ভাঙার আগে-পরে

আমি ওকে কেবল আবার একটা ফোন দিতে চাই। যদিও আমি জানি এটা ঠিক হবে না। ও কেবলই আমার সঙ্গে চিৎকার ও দুর্ব্যবহার করবে আমি জানি। এটা ভেবেই আমি ভয় পেয়ে যাই। আমি বাইরে কাজ-কর্ম করতে পারছি না। একেবারেই মনোযোগ দিতে পারছি না। আমি চিৎকার করে সবাইকে বলে দিতে চাই যে, আমি ভালো নেই। কিন্তু আমি জানি, তারা আমাকে কাপুরুষ ভাববে। আমি স্বপ্নাকে ছাড়আর কিছুই ভাবতে পারছি না। আমি দিনে দিনে নিঃশেষ হতে যাচ্ছি।

এটি সম্প্রতি বিয়ে ভেঙে যাওয়া এক পুরুষের নীরব আর্তচিৎকার। তিনি ভেবেছিলেন সম্পর্কটি পুনরুদ্ধার করা যায় কিনা। স্ত্রী ও সন্তান থেকে দূরে থাকার ভয়ে তিনি ভীত। হতাশা আর অপরাধবোধ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাকে। কাজকর্মে নিজেকে আগেরমতো সক্রিয় রাখতে পারছেন না।কোনো অন্তরঙ্গ সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার পর এমন প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক নয়। পুরুষ বা নারী যেকারো জন্যই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া এক তীব্র মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয় হিসেবে কাজ করে। বৈবাহিক সম্পর্ক আমাদের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বৈবাহিক সম্পর্কে ‍সুখী হওয়া না হওয়া নানা বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। আবার বিবাহিত জীবনের নানা পর্বের পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোও বেশ কঠিন বিষয়। অবাস্তব প্রত্যাশা, দায়িত্বহীনতা, স্বামী বা স্ত্রীর কাজের মাত্রা-ধরণ, শ্বশুড়-শাশুড়ি ও পরিবারের অন্য সব সদস্যের সাথে মানিয়ে চলা, আর্থিক সমস্যা, যোগাযোগ দক্ষতার অভাব, অবিশ্বস্ততা বৈবাহিক সম্পর্কে চিড় ধরাতে ভূমিকা রাখে।

সম্পর্কে বিচ্ছেদ ধরার ক্ষেত্রে একক কোনো কারণ নেই। এটি শুরু হয় নানা প্রকিয়ার ভেতর দিয়ে। কখনও কখনও একজন সঙ্গী আলাদা থাকার হুমকি দিয়ে অন্য সঙ্গীর আবেগীয় প্রতিক্রিয়া যাচাই করে নেয়। এই সংসারে আমি আর পারছি না। আমি চলে যাবো। এ জাতীয় কথাবার্তা মূলত যিনি সম্পর্ক ছেড়ে দিতে চান তার থেকেই বেশি শোনা যায়। বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত আরও একধাপ এগিয়ে যায় যখন কোনো একজন সঙ্গী বলতে শুরু করেন, আমি কালই উকিল নোটিশ পাঠিয়ে দেবো। আমি তোমার কাবিনের টাকা জোগাড় করে ফেলেছি। তুমি চলে যেতে পারো, ইত্যাদি। যদিও মনোবিজ্ঞানীরা ভালোবাসা এবং ঘৃণাকে একই অনুষঙ্গ হিসেবে দেখে থাকেন। আত্মহত্যার ক্ষেত্রে আমি মরতে চাই যেমন বেঁচে থাকার আকুতি বহন করে, একইভাবে আমি ডিভোর্স চাই এটিও কখনও কখনও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার আবেদন।

সম্পর্ক বিচ্ছেদ সবসময় বেদনাদায়ক না-ও হতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে বিচ্ছেদের মাধ্যমে ব্যক্তি যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে পারে। দুটি সত্য ঘটনা তুলে ধরা যাক।

ঘটনা -১

ষাট বছরের রীতা (ছদ্মনাম )সারা জীবন স্বামীর অত্যাচার, যন্ত্রণা সহ্য করে একটু ধাতস্থ হতে চেষ্টা করছিলেন। ভাইদের সহযোগিতায় ছেলেমেয়ে দুজনকে বিদেশে পাঠিয়ে লেখাপড়া করিয়েছেন। তারা বর্তমানে বিদেশেই প্রতিষ্ঠিত। ছেলেমেয়ের সাথে রীতাও দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। স্বামী রীতার অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। অর্থনৈতিক বিচারে স্বামী নিজেও সমাজের উচুপর্যায়ের লোক। গা সওয়া রীতা ছেলেমেয়েকে সময় দিতে গিয়ে স্বামীর বিষয়ে ভুলতেই বসেছিলেন বলা যায়। দেশে আসার কিছুদিনর মাথায় রীতা জানতে পারেন, তার নামে প্রায় কোটি টাকার ব্যাংকঋণ নেওয়া হয়েছে। শুধু এখানেই শেষ হয় নি।স্বামীর অধিকার নিয়ে তিনি রীতার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বাড়িতে থাকার জন্য জোর দাবি তুলছেন। রীতা না করতে পারেন নি। ছেলেমেয়ের সামাজিক মর্যাদার দিকে তাকিয়ে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নি।

ঘটনা -২

বত্রিশ বছরের আরশির (ছদ্মনাম ) বিয়ের বয়স পাঁচ ছুঁই ছুঁই। দীর্ঘ পরিচয় থেকে পরিণয়। শেষমেশ দুই পরিবারের সম্মতিতে জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে ছিল মনে রাখার মতো। আস্থা ও ভালোবাসায় পূর্ণ আরশির স্বামী আর্য্য তার কাছে অনেকটা দেবতার মতো। আরশি চাকরি করতেন বিমানের ফ্লাই অফিসার হিসেবে। ফ্লাইটের সাথে জীবনের সূচী মেলাতে গিয়ে অনেকটা হাঁপিয়ে ওঠেন আরশি। আর্য্যর সহযোগীতায় আবারো কাজে মন দেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই আরশির মনে হতে থাকে, সংসারে সময় না দিতে পেরে জীবনে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছেন। সংসারটা বড়ো ভালোবাসার জায়গা তার কাছে। এক জীবনে স্বামী-সংসার নিয়ে সুখের থাকার বিকল্প আর কী-ই-বা হতে পারে! এবার চাকরিই ছেড়ে দিলেন আরশি। ইতিমধ্যে মা হয়েছেন তিনি। স্বর্গসুখ যেনো হাতের মুঠোয়। ছোট্ট শিশুর দেখভাল করার জন্য নিয়ে আসেন নিজের খালাতো বোনকে। আর্য্যও খুব খুশি হয়েছেন আরশির কষ্ট কমবে বলে। স্বামীর ঘুমের সমস্যা এড়াতে আরশি প্রায়ই মেয়েকে নিয়ে অন্যঘরে ঘুমোতেন। সময়ের পরিক্রমায় হঠাৎ আর্য্যকে আবিষ্কার করেন তারই বোনের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায়। এই অবর্ণনীয় মানসিক আঘাত তিনি বেশিদিন সহ্য করতে পারেন নি। জীবনের দ্বিতীয় কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজে নিজেই সই করেন ডিভোর্সের দলিলপত্রে।

ডিভোর্স পরবর্তী মানসিক অবস্থা বুঝাবার জন্য দুটি উদাহরণ যথেষ্ট মনে করা যায়। যিনি ডিভোর্স দিতে উদ্যোগ নেন, তার জন্য সাময়িক চাপ লাঘবের অনুভূতি কাজ করতে পারে। তবে বেশিরভাগ দম্পতির ক্ষেত্রে ডিভোর্স তীব্র মানসিক ক্ষত তৈরী করে। সম্পর্কে বিচ্ছেদের আঘাত এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত চলতে পারে।

আমরা আরশির দিকে তাকাই। সম্মানজনক পেশা ছেড়ে দেওয়া, চুরমার হয়ে যাওয়া স্বপ্নময় সংসার, এ যেন এক অসহনীয় রূপকথা। ক্ষিপ্রতার সাথে আরশি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিছুতেই আরশি মেলাতে পারেন না তার জীবনের ঘটনাগুলো। মাঝে মাঝে নিজের অজান্তেই ভাবেন, এমন কিছু যদি ঘটতো, যাতে সব কিছু পাল্টে যেতো! সময় ঘড়িটাকে পিছিয়ে দেওয়া যেতো!

মাঝে মাঝে এ-ও ভাবেন, আচ্ছা, কম্পিউটারের মতো আয্যর ওই অংশটুকু ডিলিট করে দেয়া গেলেইতো চলতো! এ জাতীয় হাজারো প্রশ্ন এসে ভীড় জমায় মনে!

বিচ্ছেদের ফলে নারীর আত্মপরিচিতির ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। বেশিরভাগ মানুষ কারও স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে সমাজে নিজের আত্মপরিচয় ধারণ করে অভ্যস্ত। বিচ্ছেদ হওয়াতে এই আকস্মিক পরিবর্তণের সাথে খাপ খাওয়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ সময় ব্যক্তির আত্মবিশ্বাসই মানুষ হিসেবে সমাজে তার স্বীকৃতি ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হয়।কেউ কেউ নিজেকে গুটিয়ে নেন অন্য সকল যোগাযোগ থেকে। পরিচিত বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দূরত্ব বাড়তেই থাকে। সত্যিকারের বন্ধুর সহযোগিতা নিঃসন্দেহে উপকারী হবে।

অনেকের মধ্যে বিচ্ছেদের দীর্ঘ সময় পরও পূর্ববর্তী সঙ্গীর উপর তীব্র রাগ ও ক্ষোভ থেকে যায়। এটি ব্যক্তির নিজের এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ভুল বুঝাবুঝি তৈরী করতে পারে। অনেকে এই ‍তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত আরেকটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। যা ক্ষতিকর হতে পারে পরবর্তী সম্পর্কের জন্য। তাই একটি বিচ্ছেদের পর যথেষ্ট সময় নিয়ে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়া যেতে পারে। যাতে নতুন সম্পর্ক আরো বেশি পরিপূর্ণ হয়।

লিখেছেনঃ

মোসাম্মাৎ নাজমা খাতুন
অ্যাসিসট্যান্ট প্রফেসর
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তালাক, একে-অপরের বিরুদ্ধে মামলা ও তার ফলাফল

আইনের ভাষায় তালাক হচ্ছে ‘বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করা অর্থাৎ স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, একত্রে বসবাস করা উভয়ের পক্ষেই বা যে কোন এক পক্ষের সম্ভব হয় না, সেক্ষেত্রে তারা নির্দিষ্ট উপায়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে।’

সুমির (ছদ্ম নাম) দাম্পত্য জীবনে এমনটিই ঘটেছিল। অবশেষে তিনি তার স্বামীকে তালাক প্রদান করেন। কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া ছিল। সেই অধিকারের ভিত্তিতে সুমী স্থানীয় কাজি অফিস থেকে তালাকের যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ করে তালাকনামা স্বামীর বরাবর পাঠিয়ে দেন। কিন্তু স্বামীর বসবাসরত স্থানীয় চেয়ারম্যান অফিসে পাঠানো হয়নি কোনো তালাকের কপি। সুমীর এ বিষয়টি জানা ছিল না। স্থানীয় কাজি অফিস থেকেও পাঠানো হয়নি কোনো কপি।

কিন্তু আইন অনুযায়ী স্বামী বা স্ত্রী যে কেউ একে অপরকে তালাক দিতে চাইলে তাকে যে কোন পদ্ধতির তালাক ঘোষণার পর যথাশীঘ্রই সম্ভব স্থানীয় ইউপি/পৌর/সিটি মেয়রকে লিখিতভাবে তালাকের নোটিশ দিতে হবে এবং তালাক গ্রহীতাকে উক্ত নোটিশের নকল প্রদান করতে হবে। চেয়ারম্যান/মেয়র নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ হতে নব্বই দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো তালাক বলবৎ হবে না। কারন নোটিশ প্রাপ্তির ত্রিশ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান/মেয়র সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয়ের মধ্যে আপোষ বা সমঝোতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সালিশী পরিষদ গঠন করবে এবং উক্ত সালিশী পরিষদ এ জাতীয় সমঝোতার (পুনর্মিলনের) জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থাই  অবলম্বন করবে।

সুমী তালাকনামায় যেদিন স্বাক্ষর করেন, সেদিন থেকে পার হয়ে যায় দুই মাস। এর মানে ৯০ দিন ইদ্দতকাল পালন হতে হলে আর মাত্র এক মাস অপেক্ষা করতে হবে। সুমীর স্বামী আইনি দুর্বলতার সুযোগে এরই মধ্যে সুমীকে তার কাছে ফিরে পেতে পারিবারিক আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলাটির নাম দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার মামলা। এই মূল মামলাটি করার এক সপ্তাহ পর সুমীর স্বামী একই আদালতে একটি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন এই মর্মে যে, সুমী যাতে অন্য কোথাও বিয়ে না করতে পারেন। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত সুমী ও তার বাবাকে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আপত্তি দাখিলের জন্য ১০ দিনের সময় দিয়ে তাদের ঠিকানায়  সমন পাঠিয়ে দেয়।

সমন হাতে পেয়ে সুমীর চেহারায় দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠে। তার বাবাও হয়ে পড়ে বিধ্বস্ত। কারন এক মাসে দুটি সমন তারা পান। একটি দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার মামলার লিখিত জবাব দাখিলের জন্য, আরেকটি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আপত্তি দাখিলের জন্য।

দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার মামলায় বিবাদী করা হয়েছে তিনজনকে। প্রথম বিবাদী সুমীর বাবা, দ্বিতীয় বিবাদী তার মা এবং তৃতীয় বিবাদী সুমী নিজে। আরজিতে সুমীর স্বামীর অভিযোগ, তাঁর স্ত্রীকে জোর করে তালাক দিতে বাধ্য করেছেন তার বাবা। এখন তিনি তাকে নিয়ে ঘর করতে চান। কিন্তু সুমীর ভাষায়, তার স্বামী দুশ্চরিত্রের লোক। নানাভাবে অত্যাচার করত। বাইরে মদ আর নারী নিয়ে ব্যস্ত থাকত। জুয়া খেলত। স্ত্রী আর তার মেয়ের প্রতি কোনো খেয়াল রাখত না। এমন পাষণ্ড আর নির্দয় লোকের সঙ্গে ঘর করার চেয়ে একা থাকা ভালো-এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাধ্য হয়ে তাকে তাকে তালাক দিই।

সুমী যাতে অন্য কোথাও বিয়ে না করতে পারেন এই অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদনে সুমীর স্বামীর অভিযোগ ‘বিবাদীগণ পরস্পর যোগসাজশে অন্যায় ও বেআইনিভাবে ৩ নম্বর বিবাদীকে অর্থাৎ তার স্ত্রীকে ইদ্দতকালীন সময়ের মধ্যেই অন্যত্র পুনঃবিবাহ দেওয়ার জোর অপতৎপরতায় লিপ্ত হইয়া জনৈক চাকুরীজীবী পাত্র নির্বাচন করিয়া ফেলিয়াছেন এবং যেকোন সময় তার স্ত্রীকে উক্ত পাত্রের সহিত বেআইনীভাবে পুনঃবিবাহ সংঘটন করিতে পারেন।’

কিন্তু আইনের প্রশ্ন হচ্ছে, পারিবারিক আদালতে দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার মামলায় অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন চলে কি না। মকবুল মাজেদ বনাম সুফিয়া খাতুন মামলায় (৪০ ডিএলআর ৩০৫, এইচসিডি) মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের সিদ্ধান্ত এরকম যে, ১৯৮৫ সালে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের সহকারী জজ আদালতে একটি মামলা হয়। পারিবারিক আদালতের অধ্যাদেশে করা সর্বপ্রথম মামলাটিতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি উত্থাপিত হয়। এতে স্বামী তাঁর স্ত্রীর দ্বিতীয় বিয়ের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রার্থনা করে। আদালত নিষেধাজ্ঞার আবেদন অগ্রাহ্য করেন। পরে জেলা জজ আদালতে আপিল করা হলে আপিল নামঞ্জুর হয়। পরে হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন করা হয়। হাইকোর্ট বিভাগ তার রায়ে বলেন, ‘পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশে ২০ ধারা অনুযায়ী দেওয়ানি কার্যবিধির ধারা প্রয়োগ যোগ্য নয়।

অবশেষে সুমীর স্বামীর দায়ের করা মামলাটির শুনানি হলো। আদালত আদেশ দিলেন, ‘ইদ্দতকাল পর্যন্ত অর্থাৎ ৯০ দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইতে পারিবে না এ মর্মে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা মঞ্জুর।’  সাধারণত আইন অনুযায়ী তালাকের নোটিশ প্রেরণের পর ইদ্দতকাল পর্যন্ত, অর্থাৎ ৯০ দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হয় না। এ সময় অন্যত্র বিয়ে করার ক্ষেত্রে আইনে নিষেধ আছে। আদালত ইদ্দতকাল পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এ আইনের কার্যকারিতা আরও পাকাপোক্ত করলেন।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে মূল মামলাটির অর্থাৎ দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার মামলাটির কী হবে?’  সহজেই বলা যায়, মূল মামলার জবাব দিতে হবে। মামলায় লড়তে হবে। শুনানিতে সুমী আদালতে উপস্থিত হয়ে বললেন, কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরে তার তালাক প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া আছে। তিনি স্বেচ্ছায় এবং স্বজ্ঞানে তার স্বামীকে তালাক দিয়েছেন। আর তিনি তার স্বামীর ঘর করতে চান না। বিজ্ঞ আদালত ওই দিনই মামলাটি খারিজ করে দিলেন। আইনত সুমীর মেয়েটি সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত মায়ের হেফাজতেই থাকবে।

১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইনে অত্যন্ত— সুষ্পষ্টভাবে বলা হয়েছে কি কি কারণে একজন স্ত্রী আদালতে বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারবে।

কারণগুলো হলোঃ

১. চার বছর পর্যন্ত স্বামী নিরুদ্দেশ থাকলে।
২. দুই বৎসর স্বামী স্ত্রীর খোরপোষ দিতে ব্যর্থ হলে।
৩. স্বামীর সাত বৎসর কিংবা তার চেয়েও বেশী কারাদ- হলে।
৪. স্বামী কোন যুক্তিসংগত কারণ ব্যতিত তিন বছর যাবৎ দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে।
৫. বিয়ের সময় পুরষত্বহীন থাকলে এবং তা মামলা দায়ের করা পর্যন্ত বজায় থাকলে।
৬. স্বামী দুই বৎসর ধরে পাগল থাকলে অথবা কুষ্ঠ ব্যাধিতে বা মারাত্মক যৌন ব্যধিতে আক্রান্ত থাকলে।
৭. বিবাহ অস্বীকার করলে। কোন মেয়ের বাবা বা অভিভাবক যদি ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগে মেয়ের বিয়ে দেন, তাহলে মেয়েটি ১৯ বছর হওয়ার আগে বিয়ে অস্বীকার করে বিয়ে ভেঙ্গে দিতে পারে, তবে যদি মেয়েটির স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য সর্ম্পক (সহবাস) স্থাপিত না হয়ে থাকে তখনি কোন বিয়ে অস্বীকার করে আদালতে বিচ্ছেদের ডিক্রি চাইতে পারে।
৮. স্বামী ১৯৬১ সনের মুসলিম পারিবারিক আইনের বিধান লংঘন করে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করলে।
৯. স্বামীর নিষ্ঠুরতার কারণে।

উপরে যে কোন এক বা একাধিক কারণে স্ত্রী আদালতে বিয়ে বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারে। অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব স্ত্রীর। প্রমাণিত হলে স্ত্রী বিচ্ছেদের পক্ষে ডিক্রি পেতে পারে, আদালত বিচ্ছেদের ডিক্রি দেবার পর সাত দিনের মধ্যে একটি সত্যায়িত কপি আদালতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের কাছে পাঠাবে।

১৯৬১ সনের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী চেয়ারম্যান নোটিশকে তালাক সংক্রান্ত নোটিশ হিসেবে গণ্য করে আইনানুযায়ী পদক্ষেপ নিবে এবং চেয়ারম্যান যেদিন নোটিশ পাবে সে দিন থেকে ঠিক নব্বই দিন পর তালাক চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে।

স্বামীর আদালত স্বীকৃত নিষ্ঠুর ব্যবহার সমূহ

ক) অভ্যাসগতভাবে স্ত্রীকে আঘাত করলে বা নিষ্ঠুর আচরণ করলে, উক্ত আচরণ দৈহিক পীড়নের পর্যায়ে না পড়লেও, তার জীবন শোচনীয় করে তুলেছে এমন হলে।
খ) স্বামী খারাপ মেয়ের সাথে জীবনযাপন করলে।
গ) স্ত্রীকে অনৈতিক জীবনযাপনে বাধ্য করলে।
ঘ) স্ত্রীর সম্পত্তি নষ্ট করলে।
ঙ) স্ত্রীকে ধর্মপালনে বাধা দিলে।
চ) একাধিক স্ত্রী থাকলে সকলের সাথে সমান ব্যবহার না করলে।
ছ) এছাড়া অন্য যে কোন কারণে (যে সকল কারণে মুসলিম আইনে বিয়ের চুক্তি ভঙ্গ করা হয়)।

লেখকঃ সাপ্তাহিক ‘সময়ের দিগন্ত’ পত্রিকার প্রকাশক-সম্পাদক ও আইনজীবী জজ কোর্ট, কুষ্টিয়া।

লিখেছেনঃ অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক