্সের পরিব্যাপ্তির রূপ ভিন্ন। ডিভোর্স যেন স্বাধীনতা বা অধিকারের ঢাল। মেয়েরাই ছেলেদের তুলনায় বেশি ডিভোর্সের আবেদন বেশি করে। পরকিয়া (বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক )বা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে তিক্ততা ডিভোর্সের অন্যতম কারণ,  যা নারীর অধিকার রক্ষার হাতিয়ার। পাশ্চাত্যে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ডিভোর্সের হার পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ৫০ শতাংশ বিবাহ ডিভোর্স পর্যন্ত গড়ায়। ৬৭ শতাংশ দ্বিতীয় বিবাহ ভেঙে যায়। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে বিবাহচ্ছেদের হার কমে যাচ্ছে। কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে বিবাহচ্ছেদের আর্থিক অক্ষমতা।

ডিভোর্সের একটি সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান

আমাদের দেশে ডিভোর্সের হার দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল অনুসারে, মার্চ ১৯৯৫ থেকে মার্চ ২০১৩ পর্যন্ত সারাদেশে ডিভোর্সের আবেদন পড়েছে ১৭৩০, যার মধ্যে ঢাকায় ১৩১৭, চট্টগ্রামে ১৩৭, বরিশালে ১০১, খুলনায় ৭২, সিলেটে ৪৮ এবং রাজশাহীতে ১ টা।

২০১৮ সালের জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলোতে উঠে আসে বিগত বছরগুলোর বিচ্ছেদের হারঃ

ঢাকা ঊত্তর সিটিতে ডিভোর্সের আবেদন পড়ে – ২০১২ সালে ২,৮৮৮ টি,  ২০১৩ সালে ৩,২৩৮ টি, ২০১৪ সালে ৪,৪৪৫ টি, ২০১৫ সালে ৪,০৭৭ টি, ২০১৭ সালে ৫,০৪৬ টি

ঢাকা দক্ষিন সিটিতে ডিভোর্সের আবেদন পড়ে – ২০১২ সালে ৪৫১৮ টি, ২০১৩ সালে ৪,৪৭০ টি, ২০১৪ সালে ৪,৬০০ টি, ২০১৫ সালে ৪,৮৯৭ টি, ২০১৭ সালে ৫,২৪৫ টি

ডিভোর্স কেন হয়

ডিভোর্সের কারণ বহুবিধ। এটা গ্রাম ও শহরে বা শিক্ষিত ও অশিক্ষিত প্রভৃতি বিভিন্ন ডিসকোর্সে প্রভাবিত। গ্রাম অঞ্চলে ডিভোর্সের প্রধান কারণ যৌতুক। এছাড়া স্বামী কৃর্তৃক স্ত্রীকে নির্যাতন, সন্তান না হওয়া, ছেলে সন্তান না হওয়া, যৌনজীবনে অক্ষমতা, বহুবিবাহ, স্ত্রী বা স্বামীর মানসিক রোগ অন্যতম কারণ। অন্যদিকে শহর অঞ্চলে পরকিয়া, স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে নির্যাতন, সন্তান না হওয়া, স্বামী স্ত্রীর দ্বন্ধ, ব্যক্তিত্বের সমস্যা, যৌনজীবনে অক্ষমতা, মাদকাসক্তি. দ্বন্ধ নিরসনে দক্ষতার অভাব ডিভোর্সের প্রধান কারণ।

যুক্তরাজ্যের বিবাহসম্পর্কিত এক রিপোর্টে গ্রান্ট থরন্টম ডিভোর্সের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে নিম্নরূপ পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন:

  • বিয়েবহির্ভূত শারীরিক সম্পর্ক ও স্বামী-স্ত্রীর বিশ্বাসভঙ্গ ২৭ শতাংশ
  • পারিবারিক নির্যাতন ১৭ শতাংশ
  • মধ্যবয়সের ক্রাইসিস ১৩ শতাংশ
  • মাদকাসক্তি (অ্যালকোহল আসক্তি ও গ্যাম্বলিং ) ৬ শতাংশ
  • কর্মক্ষেত্রে অ্যালকোহল আসক্তি ৬ শতাংশ পরকিয়ার কারণে পুরুষ ৭৫ শতাংশ এবং নারী ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী।

বাংলাদেশ মুসলিম আইন রেজিস্ট্রারের সাধারণ সম্পাদক কাজী ইকবাল হুসাইনের মতে, ডিভোর্সের অন্যতম কারণ পারিবারিক নির্যাতন যা নারী-পুরুষ উভয়ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

ডিভোর্সের মানসিক প্রভাব

ডিভোর্স শুধু স্বামী বা স্ত্রীর আইনগত বিচ্ছেদ নয়। এর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক বিচ্ছেদ, মানসিক বিচ্ছেদ এবং সর্বোপরি সন্তানের সাথে তাদের সামগ্রিক সম্পর্কের টানাপড়েন। ডিভোর্স যে দেয় এবং যাকে দেয়া হয়- দুজনের উপরই ভিন্ন মানসিক প্রভাব পড়ে। যে ডিভোর্স দেয় সে ভীতিবোধ, নির্ভার, দূরত্ববোধ, অসহিষ্ণুতা, বিরক্তিবোধ, সন্দেহ ও অনুশোচনায় ভোগে। আর যাকে ডিভোর্স দেয়া হয় সে হতবিহ্বল, প্রতারিত, আত্মনিয়ন্ত্রণহীন, নির্যাতিত, আত্মমর্যাদা হ্রাস, নিরাপত্তাহীনতা বোধ করে। তারপর ক্রোধের মাঝে সান্ত্বনা খুঁজতে থাকে। ডিভোর্স হঠাৎ করে হয় না। ডিভোর্স একরাতে বা একটি দুর্ঘটনার ফল না। ডিভোর্সে শারীরিক বিচ্ছেদের পাশাপাশি মানসিক বিচ্ছেদ হয়ে থাকে। মানসিক বিচ্ছেদ বিভিন্ন ধাপে হয়ে থাকে যা কয়েক বছর ধরে চলতে পারে। আবেগী বিচ্ছেদের ধাপগুলো নিম্নরূপ:

ভ্রান্তিকর চিন্তা (যা মৌখিক প্রকাশের ১-২ বছর আগে শুরু হয় )

  • ভ্রান্ত অসন্তুষ্টি, অবিশ্বাস, তর্ক, বিরক্তি
  • বাস্তব সমস্যা অস্বীকার
  • দূরত্ব বৃদ্ধি ও পারস্পরিক আস্থাহীনতা
  • বিচ্ছেদের স্ট্রাটেজি ঠিক করা
  • এ সময়ের অনুভূতি: ভয়, অস্বীকৃতি, দুশ্চিন্তা, অনুশোচনা, ভালোবাসা, রাগ, বিষন্ণতা, শোক।

অসন্তুষ্টি প্রকাশ (আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ৮-১২ মাস পূর্বে )

  • অসন্তুষ্টি প্রকাশ বা উভমুখী আচরণ
  • বিবাহ কাউন্সেলিং
  • এ সময়ের অনুভূতি: দায়হীন, টেনশন, রাগ, অনুশোচনা, তিক্ততা, সন্দেহ, শোক।

বিবাহচ্ছেদের সিদ্ধান্ত (আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ৬-১২ মাস আগে )

  • আবেগের দূরত্ব তৈরী
  • কেউ কেউ ভ্রান্তিকর চিন্তার মধ্যে থাকে
  • উভয়ে নিজেকে নির্যাতিত মনে করে
  • এ সময়ের অনুভূতি: রাগ, বিরক্তি, বিষন্ণতা, পরিবার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, অন্যের প্রতি অসহিষ্ণুতা।

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কাজ করা (আইনি পদ্ধতি শুরু )

  • শারীরিক বিচ্ছেদ
  • মানসিক বিচ্ছেদ
  • নিজেকে পুনঃপ্রস্তুত করা
  • সবার সাথে ডিভোর্স নিয়ে কথা বলা
  • আইনি পদ্ধতি গ্রহণ
  • বন্ধু-পরিবারের পক্ষাবলম্বন
  • ছেলেমেয়েদের দায়িত্ববোধ
  • এ সময়ের অনুভূতি: আঘাতবোধ, আতঙ্কগ্রস্ততা, ভয়, লজ্জা, অনুশোচনাবোধ, ও দোয়ারোপ।

গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো (আইনি পদ্ধতি গ্রহণকালীন বা পরে )

  • শারীরিক ও মানসিক অ্যাডজাষ্টমেন্ট
  • বিবাহ সুখ বা পরিপূর্ণতা আনে না বলে মনে করা
  • নিজের মধ্যে শক্তি ও নিয়ন্ত্রণবোধ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নিজেকে নতুন করে পরিচয় দেওয়া, নিজেকে মেধাবী ও সম্পদের অধিকারী মনে করা
  • আত্মনিয়ন্ত্রণবো: মন আগের চেয়ে ভালো থাকা ও জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ গ্রহণের আনন্দ অনুভব করা

নতুন করে শুরু ( আইনি প্রক্রিয়া শেষ করা থেকে পরবর্তী ৪ বছরের মধ্যে )

  • অভিযোগ ও রাগ বাদ দিয়ে মাফ দেওয়া ও সম্মান প্রদর্শন, নতুন করে জীবন সূচনা করা
  • অনুধাবন: অন্তর্দৃষ্টি, গ্রহণযোগ্যতা, সামগ্রিক সম্পৃক্ততা, তুলনামূলক সন্তুষ্টি ও আইনি বিবাদ শেষ করা। ডিভোর্সর প্রভাব স্বামী, স্ত্রী, সন্তান ও তাদের পরিবারে পড়ে থাকে। ডিভোর্স হলে একজন নারীর পরিবার তার প্রতি অনেকসময় সহযোগিতামূলক আচরণ করে না। নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক স্টিগমা তাকে তার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। অর্থনৈতিকভাবে সে দরিদ্রতায় নিমজ্জিত হয়। শারীরিকভাবে সে অসুস্থ হয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, বিধবা নারী বা পুরুষের অল্প বয়সে মৃত্যুর হার অন্যদের চেয়ে বেশি। ডিভোর্সের মানসিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি। মানসিকভাবে একজন বিধবা নারী বা পুরুষ অন্যদের চেয়ে বেশি অসুখী থাকে। দুশ্চিন্তা, বিষন্ণতা, মাদকাসক্তি এবং আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারে। পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিকভাবে তাকে ভিন্ন চোখে দেখা হয়।

ডিভোর্স যখন আশীর্বাদ

কখনও কখনও ডিভোর্স জীবনে ভালো প্রভাব ফেলে। কোনো কোনো নারী ডিভোর্সকে প্রশান্তিকর মনে করে। এতে তার বিবাহিত জীবন অতিমাত্রায় তিক্ততায় ভরে যায় না এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণ হয় না। কাথনিল ও কন্নেল করকরাণের মতে, ডিভোর্স একজন নারীর জীবনে মা ও স্ত্রীর ভূমিকা ছাড়াও নতুন ক্যারিয়ার, সামাজিক যোগাযোগ এবং নিজের ও পেশাগত ভূমিকা পালনে সুযোগ করে দেয় যার তার মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি করে।

বিবাহ বা বিবাহচ্ছেদ দুটিই সামজিক প্রথা। এটা সভ্যতার বিকাশে আদিম অসভ্য মানুষকে সভ্য মানুষ হিসেবে একবিংশ শতাব্দিতে পৌঁছে দিয়েছে। বিবাহ মানুষকে নিয়ম-শৃঙ্খলা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্য উপায়ে বংশানুক্রমিক করে তোলে। পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও পারিবারিক কাঠামো গঠনের মাধ্যমে সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে। বিবাহ তাই সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ রীতি। কিন্তু কখনও কখনও অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। তাই বিবাহবিচ্ছেদ সর্বদা নেতিবাচক না হয়ে ইতিবাচকও হতে পারে।

লিখেছেনঃ

ডা. মো. রশিদুল হক
এমবিবিএস (ডিএমসি ), বিসিএস (স্বাস্থ্য),এফসিপিএস(সাইকিয়াট্রি )
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ও রেজিষ্ট্রার, মানসিক রোগ বিভাগ
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

পারিবারিকভাবে আয়োজিত বিয়ে এবং এরপর…

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মনে হচ্ছে বাসায় আমার জন্য যে পরীক্ষা অপেক্ষা করছে সেই পরীক্ষার কোন প্রশ্নের উত্তরই আমি জানি না। কারণ এইমাত্র পারিবারিকভাবে ঠিক করা এক পাত্রের সাথে আলাপ করে এলাম আর অবজেকটিভ পরীক্ষার মত এখনই ওই পাত্রের প্রাপ্ত নম্বর আমাকে আমার পরিবারের কাছে বলতে হবে। যার উত্তর আমার জানা নেই। আপন মনে এসব ভাবতে ভাবতেই শীলা পৌঁছে গেল দরজার কাছে, কিন্তু বেল আর বাজাতে পারছিল না আসন্ন পরীক্ষার ভয়ে। এ ধরনের অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় বহু মেয়েকেই তার জীবনে এবং সে সময় তার পাশে দাঁড়াবার কেউ থাকে না। জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তের সামনে এসে অসহায়ের মত একাকী দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

এখনও প্রেমের বিয়ের পাশাপাশি পারিবারিকভাবেও প্রচুর নারীর বিয়ে ঠিক করা হয়। কিন্তু এ ধরনের ক্ষেত্রে একজন পাত্র ও পাত্রীর মধ্যকার দূরত্ব রয়ে যায়, একে অপরকে না বুঝে জীবনসঙ্গী হিসেবে মেনে নেন যা ভবিষ্যত্ জীবনের ক্ষেত্রে কখনও কখনও বেশ বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পারিবারিকভাবে বিয়ে ঠিক করার জন্য শহরে শহরে বহু ঘটক রয়েছে বা পত্রিকা খুললেই পাত্র চাই বা পাত্রী চাই এমন অনেক বিজ্ঞাপন আমাদের চোখে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায়, বিয়ে সংঘটনের জন্য ঘটকরা দুই পক্ষেরই বহু তথ্য একে অপরের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে যা পরে প্রকাশিত হলে পারিবারিক দ্বন্দ্বের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন বিয়ের আগে পাত্র বা পাত্রীর কারও সাথে কোন ধরনের প্রেমের সম্পর্ক, নানা ধরনের সমস্যা বা অসুস্থতা এসব। ঘটকালিকে ব্যবসা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ায় এ ধরনের সমস্যা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগে আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবই ঘটকালির কাজটি করতেন। কিন্তু এখন কখনও কখনও সম্পূর্ণ অজানা দুই ভিন্ন পরিবারের মধ্যেও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় বাণিজ্যিকভাবে ঘটকালির মধ্য দিয়ে; যেমনটি শুনছিলাম মোনার কাছে।

একজন ঘটকের সাথে মোনার (ছদ্মনাম) বিয়ের জন্য যোগাযোগ করা হয়েছিল। তাদের মাধ্যমেই আতিকের সাথে ওর পরিচয়। ওদের প্রথম দেখা হয় টি.এস.সিতে। আতিকের বাবা, মা বা পরিবারের কাউকেই চিনত না মোনার পরিবার। যখন দেখা করতে যায় মোনার মনে হচ্ছিল সারা জীবন অবিবাহিত থাকাও এর চেয়ে ভাল। মোনা বলে, প্রথম দিনে ভাইবা পরীক্ষা দিলাম। আমার পছন্দ- অপছন্দ, রান্না-বান্না পারা না পারা, আগের জীবন, ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা ইত্যাদি নানাকিছু। আমি একটু চাপা স্বভাব আর পরিবেশ খুব অস্বস্তিজনক হওয়ায় তার কাছ থেকে কিছুই উদ্ধার করতে পারলাম না। তাই প্রথম দিন শেষে দেখা হওয়া সত্ত্বেও আতিকের ব্যাপারে আমার জ্ঞান ঘটকের দেয়া বায়োডাটা পর্যন্তই রয়ে গেল, যদিও ওর আমার সম্পর্কে জ্ঞান অনেক বাড়ল। বাসায় এসে চাপ যে, মাস্টার্সের রেজাল্ট দিয়ে দিয়েছে এখনই বিয়ে করতে হবে, তাই দেরি না করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাসার সবাই এ বিয়েতে একমত যেন এক বোঝা থেকে মুক্তি। বাবার তাই এক কথা, এত বোঝাবুঝির কিছু নেই বিয়ে কর। মনে হল জুয়া খেলছি জীবন নিয়ে। পরিবেশের চাপে পড়ে রাজি হলাম। পরে জানলাম সিগারেট, নেশা, আগে ক্লাসমেটের সাথে প্রেমের সম্পর্ক এসব নানা তথ্য। যার কিছুই বিয়ের আগে আমার জানা ছিল না। ঘটক বলেছিল এসব কোন সমস্যাই নেই, যার সবই মিথ্যা। মানুষকে সরল মনে বিশ্বাস করে ভুল করেছিলাম। তাই সেই ভুলকে সাজা হিসেবে মেনে নিয়েই জীবন চালিয়ে যাচ্ছি।

তাই পারিবারিকভাবে আয়োজিত বিয়ের ক্ষেত্রে এক পরিবারের অন্য পরিবার সম্পর্কে কিছু হলেও জানা থাকলে ভাল। নইলে নিজেদের খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করতে হবে, শুধু বাণিজ্যিক কোন সংগঠনকে বিশ্বাস করা উচিত না। যেহেতু একজন মেয়েকে তার সারাজীবন কাটাতে হবে তাই তাকে বিয়ের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নেবার এবং নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেবার স্বাধীনতা দিতে হবে। এক্ষেত্রে পারিবারিকভাবে কোনরূপ প্রভাবিত করার চেষ্টা করা উচিত নয়। কেননা প্রত্যেকের জীবন প্রত্যেকের। অনেক সময় নিজের পছন্দসই ছেলে বা মেয়েকে পাবার জন্য নিজেকে অপরের কাছে পরিবর্তিত করে পরিবেশন করে থাকে বা পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারে একে অপরকে ভুল তথ্য দিয়ে থাকে। যা পরস্পরের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করে। নিজে যেরকম সে রূপকে অপরের সামনে তুলে ধরতে হবে, কেননা এক সময় না এক সময় সত্য প্রকাশ পাবেই। যা সম্পর্ক ভাঙ্গা গড়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

পারিবারিকভাবে আয়োজিত বিয়ের ক্ষেত্রে নতুন বাসা, নতুন পরিবারের সাথে খাপ খাওয়ানোর পাশাপাশি সম্পূর্ণ অচেনা নতুন একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে মেনে নিতে হয়। বছরের পর বছর বাবা- মায়ের সাথে থেকে যে স্বভাব গড়ে উঠেছে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে রাতারাতি তা বদলানো সম্ভব নয়। আবার দুটি পরিবার কখনই এক হতে পারে না। তাই বাবার বাড়ির মত শ্বশুরবাড়িও একইরকম হবে, সব মিলে যাবে এমন কল্পনাও করা অর্থহীন। বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাই বুঝে চিন্তা করে নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার মন-মানসিকতা তৈরি করে নিতে হবে। জীবনসঙ্গী নির্ধারণে শুধু সে নয় তার পরিবারকেও বুঝতে হবে। কেননা বিয়ের পর শুধু তাকে নয় তার পরিবারকেও আপন করে নিতে হবে। মেয়েটির অবস্থা বিবেচনা করে শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকেও এক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

লিখেছেনঃ সামিহা সুলতানা অনন্যা
সুত্রঃ ইত্তেফাক