বাংলাদেশে ৪৩% প্রেমের বিয়েই সুখের হয় না গড়ায় বিচ্ছেদ পর্যন্ত

বিবাহবিডি ডট কম, সম্প্রতি “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ নির্নয়” শিরোনামে প্রশ্ন ভিত্তিক একটি জরিপ পরিচালনা করে।  এতে অংশ গ্রহন করেন ৪১২ জন।  যার মধ্যে ছিলেন দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছ্যেদ নেয়া ১০৪ জন ব্যাক্তি।   উক্ত জরিপের তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, বিচ্ছেদের হার সবচেয়ে বেশী বিভাগীয় ও জেলা শহরে বসবাসকারীদের মাঝে যা যথাক্রমে বিভাগীয় শহরে ৪৯.০৩ % ও জেলা শহরে ৩৫.৫% ।

এবং উচ্চ শিক্ষিত নাগরিকদের মাঝেই বিচ্ছেদের প্রবনতা উল্লেখযোগ্য হারে বেশী – যা উচ্চতর ডিগ্রী ৪৯.৪২%, স্নাতক / সম্মান / সমসমান ৩৬.৫৮% , উচ্চ মাধ্যমিক বা সম সমান ৯.২% ।  জরিপে অংশগ্রহনকারীদের মধ্যে ৫৮.৬৫% চাকুরীজীবি ও ২০.১৯% ব্যবসায়ী তাছাড়াও  ৪.৮১% প্রবাসে কর্মরত রয়েছেন।  যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা মধ্যবিত্ত ৭২.১২ %,  নিম্ন মধ্যবিত্ত ১৭.৩% , উচ্চ বিত্ত ৪.৮% ও নিম্ন বিত্ত ৭.৭৬% ।

জরিপে অংশগ্রহনকারী (৪১.৪% যৌথ পরিবার, ৫৯% একক পরিবার থেকে আসা ) ডিভোর্স ব্যাক্তিদের প্রশ্ন করা হয় কিভাবে তাদের সংগীর সাথে পরিচয়ের সুত্রপাত (বিয়ের সম্মন্ধ) হয়েছিলো।  এর মধ্যে,  ৩০.৭৬% এর পরিচয় হয় নিকট আত্মীয়দের মাধ্যমে, ২৫ % এর পরিচয় হয় ট্রেডিশনাল ঘটকের সাহায্যে, ও ৪৩.৩% প্রেম ঘটিত পরিচয় ও অনলাইন ম্যাট্রিমনি বা স্যোশাল মিডিয়ায় পরিচয় হয় মাত্র ১.৯২% ।

অংশগ্রহন কারী ৪৬% মনে করেন সঙ্গীর সাথে বয়সের পার্থ্যক্য ৫ বছরের কম হওয়া ভাল আর ৩১% মনে করেন সঙ্গীর সাথে বয়সের পার্থ্যক্য ১০ বছরের বেশী হওয়া উচিত নয়।  তবে বেশীর ভাগ অংশগ্রহন কারীই মনে করেন, অতিরিক্ত বয়সের পার্থ্যক্য বিবাহ বিচ্ছেদের অন্যতম কারন নয়।

জরীপে অংশগ্রহনকারীদের প্রশ্ন করা হয় – কোন বিষয় গুলো আপনার সাথে ঘটলে আপনি একেবারেই সহ্য করবেন না, প্রয়োজনে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন এর প্রতি উত্তরে উঠে আসে প্রধান ৮ টি বিষয় –

১) পরকীয়া ২) ক্রমাগত ভুল বুঝাবুঝি ও দুরত্ব বৃদ্ধি ৩) সংসারে কাজ কর্মে তীব্র অনিহা, সঙ্গীকে যথাযথ মূল্যায়ন না করা ৪) আসক্তি (মাদক / নারী / পরপুরুষ / জুয়া) ৫) মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন ৬) সঙ্গীর প্রতি অতিরিক্ত সন্দেহ প্রবনতা ৭) স্বামী বা স্ত্রীর পরিবার হতে দুর্ব্যবহার বা অবমূল্যায়ন ৮) সঙ্গীর একঘেয়ে স্বভাব বা একক কর্তৃত্ব পরায়নতা।   তাছাড়াও সন্তান ধারনে অক্ষমতা বা সন্তান ধারনে সঙ্গীর দ্বিমত পোষণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম / ভারতীয় টিভি সিরিয়াল বা বিদেশী সংস্কৃতির অতিরিক্ত প্রভাব বা আসক্তির মত বিয়য়গুলোও জরিপে উঠে আসে।

জরীপে অংশগ্রহনকারীদের কাছে সর্বশেষ জানতে চাওয়া হয় কোন ৫টি বিষয় বিচ্ছেদ এড়াতে পারে বলে আপনি মনে করেন? এর মধ্যে ৫ টি বিষয় ক্রমান্বয়ে যে বিষয় গুলো ঊঠে আসে –

১) একে অপরকে সম্মান করা ২) সঙ্গীর সাথে বিশ্বস্ত থাকা ৩) আপস করার মানসিকতা ৪) সঙ্গীর সাথে মিথ্যাচার না করা ৫) সঙ্গীকে কখনো অবজ্ঞা বা অবহেলা না করা।


বিবাহবিডি ডট কম এর জরিপ তথ্যঃ

বিবরন সকল অংশগ্রহনকারী  (৪১২ জন) ডিভোর্স গ্রহনকারী (১০৪ জন)
অংশগ্রহন কারী পুরুষ – ৭৬.৫%
নারী-  ২৩.৫%
পুরুষ – ৭৮.৪৫%
নারী-  ২১.৫৫%
অংশগ্রহনকারীদের বয়স ১৮-২৪ বছর = ৬.২%
২৫-৩৫ বছর = ৬৪.৯%
৩৬-৫৫ / এর অধিক =  ২৮.৯%
১৮-২৪ বছর = ৩৮.৪৬%
২৫-৩৫ বছর = ৫২.৮৮%
৩৬-৫৫ / এর অধিক =  ৮.৬৫%
অংশগ্রহনকারীদের অবস্থান ৬১.৫ % বিভাগীয় শহরে
২৩.২% জেলা শহরে
১১.৮% উপজেলা শহরে
৩.৫% ইউনিয়ন / গ্রামে
৪৯.০৩ % বিভাগীয় শহরে
৩৫.৫% জেলা শহরে
১৩.৪৬% উপজেলা শহরে
১.৯২% ইউনিয়ন / গ্রামে
অংশগ্রহনকারীদের
শিক্ষাগত যোগ্যতা
৪৪.৩% উচ্চতর ডিগ্রী
৪১.৯% স্নাতক / সম্মান / সমসমান
৯.৯% উচ্চ মাধ্যমিক সম সমান
৩.৯% উচ্চ মাধ্যমিক এর নীচে
৪৯.৪২% উচ্চতর ডিগ্রী
৩৬.৫৮% স্নাতক / সম্মান / সমসমান
৯.২% উচ্চ মাধ্যমিক সম সমান
৪.৮% উচ্চ মাধ্যমিক এর নীচে
অংশগ্রহনকারীদের
বৈবাহিক অবস্থা
৫০.৪ % বিবাহিত
২২% অবিবাহিত
২৫.৭% ডিভোর্স
১.৯% বিধবা / বিপত্নীক
১০০% ডিভোর্স
অংশগ্রহনকারীদের
পেশা
৫৯.২% চাকুরীজীবি
১৬.৬% ব্যবসায়ী
১৩.১% বেকার ( নারী)
৮.৬% অধ্যয়নরত
২.৬% প্রবাসে কর্মরত
৫৮.৬৫% চাকুরীজীবি
২০.১৯% ব্যবসায়ী
১৫.৩৮% বেকার
০.৯৬% অধ্যয়নরত
৪.৮১% প্রবাসে কর্মরত
অংশগ্রহনকারীদের
পরিবারের ধরন
৬৫.৪% একক পরিবার
৩৪.৬% যৌথ পরিবার
৪১.৪% যৌথ পরিবার
৫৯% একক পরিবার
অংশগ্রহনকারীদের
আর্থিক অবস্থা
৭৩.৭ % মধ্য বিত্ত
২০.৬% নিম্ন মধ্যবিত্ত
৪.৬% উচ্চ বিত্ত
১.১% নিম্ন বিত্ত
৭২.১২ % মধ্য বিত্ত
১৭.৩% নিম্ন মধ্যবিত্ত
৪.৮% উচ্চ বিত্ত
৭.৭৬% নিম্ন বিত্ত
আপনি কি মনে করেন আর্থিক অসচ্ছলতা  বিবাহবিচ্ছেদের একটি কারন ৬০.৮% এ প্রশ্নে একমত নয়
৩৯.২% মনে করেন আর্থিক অসচ্ছলতা বিবাহবিচ্ছেদের একটি কারন হতে পারে
৫৮.৮% এ প্রশ্নে একমত নয়
৪১.২% মনে করেন আর্থিক অসচ্ছলতা বিবাহবিচ্ছেদের একটি কারন হতে পারে
জীবন সংগীর সাথে পরিচয়ের সুত্রপাত নিকট আত্মীয়দের মাধ্যমে ২৭.১%
ঘটকের সাহায্যে ১৩.৭ %
প্রেম ঘটিত ৩৭.৪%
অনলাইনে পরিচয়ঃ ৩.৪%
অবিবাহিত / প্রযোজ্য নয় ১৮.৪%
নিকট আত্মীয়দের মাধ্যমে ৩০.৭৬%
ঘটকের সাহায্যে ২৫ %
প্রেম ঘটিত ৪৩.৩%
অনলাইনে পরিচয়ঃ ১.৯২%
জরীপে অংশগ্রহনকারীদের প্রশ্ন করা হয় – কোন বিষয় গুলো আপনার সাথে ঘটলে আপনি একেবারেই সহ্য করবেন না , প্রয়োজনে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন। এর উত্তরে যে ৮ টি বিষয়  উঠে আসে (ক্রমানুসারে)
১) পরকীয়া
২) ক্রমাগত ভুল বুঝাবুঝি ও দুরত্ব বৃদ্ধি
৩) সংসারে কাজ কর্মে তীব্র অনিহা, সঙ্গীকে যথাযথ মূল্যায়ন না করা
৪) আসক্তি (মাদক / নারী / পরপুরুষ / জুয়া)
৫) মানসিক ও শারিরিক নির্যাতন
৬) সঙ্গীর প্রতি অতিরিক্ত সন্দেহ
৭) স্বামী বা স্ত্রীর পরিবার হতে দূর্ব্যবহার / অবমূল্যায়ন
৮)সঙ্গীর একঘেয়ে স্বভাব বা একক কর্তৃত্ব পরায়নতা
এর উত্তরে যে ৮ টি বিষয় উঠে আসে (ক্রমানুসারে)
১) পরকীয়া
২) ক্রমাগত ভুল বুঝাবুঝি ও দুরত্ব বৃদ্ধি
৩) সংসারে কাজ কর্মে তীব্র অনিহা, সঙ্গীকে যথাযথ মূল্যায়ন না করা
৪) আসক্তি (মাদক / নারী / পরপুরুষ / জুয়া)
৫) মানসিক ও শারিরিক নির্যাতন
৬) সঙ্গীর প্রতি অতিরিক্ত সন্দেহ
৭) স্বামী বা স্ত্রীর পরিবার হতে দূর্ব্যবহার / অবমূল্যায়ন
৮)সঙ্গীর একঘেয়ে স্বভাব বা একক কর্তৃত্ব পরায়নতা
সঙ্গীর সাথে অতিরিক্ত বয়সের পার্থক্য বিচ্ছেদের কোন কারন হতে পারে ১৫.৩%  হ্যাঁ, মনে করি
৫৬.৯% না মনে করিনা
২৭.৮% অতিরিক্ত বয়সের পার্থক্য বিচ্ছ্যেদের কারন হতেও পারে
২৪.৩%  হ্যাঁ, মনে করি
৫৩.৯% না মনে করিনা
১৭.৮% অতিরিক্ত বয়সের পার্থক্য বিচ্ছ্যেদের কারন হতেও পারে
আপনার মতে সঙ্গীর সাথে বয়সের পার্থক্য কেমন হওয়া ভালো ২ বছরের বেশী নয় – ৭.৬%
৫ বছরের কম – ৫২.১%
১০ বছরের বেশী নয় – ৩৫.৫%
সমবয়সী হলে ভাল মনে করি – ৪.৬%
২ বছরের বেশী নয় – ৮.৬৫%
৫ বছরের কম – ৪৬%
১০ বছরের বেশী নয় – ৩১%
সমবয়সী হলে ভাল মনে করি-  ১৪%
আপনি কি মনে করেন – সন্তান ধারনে সঙ্গীর দ্বিমত পোষণ কি দাম্পত্য কলহের একটি কারন, যা বিচ্ছেদ পর্যন্ত পৌছাতে পারে? হ্যাঁ, মনে করি ৫১.৭%
না, মনে করি না ৪৮.৩%
হ্যাঁ, মনে করি ৫৮.২%
না, মনে করি না ৪১.৮%
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভারতীয় টিভি সিরিয়াল বা বিদেশী সংস্কৃতির অতিরিক্ত প্রভাব বা আসক্তি কি দাম্পত্য অশান্তি – ক্ষেত্র বিশেষে বিচ্ছেদের কারন হতে পারে? হ্যাঁ, হতে পারে ৭৪.২%
না, মনে করি না ২৫.৮%
হ্যাঁ, হতে পারে ৬২.৯%
না, মনে করি না ৩৭.১%
কোন ৫টি বিষয় বিচ্ছেদ এড়াতে পারে বলে আপনি আপনি মনে করেন? উত্তর গুলো ক্রমানুসারেঃ
একে অপরকে সম্মান করা
সঙ্গীর সাথে বিশ্বস্ত থাকা
আপস করার মানসিকতা
সঙ্গীর সাথে মিথ্যাচার না করা
সঙ্গীকে কখনো অবজ্ঞা না করা
উত্তর গুলো ক্রমানুসারেঃ
একে অপরকে সম্মান করা
সঙ্গীর সাথে বিশ্বস্ত থাকা
আপস করার মানসিকতা
সঙ্গীর সাথে মিথ্যাচার না করা
সঙ্গীকে কখনো অবজ্ঞা না করা

সংসার এর টানাপোড়ন

সবার জীবনেই একটা ভবিষ্যত পরিকল্পনা থাকে।খুব হাস্যকর মনে হলেও একসময় আমার ভবিষ্যত পরিকল্পনা ছিল একজন আদর্শ গৃহিণী হব।যদিও বিয়ের পরপরই বুঝতে পেরেছিলাম সেটা আদোতে কত কঠিন।শ্বশুর বাড়িতে প্রথম প্রথম অনেকেই আস্ত নতুন বউ দেখতে।ভেবেছিলাম মানুষগুলো আমাকে দেখতে এসেছে।তাই যথাসম্ভব তাদের সাথে হাসি মুখে কথা বলার চেষ্টা করেছি।যদিও দুদিন না যেতেই আমার সে ভুল ভেংগে গেল তাদের কথাবার্তা শুনে।  বউ কি শুধু হাসতেই জান?মা কাজকাম কিছু শেখাইনি?দেখি তো মা তোমার বাপে কি কি দিছে? ওমা শুনলাম বড়লোকের বেটি।এখন তো দেখি সবই শোনা কথা।আপা আপনার কপাল বড়ই খারাপ।সেদিন জামালের বউ দেখতে গেলাম আহা তার শ্বশুরে ঘরডা সাজায়ে দিছে।সবই কপাল।  পাড়া প্রতিবেশির আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে যায়।তার ছিটেফোঁটা আমার শ্বশুর বাড়িতে ও পড়ে।তাদের মধ্যেও শোকের ছায়া নেমে আসে।

আমি পড়েছি মহা মুশকিলে। আদর্শ গৃহিণী হওয়ার স্বপ্ন বুঝি অংকুরেই বিনষ্ট হল।তবু হাল ছাড়ার পাত্রি আমি না।মহা উতসাহে গৃহস্থালি কাজে মনোনিবেশ করলাম।মা সব সময় বলত লেখাপড়ার মত কঠিন কাজটা যে মেয়ে পারে তার জন্যে কোন কাজ ই কঠিন না।বিয়ের পর দায়িত্ব ঘারে এসে পড়লে ঠিকই সব শিখে যাবি।সত্যিই দেখলাম একটু একটু করে সব কাজ শিখে ফেলছি।যদিও পেয়াজ কাটতে গিয়ে নাকের জল চোখের জল এক করছি।ভাতের মাড় গালাতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে ফেলছি, মরিচ কাটলে সারাদিন হাত জ্বলছে তবুও পারছি।কিছুদিন পরেই দেখলাম এসব আর সেভাবে হচ্ছেনা।মনে মনে খুশি হলাম এবার বুঝি পাকা রাঁধুনি হব।আদর্শ গৃহিণী হওয়া এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।বান্ধবীরা যখন চাকরির পরীক্ষা একের পর এক দিয়ে যাচ্ছে আমিও তখন আমার স্বপ্ন পুরনে একএক টা ধাপ পার হচ্ছি। সবকিছু যখন শিখে ফেলেছি তখন মনে হল আমি আসল জিনিসটা আজও শিখিনি।সংসারে সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হল অভিনয় জানা।যে যত ভাল অভিনেত্রী হতে পারে সে তত সবাইকে সুখি করতে পারে।আর নিজেও সুখি হতে পারে।আমার তখন মনে হল কি করলাম এতদিন লেখাপড়া শিখে।যদি অভিনয়টাই না পারলাম।সেই সাথে মায়ের উপর খুব রাগ ও হল।ছোটবেলা থেকে যদি সব কিছুর পাশাপাশি অভিনয়টাও একটু শেখাত তাহলে আজ আর বিপদে পড়তে হত না। মনে হল আমার আদর্শ গৃহিণী হবার স্বপ্ন বুঝি এ জীবনে আর পুরন হলনা।তবুও আমি হাল ছাড়লামনা।সংসারে সুখি হতে গেলে এবং অন্যকে সুখি করতে গেলে যে যে অভিনয় গুলো করতে হয় তা ইতোমধ্যে আমি জেনে গিয়েছিলাম।

এই যেমন স্বামী রাগ করলে বকাঝকা করবে।মাঝে মাঝে গায়ে হাত তুলবে।স্ত্রীর তাতে মোটেও রাগ করলে চলবেনা।বরং এক গালে চড় মারলে হাসি হাসি মুখ করে আরেক গাল বাড়িয়ে দিতে হবে।শ্বশুরের জন্যে চা বানিয়ে আনলে তা যদি তার পছন্দ না হয় এবং তিনি যদি সেটা ফেলেও দেন তবে কষ্ট পাওয়া যাবেনা।বরং কিছুই হয়নি এমন ভাবে আবার চা বানানোই মনোনিবেশ করতে হবে।শ্বাশুড়ির যেকোন কথা হাসি মুখে গ্রহন করতে হবে।বাপের বাড়ি থেকে ফোন করলে যেমন ই থাকিনা কেন তাদের কে বোঝাতে হবে যে আমি ভালো আছি।পাড়া প্রতিবেশিরা যখনি যেটাই বলুক তাতেই আমার মংগল ভেবে চুপ থাকতে হবে।ইত্যাদি ইত্যাদি আরো অনেক কিছু।   যদিও এতকিছু আমার জন্যে কঠিন ছিল তবুও আমি দমে গেলাম না।জীবনের লক্ষ আমাকে পূরন করতেই হবে।

এরই মধ্যে আবারও পাড়া প্রতিবেশিদের আহাজারি শুরু হল।আহারে এ কেমন বউ।শুনছিলাম এত এত লেখাপড়া জানে।তা এতদিনে তো কোন চাকরিই পাইলনা।আজকালকার দিনের কোন মাইয়াডা ঘরে বইসা থাকে।রমিজের পুলার বউডা আই এ পাশ দিছে।সে তো সরকারী প্রায়মারি স্কুলে চাকরি করে।মাসে ২০ হাজার টাকা বেতন পায়।তোমারি কপাল খারাপ গো।   আবার ও তাদের আহাজারিতে আকাশ বাতাসের সাথে আমার সংসার ও কেঁপে উঠল।আমার মনে হল এতদিন যা করেছি তা পুরোটাই পন্ডশ্রম।আদর্শ গৃহিণী হওয়ার স্বপ্ন আমার আর এ জন্মে বুঝি পূরণ হলনা।সংসারের মান বাঁচাতে আমি এবার চাকরি নামক সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে লাগলাম।

#ফ্যানপোস্ট

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ গুলো কি? – জরিপ

বিবাহিত জীবনে অনাকাংখিত বিচ্ছেদ হতেই পারে, অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছেদ ডেকে আনে ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয় আবার অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছেদেই মিলে মুক্তি। বিগত কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের পরিমান অনেকাংশেই বেড়েছে যা সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষনায় উঠে এসেছে।

বিবাহবিডি ডট কম এ ২০১৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬ হাজার ডিভোর্স পাত্র/পাত্রী রেজিষ্ট্রেশন করেছেন আমরা শুধু মাত্র ডিভোর্স পাত্র/পাত্রীদের কাছে চলমান এই জরিপের মাধ্যমে জানতে চাইবো সম্ভ্যাব্য কি কি কারনে তারা ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সম্মানিত পাঠক, এই ইউজার জরিপের মাধ্যমে আপনারাও আপনাদের সুচিন্তিত ব্যাক্তিগত মতামত দিতে পারেন যা সামগ্রিক ভাবে একটি সামাজিক সমস্যার সমাধানে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।


জরিপে অংশ গ্রহন করতে ক্লিক করুন


সাম্প্রতিক কিছু গবেষনায় জানা গেছে অধিকাংশ ডিভোর্সের ঘটনা ঘটছে মেয়েদের পক্ষ থেকে, যা শতকরা ৬৬ ভাগ। ডিভোর্সের ঘটনা বেশি ঘটছে উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারে।  ঢাকা সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী ২০১৪ সালে রাজধানীতে ডিভোর্সের ঘটনা ঘটেছে ৮২১৪ দম্পতির। এর আগে ২০১২ সালে ৭৬৭২ দম্পতির মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটেছে।  ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসেই ৬১০ দম্পতির বিচ্ছেদ হয়েছে। তার মধ্যে ৪২৬ ডিভোর্সই হয়েছে স্ত্রী কর্তৃক।  ঢাকা সিটি করপোরেশনের উত্তরের গুলশান, বনানী, মহাখালী, বাড্ডা, মগবাজার, রামপুরা নিয়ে অঞ্চল-৩ এই এলাকায় ২০১৫ সালে ৫৯৮ দম্পতির মধ্যে ডিভোর্স হয়েছে।  এর মধ্যে স্বামী ডিভোর্স দেয় ২৩৫ এবং স্ত্রী দেয় ৩৬৩টি। রাজধানী সূত্রাপুর, বংশাল, নবাবপুর, কাপ্তান বাজার, নাজিরাবাজার ও লালবাগের অর্ধেক নিয়ে গঠিত ঢাকা সিটি করপোরেশন দক্ষিণের অঞ্চল-৪ এই এলাকায় ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে আক্টোবর পযর্ন্ত ২৫৮ দম্পতির মধ্যে ডিভোর্স হয়েছে। এর মধ্যে স্ত্রীর পক্ষ থেকে ১৭৩ এবং ৮৫টি ডিভোর্স হয়েছে স্বামীর পক্ষ থেকে।  তার আগের বছর একই এলাকায় ২৯১ দম্পতির মধ্যে ডিভোর্স হয়েছে।  এর মধ্যে ১৮৪টি ডিভোর্স হয়েছে স্ত্রীর পক্ষ থেকে।  (সুত্রঃ দেশীয় পত্রিকার খবর)

আমরা এই জরিপের মাধ্যমে আপনার সুচিন্তিত ব্যাক্তিগত মতামত চাইছি যা সামগ্রিক ভাবে একটি সামাজিক সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ন অবদান রাখতে পারে।  এই জরিপে আপনার সম্পূর্ন গোপনীয়তা বজায় থাকবে।  আমরা আপনার সার্বিক সহযোগিতা কামনা করছি।

নিবেদক
ইফফাত আরা ইসলাম ও শারমিন সুলতানা
এক্সিকিউটিভ – বিবাহবিডি ডট কম
ফোনঃ +88 09612211555

মধ্যবয়স সংকটের না সম্ভাবনার?

জামিল সাহেবের বয়স ৫২ বছর। ইদানীং তাঁর মেজাজটা একটু খিটখিটে হয়ে উঠছে। একমাত্র ছেলে বিদেশে থাকে। কদিন আগে বাবাকে হারিয়েছেন। নিজেকে তাঁর বড্ড একা একা লাগে। মাঝে মাঝেই ভাবেন, ‘যদি আগের দিনগুলো আবার ফিরে পাওয়া যেত’ কিংবা ‘অফিসের সহকর্মীদের চেয়ে কীভাবে আরও এগিয়ে থাকা যায়’ ইত্যাদি। রাতে তাঁর ঘুম আসে না। বিছানায় শুয়ে ভাবেন, এ জীবনে তাঁর কিছুই পাওয়া হলো না, কিছুই করা হলো না। স্ত্রীর সঙ্গে প্রতিদিন কথা-কাটাকাটি লেগেই আছে, ফলে অন্তরঙ্গ সময় কাটানো হয়েই ওঠে না। শরীরটাও যেন দুর্বল লাগে।

জামিল সাহেবের এই বয়সটাকে বলা যায় মধ্যবয়স। বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় ৪৫ থেকে ৬০-এই সময়টুকুকে মধ্যবয়স বলা হয়। এই সময় পুরুষ ও নারী উভয়ের জীবনে একধরনের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। হরমোন ও বয়সজনিত কারণে কিছু শারীরিক পরিবর্তন ঘটে, আবার পারিপার্শ্বিক কারণে মানসিকতারও পরিবর্তন ঘটতে থাকে। মার্কিন মনস্তত্ত্ববিদ এলিয়ট জ্যাক ১৯৬৫ সালে প্রথম তাঁর লেখায় ‘মিডলাইফ ক্রাইসিস’-এর উল্লেখ করেন। নারী-পুরুষ উভয়ের জীবনেই এই বয়সটিতে একধরনের টানাপোড়েন শুরু হতে পারে। তবে সবার জীবনে কিন্তু এই বয়সে সংকটকাল আসে না। নারীর জীবনে একটু আগে আসে, আর পুরুষের জীবনে খানিকটা পরে। সংকটের প্রকরণও নারী-পুরুষভেদে আলাদা। এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবয়সীদের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ মিডলাইফ ক্রাইসিসে ভোগেন। এ বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক আছে বিস্তর। সম্প্রতি কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টার এক গবেষণায় বলা হয়, মিডলাইফ ক্রাইসিস বলে আলাদা কিছু নেই। তবে বেশির ভাগ গবেষণায় মিডলাইফ ক্রাইসিস বা মধ্যবয়সের সংকট তৈরি হয় বলে মত দেওয়া হয়েছে।

নারীর জীবনে এই সময়টাতে সংকটের একটা বড় অংশজুড়ে থাকে তাঁর শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন, হরমোনের তারতম্য, দেহে বয়সের চিহ্ন। কখনো বাড়তি হিসেবে যোগ হয় উৎকণ্ঠা আর বিষণ্নতা। পুরুষদের ক্ষেত্রে মধ্যবয়সের সংকটের মাত্রা খানিকটা ভিন্ন। এ সময় তিনি তাঁর কর্মক্ষেত্র, সাফল্য-ব্যর্থতা, অপরের সঙ্গে তুলনা এবং যৌনজীবন নিয়ে সংকটে পড়ে যান। মনস্তত্ত্ববিদ হ্যারল্ড কোহেন তাঁর ‘দ্য মেল মিডলাইফ ক্রাইসিস’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন যে জীবন এক নিরন্তর বোঝা। আর এই বোঝা বহনের মাঝপথে এসে কেউ কেউ হাঁপিয়ে পড়েন। সেটাই মিডলাইফ ক্রাইসিস। এই সময় অনেক কাজের কথা মনে পড়ে, যা করা হয়ে ওঠেনি, অনেক অপ্রাপ্তির কথা মনে পড়ে, যা পাওয়া হয়নি। অনেক গোপনীয়তা মনকে পীড়া দেয়, অনেক সুপ্ত বাসনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

মধ্যবয়সের সংকটের লক্ষণ কী কী

* সহকর্মী-বন্ধুদের চেয়ে নিজেকে ব্যর্থ ভাবা।
* হঠাৎ তীব্রভাবে কোনো কিছু পেতে চাওয়া; যেমন-বাড়ি নেই, যেভাবেই হোক বাড়ি করতে হবে; গাড়ি নেই, যেভাবেই হোক গাড়ি কিনতে হবে।
* একাকিত্ব দূর করার চেষ্টা করা, বিকল্প কিছু নেতিবাচক পথ বেছে নেওয়া; যেমন-নেশা করা, বিপরীত লিঙ্গের তৃতীয় কারও সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া।
* তারুণ্য ফিরে পাওয়ার জোর তাগিদ অনুভব করা, হতাশা ব্যক্ত করা।
* নিজের জীবন ও জীবনযাত্রার গুণে-মানে সব সময় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা।
* স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবন ও ভালোবাসায় ফাটল ধরা।
* সন্তানদের প্রতি অতি খবরদারি বা একেবারেই উদাসীন হয়ে যাওয়া।
* কারণে-অকারণে আশপাশের মানুষকে সন্দেহ করা।
* অতিরিক্ত কেনাকাটা করা।
* আশপাশের সবকিছুর প্রতি বিরক্ত হওয়া, একঘেয়েমি বোধ করা।
* অসামঞ্জস্যপূর্ণ অ্যাডভেঞ্চারে জড়িয়ে পড়া।

মিডলাইফ ক্রাইসিস বলে আদতে কিছু আছে কি নেই, সে নিয়ে যতই তর্ক থাকুক; মোদ্দাকথা হচ্ছে, এই সময়টাতে ভালো থাকতে হবে। শরীরে এবং মনে-সব দিক দিয়েই। আর মধ্যবয়সে ভালো থাকার জন্য যা যা করতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তা হচ্ছে—

সবার আগে শরীরের যত্ন
মধ্যবয়সটি হচ্ছে হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ নানাবিধ রোগ তৈরির বয়স। তাই সুষম খাদ্য গ্রহণ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে এই বয়সে নিজের শরীরটিকে রাখতে হবে নীরোগ।

মনের যত্নও জরুরি
এই বয়সে নিজেকে একা ভাবার কোনো কারণ নেই। পরিবারের পাশাপাশি বন্ধুবান্ধব, সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে। মন ভালো রাখতে বেড়াতে যেতে হবে, গান শুনতে হবে, চলচ্চিত্র দেখতে পারেন; এমনকি অংশ নিতে পারেন সমাজসেবামূলক কোনো কাজে।

দাম্পত্য সম্পর্ককে স্বাস্থ্যকর রাখুন
হঠাৎ কোনো মোহে পড়ে বা অ্যাডভেঞ্চারের বশে কারও সঙ্গে এমন কোনো সম্পর্ক গড়ে তুলবেন না, যা আপনার দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল ধরায়। আবার অযথা আপনার জীবনসঙ্গী বা সঙ্গিনীকে সন্দেহও করবেন না। কোনো সমস্যা মনে করলে খোলামনে পরস্পর আলাপ করুন। দাম্পত্য সম্পর্ক স্বাস্থ্যকর রাখতে নিয়মিত শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখুন। কোনো অসুবিধা বোধ করলে লজ্জা না পেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সন্তানের দিকে নজর দিন
কেবল নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকলেই হবে না, সন্তানের দেখভালও আপনার অন্যতম দায়িত্ব। সন্তানের ক্যারিয়ার, তার সমস্যা ইত্যাদি বিষয়ে যথেষ্ট সময় দিন।

কর্মক্ষেত্রকে উজ্জ্বল রাখুন
আপনার কাজের জায়গাটিকে ভালোবাসুন। কী পেয়েছেন, তার হিসাব না করে কী অবদান রেখেছেন, তা মিলিয়ে নিন। দেখবেন, আপনার সফলতার পাল্লাই ভারী। আর যদি না পাওয়ার হিসাব করতে বসেন, সহকর্মীদের সঙ্গে নিজের তুলনা করেন, তবে হতাশায় পড়ে যাবেন।

আর্থিক ব্যবস্থাপনা
আয়-ব্যয়ের হিসাব করুন। প্রয়োজনে সঞ্চয় করতে থাকুন। ভবিষ্যতের যেকোনো প্রয়োজন; যেমন-চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা, বিয়ে ইত্যাদি বিষয়ে আর্থিক প্রস্তুতি নিন।

আত্মিক ও সামাজিক বিষয়ে মনোযোগী হোন
নিজের আত্মার তৃপ্তির জন্য নৈতিকভাবে জীবনযাপন করুন। নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলুন। সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিন।

নেতিবাচক পথ পরিহার করুন
নেশায় আসক্ত হয়ে যাওয়া, অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকুন। যদি মনে করেন এমন কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে যাচ্ছেন, তবে আপনার স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি কী ভাবলেন, সেটা না ভেবে আপনি কীভাবে এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন, সেটা নিয়ে আলোচনা করুন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।

কৈশোর বা বয়ঃসন্ধির মতো মধ্যবয়সও একটি বিশেষ সময়, যখন মানুষ নিজেকে আগের চেয়ে আলাদা করে চিনতে শেখে। এই সময়টাকে যতই সংকটের কাল বা ক্রাইসিস বলা হোক না কেন, যদি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে চলা যায়, তবে মধ্যবয়স থেকেই শুরু হতে পারে জীবনের নতুন টার্নিং পয়েন্ট। উজ্জ্বলতা আর উচ্ছলতায় ভরিয়ে তুলতে পারেন নিজেকে। পরিবার আর কর্মক্ষেত্রে হয়ে উঠতে পারেন সবার প্রিয় অনুসরণযোগ্য একজন। তাই মধ্যবয়সকে সংকটের বয়স বলা ঠিক নয়, জীবনকে ইতিবাচকভাবে দেখুন, মধ্যবয়সকে গড়ে তুলুন সম্ভাবনার সময় হিসেবে।

কেন এই সংকট:

শারীরিক পরিবর্তন
শরীরে আগের মতো তেজস্বিতা থাকে না। হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। পুরুষের ক্ষেত্রে কারও কারও যৌনক্ষমতা বা চাহিদা কমতে থাকে।

কর্মক্ষেত্রের চাপ
কর্মক্ষেত্রে এই বয়সে বেশির ভাগ পুরুষ তাঁর ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে অবস্থান করেন। নিজের সবচেয়ে সেরাটাই তিনি দিতে চান। কিন্তু সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতা তাঁকে কখনো হতাশ করে তোলে।

সময়েরচাপ
এই বয়সে মানুষ মনে করে তার সময় বুঝি ফুরিয়ে আসছে, যা কিছু করার তাড়াতাড়ি করে ফেলতে হবে। ফলে সে নিজের মধ্যে একধরনের চাপ অনুভব করে।

বাবা-মাকে হারানো
অনেক ক্ষেত্রেই মধ্যবয়সীদের মা-বাবা মৃত্যুবরণ করেন। ফলে তাঁর মধ্যে একধরনের শূন্যতা তৈরি হয়।

সন্তানেরা দূরে চলে যায়
কখনো পড়ালেখা বা বিয়ে ইত্যাদি কারণে সন্তানেরা দূরে চলে যায়। ফলে শূন্যতা আরও বাড়ে।

দাম্পত্যসংকট
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্যসংকট হতে পারে। তৃতীয় কারও অনুপ্রবেশ দাম্পত্য সম্পর্ককে সংকটাপন্ন করে তোলে।

লিখেছেনঃ আহমেদ হেলাল
প্রকাশঃ  প্রথম আলো জুলাই ১৩, ২০১৬

কেন বিয়ে করবেন !

বিয়ের কথাটা শুনলেই কেমন যেন লাগে। চিন্তার বিষয়, বয়স হয়েছে তো! সে যাই হোক।  বিয়ে করুন উপযুক্ত সময়ে। কারণ বিয়ে করার স্বাস্থ্যগত সুফল অনেক! কি ধরণের সুফল থাকতে পারে বিয়ে করার পর?
 
দীর্ঘ জীবন লাভ
কেউ যদি মনে করে থাকেন বিয়ে করার কারণে আপনার মৃত্যুর দিন তাড়াতাড়ি ঘনিয়ে আসবে তাহলে আপনি ভুল ভাবছেন। কারণ ২০১৩ এর এক রিসার্চে দেখা গেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জন্ম গ্রহণকারীদের মধ্যে যারা অবিবাহিত তারা বিবাহিত অথবা দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের মধ্যে যারা আছে তাদের তুলনায় তাড়াতাড়ি মারা যায়। এর কারণ হিসেবে দেখা গেছে জীবনসঙ্গী মানুষকে আবেগ অনুভূতি বাড়িয়ে দেয়, সামাজিকভাবে একত্রে রাখে, মানসিকভাবে সমর্থন দেয়, যার সব কিছুই সুস্থ স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন।
 
মানসিক চাপ কম থাকে
যদিও মাঝে মাঝে ঝগড়া লাগে তারপরও তার উপস্থিতি আপনার মনে এক ভালো লাগার অনুভূতি ছড়িয়ে দিবে। মানুষ যখন কোন মানসিক চাপের মধ্যে থাকে তখন শরীরে স্ট্রেস হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই স্ট্রেস হরমোন বিবাহিতের চেয়ে অবিবাহিতদের শরীরে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। অতিরিক্ত পরিমাণে মানসিক চাপ শরীরে সমস্যার জন্ম দেয়, বিশেষ করে হজমের সমস্যার সৃষ্টি করে। রিসার্চে জানা গেছে স্ট্রেস হরমোন বিবাহিতদের শরীরে সেরকম ভাবে ক্ষতি করতে পারে না কিন্তু অবিবাহিতদের শরীরে নানা সমস্যার বাসা তৈরি করে।
 
হার্ট এ্যাটাকের সম্ভাবনা হ্রাস পায়
ভালোবাসা হৃদযন্ত্রকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে যারা বিবাহিত অথবা কোন সম্পর্কের মাঝে আছে তাদের হার্ট-অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা নিঃসঙ্গ মানুষের চেয়ে কম। গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে সঙ্গীর নিবিড় সঙ্গ এবং নতুন পরিবারের নতুন সব আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু- বান্ধবের সাথে ভালো বন্ধনের কারণে হার্ট-অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস পায়। কারণ পরিবারের সাথে থাকলে মানুষ উৎফুল্ল থাকে। মনে কোন মানসিক চাপ থাকলে তা শেয়ার করতে পারে। এতে মনের উপর চাপ কম পড়ে।
 
হাড় শক্ত হয়
বিয়ে শরীরের হাড় মজবুত করে। অবাক হচ্ছেন? আসলেও তাই। বিয়ে শরীরের হাড় শক্ত করে এবং বিভিন্ন হাড়ের রোগের ঝুঁকি কমায়। বিয়ে হাড়ের খনিজ ঘনত্ব ঠিক রেখে হাড়ের এক ধরণের রোগ “অস্টিওপরোসিস” হওয়ার ঝুঁকি কমায়। একজন ভালো জীবনসঙ্গী পত্নীর মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে হাড়কে ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। তাই সুখী দাম্পত্য জীবন মহিলাদের হাড়ের খনিজ ঘনত্ব ঠিক রাখার জন্য জরুরী।

অস্ত্রোপচারের পর দ্রুত সুস্থ হওয়া

কেউ যখন আপনার পাশে সারাক্ষণ থেকে আপনার পরিচর্যা করবে তখন আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু আপনি যখন একা থাকবেন সে ক্ষেত্রে আপনার সুস্থ হতে অনেক সময় লেগে যাবে। কারণ তখন আপনার সব কাজগুলো আপনার নিজেরই করতে হবে। এছাড়াও আপনি যখন কার সান্নিধ্যে থাকবেন তখন বেঁচে থাকার একটা কারণ খুঁজে পাবেন। এক্ষেত্রে জীবন সঙ্গী আপনার বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়।
 
অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঝুঁকি কমে
জীবনে কতবার আপনি আপনার জীবনসঙ্গীকে আকস্মিক দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করেছে? গবেষণায় দেখা গেছে তালাক প্রাপ্ত মহিলা এবং পুরুষেরা বিবাহিতদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ বেশি অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। গবেষকদের মতে বিয়ে দুটি মানুষকে পাশাপাশি রাখে এবং এসব অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণামের হাত থেকে রক্ষা করে।
 
বিষণ্ণতা কমায়
একাকীত্বের কারণে অথবা অন্য সমস্যার কারণেও মানুষ বিষণ্ণতায় ভুগতে পারে। আর মানুষ যখন হতাশায় ভুগে তখন কি পরিমাণ মানসিক বিপর্যয় ঘটছে তার নিজের, তা সে বুঝতে পারে না। কারণ বিষণ্ণতার প্রথম উপসর্গ হচ্ছে আত্ম-উপলব্ধির হ্রাস পাওয়া। তাই বিষণ্ণতাকে সনাক্ত করতে এবং দূর করতে প্রয়োজন একজন সঙ্গীর। যে সব সময় আপনার সাথে থাকবে, যার সাথে আপনি সবকিছু শেয়ার করতে পারবেন।
 
ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়
২০১৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যে সকল মানুষ মরণ ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিল তাদের মধ্যে শতকরা ২০ ভাগ এর বেশি মানুষ আরোগ্য লাভ করতে সক্ষম হত যদি তারা বিবাহিত হত। এই সাফল্যের হার কেমোথেরাপির থেকেও বেশি। একটি স্বাভাবিক স্থিতিশীল সম্পর্কই প্রথম ধাপের ক্যান্সার সনাক্ত করতে পারে। আর এই বন্ধনই ক্যান্সারের সাথে লড়ে সুস্থ হওয়ার অনুপ্রেরণা যোগায়। একজন উপর্যুক্ত সঙ্গিনী তার সঙ্গীকে খারাপ এবং জীবনের জন্য ঝুঁকিকর কাজ করা থেকে বিরত রাখতে পারে। যেমনঃ মদ্যপান, মাদক সেবন ইত্যাদি।
 
স্মৃতিভ্রংশ প্রবণতা কমায়
যদি জীবনে এমন সঙ্গী থাকে যার কাছে গেলে মনে শান্তি আসে তাহলে বার্ধক্য কখনো তাকে স্পর্শ করতে পারে না। গবেষণায় দেখা গেছে যারা তালাকপ্রাপ্ত হয়ে পুনরায় বিয়ে করে নি তাদের স্মৃতি শক্তি নষ্ট হওয়ার প্রবণতা প্রায় তিন গুন বেশি হয় এবং যারা মাঝ বয়সে বিধবা হওয়ার পর আর বিয়ে করেনি তাদের স্মৃতিভ্রংশ প্রবণতা ছয়গুণ বেড়ে যায়। গবেষকরা বলেন বিবাহিত এবং সারাজীবন মানসিকভাবে এবং সামাজিকভাবে পাশাপাশি থাকলে মন প্রফুল্ল থাকে এবং স্মৃতি শক্তি কম হ্রাস পায়।
 
বিভিন্ন অসুখ থেকে মুক্তি
সুখী দম্পতিদের কখনো টাইপক-২ ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা, ফাইব্রোমাইলজিয়া মত অসুখ হতে দেখা যায় না।  যেকোনো জিনিস নিয়ে অতিরিক্ত মানসিক চাপ শরীরে উপর খারাপ ভাবে প্রভাব ফেলে। তাই সুস্থ থাকতে হলে সুখী দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করা অতীব জরুরী।  সূত্র: উর্বশী, জাগো নিউজ

বিয়ে নিয়ে প্রতারণা! – আইন অধিকার

বিয়ে নিয়েও প্রতারণার ঘটনা ঘটতে দেখা যায়।  অনেক সময় দুজন ছেলেমেয়ে নিজেদের ইচ্ছায় বিয়ে করেন।  বিয়ের কথা পরিবারের কাউকে জানান না।  কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই ছেলে বা মেয়ে বিয়ের কথা গোপন রেখে অন্য কোথাও পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী বিয়ে করে ফেলেন। আবার দেখা যায় দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক কোনো কারণে ভেঙে গেলে কোনো পক্ষ ভুয়া কাবিননামা তৈরি করে স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে দাবি করতে থাকে। আবার এমনও দেখা যায় আদৌ বিয়ে হয়নি অথচ বিয়ে হয়েছে, এ বলে মিথ্যা প্রমাণ দেখিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মতো সংসার করতে থাকেন। মেয়েটিকে আর ভালো না লাগলে কিংবা মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে ছেলেটি বিয়ে অস্বীকার করতে থাকে। এ ধরনের ঘটনাগুলোই বিয়ে-সংক্রান্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।  বিয়ে নিয়ে যদি প্রতারণা বা অন্য কোনো অপরাধ ঘটে তাহলে এর কি কোনো প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ আছে? অবশ্যই আছে। দণ্ডবিধি আইনে বিয়ে-সংক্রান্ত অপরাধের কঠিন শাস্তির বিধান করা হয়েছে।

যে শাস্তি রয়েছেঃ 
দণ্ডবিধির ৪৯৩ ধারা থেকে ৪৯৬ ধারা পর্যন্ত বিয়ে-সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের শাস্তির বিধান আছে, যার অধিকাংশ অপরাধই জামিন অযোগ্য।   ধারা ৪৯৩ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীকে প্রতারণামূলকভাবে আইনসম্মত বিবাহিত বলে বিশ্বাস করান, কিন্তু আদৌ ওই বিয়ে আইনসম্মতভাবে না হয় এবং ওই নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে অপরাধী ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ৪৯৪ ধারায় উল্লেখ আছে, যদি কোনো ব্যক্তি এক স্বামী বা এক স্ত্রী জীবিত থাকা সত্ত্বেও পুনরায় বিয়ে করেন, তাহলে দায়ী ব্যক্তি সাত বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

৪৯৫ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয় বা পরবর্তী বিয়ে করার সময় প্রথম বা আগের বিয়ের তথ্য গোপন রাখেন, তা যদি দ্বিতীয় বিবাহিত ব্যক্তি জানতে পারেন, তাহলে অপরাধী ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। ৪৯৬ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি আইনসম্মত বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা ব্যতীত প্রতারণামূলকভাবে বিয়ে সম্পন্ন করেন, তাহলে অপরাধী সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ ছাড়া কোনো মুসলমান ব্যক্তি ১ম স্ত্রী থাকলে সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া এবং প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করেন, তিনি ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ (৫) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করবেন। অভিযোগে দোষী প্রমাণিত হলে ব্যক্তিকে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

কোথায় কীভাবে আইনের আশ্রয় নিতে হবেঃ 
বিয়ে-সংক্রান্ত অপরাধের জন্য অভিযোগ থানা বা আদালতে গিয়ে চাওয়া যাবে। থানায় এজাহার হিসেবে মামলা দায়ের করতে হবে। যদি মামলা না নিতে চায় তাহলে সরাসরি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গিয়ে সরাসরি মামলা দায়ের করা যাবে। কেউ কেউ থানায় না গিয়ে সরাসরি আদালতে মামলা করে থাকেন। এতে কোনো সমস্যা নেই। আদালতে মামলা করার সময় যথাযথ প্রমাণসহ অভিযোগের স্পষ্ট বর্ণনা দিতে হবে এবং সাক্ষীদের নাম-ঠিকানাও দিতে হবে। আদালত অভিযোগকারীর জবানবন্দি গ্রহণ করে যেকোনো আদেশ দিতে পারেন। অনেক সময় অভিযোগ আমলে না নিয়ে প্রাথমিক তদন্তের জন্য নির্দেশ দিতে পারেন। কেউ যদি স্বামী বা স্ত্রীর পরিচয়ে নিজেদের অন্তরঙ্গ ছবি ফেসবুক বা অন্য কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে অথচ আদৌ কোনো বিয়ে সম্পন্ন হয়নি তাহলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে মামলা করার সুযোগ আছে এবং এ মামলা থানায় করতে হবে। এ ছাড়া ভুয়া কাবিননামা তৈরি করলে জালিয়াতির অভিযোগও আনা যাবে।

যে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবেঃ 
বিয়ে যেভাবেই সম্পন্ন হোক না কেন কাবিননামা কিংবা বিয়ের সব দলিল নিজের কাছে রাখা উচিত। কাবিননামার ওপর কাজির সিল স্বাক্ষর আছে কি না যাচাই করে নিতে হবে এবং কোন কাজির মাধ্যমে বিয়েটি সম্পন্ন হলো তার সঙ্গে যোগাযোগ করে সত্যতা যাচাই করে নেওয়া ভালো। মুসলিম বিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। এটা স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই মনে রাখতে হবে। বর্তমানে হিন্দু বিয়ের নিবন্ধনও ঐচ্ছিক করা হয়েছে। বিয়ের হলফনামা করা থাকলে তাও সংগ্রহে রাখতে হবে।

লেখক: তানজিম আল ইসলাম | আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
সুত্রঃ প্রথম আলো, জুন ০৮, ২০১৬

হারানো সুর ফিরে পাওয়া

বিয়ে একটি সামাজিক বন্ধন। স্ত্রী-পুরুষের সম্পর্কের একটি স্বীকৃত কাঠামো যা বংশধারা ও অধিকার বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালক করে। বিয়ে যেহেতু একটি সম্পর্কের বন্ধন, সব সম্পর্কের মতো বিশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি এর মূল ভিত্তি। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও নির্ভরশীলতা এই বন্ধনকে সুদৃঢ় করে।ভালোবাসাই এই বন্ধনের চালিকাশক্তি। এই বন্ধনের সফলতা নির্ভর করে ফলপ্রসূ যোগাযোগের উপর। এই যোগাযোগ প্রতিনিয়ত ঘটছে এবং সকল সম্পর্কের মতো বিয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত অবধারিত সত্য।

সম্পর্কের প্রথম দিকে ভালোবাসার আবেগ মনের জানালায় একটি রঙিন পর্দা টাঙিয়ে দেয়। ভালোলাগা এবং ভালোবাসাটাই প্রধান হয়ে দেখা দেয়। বাকি সবকিছু তুচ্ছ মনে হয়।

দাম্পত্য জীবনে একসঙ্গে অবস্থানের ফলে আবেগের সেই রঙিন পর্দায় সময়-অসময়ে বাস্তবতার দোলা লাগে। সাংসারিক টানপড়েনে চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মিলাতে গিয়ে কল্পনার মানুষটা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। কল্পনার মানুষটার সাথে সত্যিকার রূপের অমিল প্রকাশিত হয়। যে মানুষটা ভালোবাসার হাত ধরে সুখের নীড় রচনা শুরু করেছিল, সে যেন হয়ে ওঠে সবচেয়ে অচেনা।

প্রাত্যহিক জীবনে একসাথে চলার পথে কখনও কখনও ছন্দপতন খুবই স্বাভাবিক। দুটি ভিন্ন পরিবার ও পরিবেশে বড় হওয়া দুজন মানুষের মধ্যে মতপার্থক্য, দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য, চাওয়া-পাওয়ার পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। এই পার্থক্য উপলব্ধি করে দুজনের মিলের জায়গাটি লালন করা এবং অমিল কমিয়ে আনার ইচ্ছা ও চেষ্টাই বৈবাহিক উদ্দেশ্যকে সফল করে তোলে।

বিয়ের সৌন্দর‌্য নির্ভর করে মুক্ত আলোচনা, পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ ও উভয়ের মধ্যে সুস্থ সীমারেখা, সব বিষয়ে নিজেকে জড়িয়ে না ফেলা, উভয়ের চাহিদার প্রতি সমান গুরুত্ব দেয়ার উপর। এ ক্ষেত্রে দাম্পত্য কাউন্সেলিং প্রিয় মানুষটার অজানা দিকগুলো বুঝে নিয়ে নতুন করে বিয়ের বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে শেখায়। তালাকের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।সেখানে এটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ।

  • শুধু সঠিকভাবে যোগাযোগ কৌশল শিখলেই বৈবাহিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত মোকাবেলা করা সম্ভব না। বরং সুখী বৈবাহিক জীবনের জন্য কার কী প্রয়োজন সেদিকে লক্ষ্য রাখাই দাম্পত্য কাউন্সেলিং সেবার প্রাথমিক ধাপ।
  • বেশিরভাগ দম্পতির সব কথার শেষ কথা, আমি তাকে খুব ভালোবাসি। হারানো সুরটা ফিরে পেতে দুজন দুজনের অবস্থান থেকে কী কী পদক্ষেপ নিতে পারেন সেদিকে লক্ষ্য রাখা।
  • কী কারণে বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে এতদিন কোন শক্তিগুলো দুজনকে একসাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ রেখেছে তা খুঁজে বের করা। পার্থক্য না মিলকে পুঁজি করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সদিচ্ছা দুজনের মধ্যে তৈরী করার ক্ষেত্রে দাম্পত্য কাউন্সেলিং সাহায্য করে।

দুটি ভিন্ন ব্যক্তির অভ্যাস ও চাহিদা ভিন্ন। উভয়ের চাওয়া-পাওয়ার সুক্ষ্ণ হিসাব-নিকাশ সম্পর্ককে খারাপ দিকেই নিয়ে যায়। এই ভিন্ন ব্যক্তিকে আপন করে নেওয়ার জন্য দুজনের আনন্দ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিলে তা সংসার জীবনে শান্তি আনতে সাহায্য করে।

এর জন্য করণীয় যা কিছু তার দায়িত্ব নিজে বহন করার মানসিকতা তৈরী ও সীমারেখা অনুধাবন করে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠাতে হবে। পারস্পরিক সম্মানবোধ ও সহনশীলতা দাম্পত্যজীবনে সুখ আনতে সাহায্য করে। একইভাবে তা হারানো সম্পর্ক ফিরে পেতেও সাহায্য করে। অন্য অনেক ক্ষেত্রের মতো সম্পর্ক রক্ষায়ও সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার দরকার হয়। নিজের জায়গা থেকে প্রত্যেকে উদ্যোগ নিলে দাম্পত্য সুখ নতুন করে উপলব্ধি করা সম্ভব।

লিখেছেনঃ

ড. শাহীন ইসলাম
মনোবিজ্ঞানী,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপার্সন

সন্তানের উপর বিচ্ছেদের প্রভাব

বিবাহবিচ্ছেদ একজোড়া নারী-পুরুষ আর সেই সাথে তাদের সন্তানদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক। যে কারণেই স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ হোক না কেন, শিশু সন্তানটির উপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।অত্যন্ত সচেতনতা, পারদর্শিতা আর অগাধ ভালোবাসা ও মানসিক সহায়তার মাধ্যমেই শিশুর মনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব, হতাশা, অনিশ্চয়তা দূর করে তার সুস্থ মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হয়। তা না হলে এর বিরূপ প্রভাব থেকে সারা জীবনেও হয়ত সে বের হতে পারবে না, তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে সমস্যা থেকে যাবে এবং পরবর্তী জীবনে অন্যের সাথে সম্পর্ক স্থাপনেও তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরী করবে।

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিবাহবিচ্ছেদের মতো বিষয় সাধারণত খুব সহজে সম্পাদিত হয় না, এর কিছু পূর্বগামী ঘটনা থাকে যেগুলো মোটেও সুখকর না। এই অপ্রীতিকর ঘটনাগুলোর সাক্ষী কিন্তু ছোট্ট শিশুটি। দীর্ঘদিন ধরে চলা দাম্পত্য কলহ, মানোমালিন্য, শারীরিক নির্যাতন, কান্নাকাটির মতো অপ্রীতিকর কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে শিশুটিকে যেতে হয়।বাড়ির ছোট শিশু এসব দেখে বাড়ির আবহ বুঝতে পারে। সরাসরি মা-বাবার কলহ না দেখেও মা-বাবার চেহারা, প্রকাশভঙ্গি, অঙ্গভঙ্গি দেখে তাদের রাগ, ক্ষোভ, হতাশা, কষ্ট বুঝতে পারে। আমাদের একটা ভুল ধারণা আছে যে, বাচ্চারা কিছু বোঝে না। প্রকৃতপক্ষে শিশুরা সবই বোঝে আর তারা তাদের নিজেদের মতো করে বিষয়টি বুঝে নেয়। অনেক স্বামী স্ত্রী সন্তানদের সামনেই পরস্পরের প্রতি কটূক্তি, গালাগালি, হাতাহাতি করে থাকে কিংবা শিশুটিকে ঘটনার সাক্ষী রাখে। এর সবই শিশুসন্তানটির উপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বড়রা অনেক সময়ই নিজেদের স্বার্থে শিশুদের ব্যবহার করে যা অত্যন্ত অনুচিত।

একজন শিশুর পরিস্থিতি বোঝার দক্ষতা বড়দের মতো নয়। সে সব বোঝে, তবে নিজের মতো করে। তাই পরিস্থিতির সাথে নিজের মতো করে খাপ খাইয়ে চলার চেষ্টা করে। অনেক সময় ছোট ঘটনা তার মধ্যে বড় অনিশ্চয়তা তৈরী করে। সামান্য উদ্বেগ তার মধ্যে বিশাল ভীতির সঞ্চার করে। এর সবকিছু নিয়ে শিশুটি খুব নাজুক পরিস্থিতিতে থাকে। মা কিংবা বাবার মৌখিক আশ্বাসও তাকে নিরুদ্বেগ রাখতে পারে না। মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, শিশুদের মধ্যে যেসব সমস্যা থাকে তা হলঃ

  • নিজেকে গুটিয়ে নেয়া
  • পারিবারের বাইরের লোকের সামনে লজ্জা পাওয়া, মিথ্যা বলা
  • মা বা বাবাকে (বা যার সাথে শিশুটি এখন থাকে )হারিয়ে ফেলার ভয়, অনিশ্চয়তার অনুভূতি
  • বিষন্ণতা
  • নিজের চাহিদার কথা না বলা
  • আগের তুলনায় চুপচাপ হয়ে যাওয়া
  • অস্থিরতা প্রকাশ করা বা অল্পতেই রেগে যাওয়া
  • পড়াশোনায় মনোযোগ হারানো
  • বাবা-মা অথবা নিজেকে দোষারোপ করা
  • নেশা করা বা অপরধমূলক কাজে জড়িয়ে যাওয়া
  • আচরনগত বৈকল্যের শিকার হওয়া

বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে এমন পরিবারের বিভিন্ন বয়সী শিশুদের উপর পরিচালিত গবেষণা থেকে দেখা যায়, ৭-৮ বছরের শিশুদের মাঝে দুঃখবোধ, মনমরা ভাব, হারানোর অনুভূতি- সেই সাথে ভয় আর অনিশ্চয়তা বিরাজ করে। একই সাথে তারা নিজেদের পরিত্যক্ত ও অবাঞ্ছিত ভাবে।৯-১০ বছর বয়সী শিশুরা রাগান্বিত বোধ করে। কারণ তারা নিজেদের অবহেলিত, বঞ্চিত এবং একাকী মনে করে। অপরদিকে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীরা রাগ, লজ্জা, মনখারাপ ইত্যাদি বোধ করে।

৫ বছরব্যাপী আরেকটি গবেষণাঃ জরিপে অংশগ্রহণ করেছে এমন শিশুদের মধ্যে ৩৪ শতাংশ জানিয়েছে তারা এখন সুখী।২৯ শতাংশ মোটামুটি মানিয়ে চলছে। ৩৭ শতাংশ জানিয়েছে, তারা এখনও বিষন্ণতায় ভুগছে। এ ধরণের বহু গবেষণায় শিশুদের বিবাহবিচ্ছেদের নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে।

এ ক্ষেত্রে তার সাথে বেশি সময় কাটান। তার হতাশা, দুঃখ ও ভয় বোঝার চেষ্টা করুন। বাস্তবসম্মতভাবে মোকাবেলার উপায় শেখান। শিশু মা-বাবার (যিনি শিশুর সাথে থাকেন না ) অভাব অনুভব করছে কিনা তা বোঝার চেষ্টা করুন।কারণ শিশু হয়ত আপনাকে হারানোর ভয়ে অথবা আপনি কষ্ট পাবেন এ চিন্তা থেকে তার সত্যিকারের অনুভূতি আড়াল করে রেখেছে। তাকে আশ্বস্ত করুন, যা কিছু হয়েছে তার জন্য সে দায়ী নয়। কারণ ছোট শিশুরা অনেক সময় ভেবে থাকে যে, তার কারণেই এমনটি ঘটেছে। কখনোই শিশুর সামনে তার মা-বাবা সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করবেন না। এতে শিশুরা অত্যন্ত অসহায় বোধ করে এবং দিশেহারা হয়ে পড়ে। সম্ভব হলে তাকে এই বলে আশ্বস্ত করুন, যা কিছু হয়েছে তা আমাদের মধ্যে, তুমি আমাদের সন্তান, আমরা তোমাকে ভালোবাসি। একসাথে না থাকলেও। অনেক সময় যে পরিবারে শিশুটি রয়েছে সেখানে মা-বাবার প্রসঙ্গ কঠোরভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। এতে শিশুর মধ্যে মা-বাবা সম্পর্কে কোন জিজ্ঞাসা থাকলেও সে ভয়ে কোন কিছু বলতে পারে না। তাই তার মনে কোনো প্রশ্ন এলে তা যেন অবলীলায় জিজ্ঞেস করতে পারে-এরকম পরিবেশ বজায় রাখুন।

শিশুটির বাবা (অথবা মা )নেই।তাই তাকে বেশি বেশি খেলনা দেওয়া বা এধরণের আচর থেকে বিরত থাকুন। বস্তুর চেয়ে বড় তার আবেগ-অনুভূতির সঙ্গী হওয়া, তাকে আশ্বস্ত করা এবং এই কষ্টকর অনুভূতি থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করা।

বাবা-মা যে-ই থাকুক না কেন, শিশুর মানসিক সহয়তার জন্য তার পাশে দাঁড়াতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষা মনোবিজ্ঞান বা কাউন্সেলিং মনোবিজ্ঞানের সহায়তা নিতে হবে।

মানসিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এ ধরণের শিশুদের প্রতি আমাদের সচেতনতা, ভালোবাসা ও সহায়তা তাদের হতাশা, অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ, একাকীত্বের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হবার সাহস ও মনোবল জোগাবে।

লিখেছেনঃ

মেহজাবীন হক
প্রফেসর, 
এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সন্তানের অভিভাবকত্ব

স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কোন কারণে বিচ্ছেদ হয়ে গেলে সন্তানেরা কার কাছে থাকবে বা কে হবে তাদের অভিভাবক- এই প্রশ্ন দেখা দেয়। মুসলিম পারিবারিক আইনে সন্তানের অভিভাবকত্ব (বিলায়াত ) এবং সন্তানের জিম্মাদারি (হিজানাত ) দুটি বিষয়কে আলাদা আইনগত প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।অর্থাৎ মুসলিম আইনে অভিভাবকত্ব এবং জিম্মাদারি দুটি আলাদা বিষয়। আবার হিন্দু পারিবারিক আইনে বিষয়টি ভিন্ন।

মুসলিম আইনে সন্তানের অভিভাবকত্ব ও জিম্মাদারি

বাংলাদেশের প্রায় সব পারিবারিক আইনেই সন্তানের প্রকৃত আইনগত অভিভাবক (লিগাল গার্ডিয়ান )থাকেন পিতা। মুসলিম পারিবারিক আইনে সন্তানের জিম্মাদারির (কাস্টডি )অধিকার একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মায়ের হাতে থাকে।শিশুসন্তানের দেখাশোনার বিষয়ে (জিম্মাদারির ক্ষেত্রে )সবচেয়ে বড় অধিকারী হলেন মা। তিনি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সন্তানের জিম্মাদার হয়ে থাকেন; কিন্তু কখনও অভিভাবক হতে পারেন না। এই সময়কাল হল ছেলেসন্তানের ক্ষেত্রে ৭ বছর আর মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিকাল পয্যন্ত। অর্থাৎ স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটলে বা স্বামী মারা গেলে ছেলেসন্তান ৭ বছর পয্যন্ত এবং মেয়েসন্তান বয়ঃসন্ধিকাল পয্যন্ত মায়ের হেফাজতে থাকবে, এটাই আইন । এক্ষেত্রে মায়ের অধিকার সর্বাগ্রে স্বীকৃত।

সাধারণত সুন্নি হানাফি আইনের অধীনে নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর সন্তানের হেফাজতের কোনো অধিকার মায়ের থাকে না। তবে পরে আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, শুধু নাবালক থাকাকালেই নয়, সন্তানের কল্যাণার্থে নির্দিষ্ট বয়সের পরও মায়ের জিম্মাদারিত্বে সন্তান থাকতে পারে। যদি আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয় যে, সন্তান মায়ের হেফাজতে থাকলে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ স্বাভাবিক হবে, তার কল্যাণ হবে এবং স্বার্থরক্ষা হবে-সেক্ষেত্রে আদালত মাকে ওই বয়সের পরও সন্তানের জিম্মাদার নিয়োগ করতে পারেন।আবু বকর সিদ্দিকী বনাম এসএমএ বকর ৩৮ ডিএলআরের মামালায় এই নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে, মনে রাখতে হবে, মুসলিম আইনে মা সন্তানের আইনগত অভিভাবক নন; কেবল জিম্মাদার বা হেফাজতকারী।

মায়ের অবর্তমানে শিশুর জিম্মাদারি নিকটাত্মীয়দের কাছে চলে যাবে। এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ক্রমধারা অবলম্বন করা হবে। মায়ের অবর্তমানে নাবালক শিশুর হেফাজতকারী পর্যায়ক্রমে হবেন মায়ের মা (নানি, নানির মা যত উপরের দিকে হোক ), পিতার মা (দাদি, দাদির মা যত উপরের দিকে হোক ), পূর্ণ বোন (পিতা মাতা একই ), বৈপিত্রেয় বোন (মা একই কিন্তু বাবা ভিন্ন), আপন বোনের মেয়ে (যত নিচের দিকে হোক ), বৈপিত্রেয় বোনের মেয়ে (যত নিচের দিকে হোক ), পূর্ণ খালা (যত উপরের দিকে হোক ), বৈপিত্রেয় খালা (যত উপরের দিকে হোক ), পূর্ণ ফুপু (যত উপরের দিকে হোক ) । উল্লেখিত আত্মীয়রা কেবল ক্রমানুসারে একজনের অবর্তমানে বা অযোগ্যতার কারণে অন্যজন জিম্মাদারিত্বের অধিকারী হবেন।

কিছু কারণে মা সন্তানের জিম্মাদারিত্ব হারাতে পারেনঃ ১. নীতিহীন জীবনযাপন করলে ২. সন্তানের প্রতি অবহেলা করলে ৩. দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে ৪. বিয়ে থাকা অবস্থায় বাসার বসবাসস্থল থেকে দূরে অবস্থান করলে ৫. ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করলে ৬.যদি সন্তানের পিতাকে তার জিম্মায় থাকা অবস্থায় দেখতে না দেয়।

স্মর্তব্য, আদালতের আদেশ ছাড়া সন্তানের জিম্মাদারের অধিকার থেকে মাকে বঞ্চিত করা যায় না।

মা বা অন্য নারী আত্মীয়দের অবর্তমানে শিশুর জিম্মাদার হতে পারেন যারা, তারা হলেনঃ বাবা, বাবার বাবা (যত উপরের দিকে হোক ), আপন ভাই, রক্তের সম্পর্কে ভাই, আপন ভাইয়ের ছেলে, রক্তের সম্পর্কের ভাইয়ের ছেলে, বাবার আপন  ভাইয়ের ছেলে, বাবার রক্তের সম্পর্কের ভাইয়ের ছেলে। মনে রাখতে হবে, েএকজন পুরুষ আত্মীয় নাবালিকার জিম্মাদার কেবল তখনই হতে পারবেন যখন তিনি ওই নাবালিকার নিষিদ্ধস্তরের আত্মীয় হন।

সন্তানের সম্পত্তির দায়িত্ব

আমরা আগেই জেনেছি, সন্তানের অভিভাবক হচ্ছেন পিতা। তবে মুসলিম আইনে কোনো নাবালক শিশুর সম্পত্তির তিন ধরণের অভিভাবক হতে পারে। আইনগত অভিভাবক, আদালত কর্তৃক নিযুক্ত অভিভাবক এবং কার্যত অভিভাবক। আইনগত অভিভাবকেরা হলেন, বাবা, বাবার ইচ্ছাপত্রে (উইল )উল্লেখিত ব্যক্তি, বাবার বাবা (দাদা ), বাবার বাবার ইচ্ছাপত্রে (উইল ) উল্লেখিত ব্যক্তি।

উল্লেখিত আইনগত অভিভাবকেরা কিছু জরুরী কারণে নাবালকের সম্পত্তি বিক্রি অথবা বন্ধক দিতে পারেন। ওই সন্তানের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানসহ মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য তার অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি অথবা বন্ধক দিতে পারেন। কিংবা নাবালকের ভরণপোষণ, উইলের দাবি, ঋণ, ভূমিকর পরিশোধ ইত্যাদির জন্য একজন আইনগত অভিভাবক নিচের একবা একাধিক কারণে স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন। যেমন: ক. ক্রেতা দ্বিগুণ দাম দিতে প্রস্তুত খ. স্থাবর সম্পত্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে গ. সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হচ্ছে।

নাবালককে রক্ষার জন্য আেইনগত অভিভাবক বা আদালক নিযুক্ত অভিভাবক না হয়েও যেকেউ নাবালকের অভিভাবক হিসেবে কাজ করতে পারেন। বাস্তবে এরকম যিনি অভিভাবক হিসেবে কাজ করেন তিনিই হলেন কার্যত অভিভাবক। তবে তিনি কোন অবস্থাতেই সম্পত্তির স্বত্ব, স্বার্থ বা অধিকার হস্তান্তর করতে পারবেন না।

হিন্দু পারিবারিক আইনে অভিভাবকত্ব

মুসলিম আইনের মতো এখানে সন্তানের অভিভাবকত্ব এবং জিম্মাদারিকে আলাদা আইনগত প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। হিন্দু আইনে ৩ ধরণের অভিভাবক স্বীকৃত। ক.স্বাভাবিক অভিভাবক খ.বাবা কর্তৃক উইলদ্বারা নিযুক্ত অভিভাবক গ.গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট ১৮৯০ অনুযায়ী আদালত কর্তৃক নিযুক্ত অভিভাবক। এছাড়া কার্যত অভিভাবক হিসেবেও অভিভাবক দেখা যায়। হিন্দু আইনে পিতা একমাত্র প্রকৃত ও স্বাভাবিক অভিভাবক। এবং পিতার জীবিত অবস্থায় অন্যকেউ অভিভাবক হতে পারে না। কিন্তু, সন্তানের মঙ্গল ও শিক্ষার জন্য পিতা ইচ্ছা করলে অন্য কারও উপর নাবালকের দায়িত্ব দিতে পারেন। আবার প্রয়োজনে ইচ্ছা করলে তিনি এই দায়িত্ব ফিরিও নিতে পারেন। বাবার অবর্তমানে মা নাবালকের শরীর ও সম্পত্তির আইনগত অভিভাবক, কিন্তু বাবা যদি উইল করে অন্য কাউকে নাবালকের অভিভাবক নিযুক্ত করেন, তাহলে মা অপেক্ষা সেই ব্যক্তির দাবি অগ্রগণ্য হবে। মা-বাবা কেউ না থাকলে প্রয়োজনে আদালত নাবালকের নিকটবর্তী আত্মীয়দের মধ্য থেকে একজনকে অভিভাবক নিযুক্ত করতে পারেন। নাবালকের বয়স ২১ হয়ে গেলে সে সাবালক হয়ে যায় এবং তখন আর তার কেনো অভিভাবক প্রয়োজন হয় না। আদালত অভিভাবক নিযুক্তির সময় নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি দেবেনঃ ক.নাবালকের স্বাভাবিক অভিভাবক মৃত্যুকালে যদি অভিভাবক নিয়োগের ব্যাপারে কোন ইঙ্গিত দিয়ে যায় তা; খ.নাবালক যদি তার বুদ্ধিবৃত্তি সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন হয় তবে সেক্ষেত্রে তার মতামতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

কোন হিন্দু নাবালকের সম্পত্তির জন্য আদালত যদি অভিভাবক নিযুক্ত করে তবে সে অভিভাবক আদালতের অনুমতি ছাড়া সম্পত্তি বিক্রি, বন্ধক বা হস্তান্তর করতে পারে না এবং তা কেনার অধিকারও নেই।

খ্রিষ্টান আইনে সন্তানের অভিভাবকত্ব

খ্রিষ্টান ধর্মে অভিভাবকত্ব নির্ধারণ হয় দুইভাবে: বিবাহবিচ্ছেদ বা জুডিশিয়াল সেপারেশনের মাধ্যমে এবং গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্টের মাধ্যমে। সন্তানের অভিভাবকত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে আদালতের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হবে সন্তানের কল্যাণ। অর্থাৎ বাবা অথবা মা, কার কাছে থাকলে সন্তানের লালন পালন বেশি ভালো হবে। সুতরাং সন্তানের ভালো থাকাই সর্বোচ্চ বিবেচনার বিষয়।

এছাড়া আরও দুটি বিষয় সন্তানের অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে বিবেচনায় আসবে। প্রথমত, সন্তানের ধর্ম। খ্রিষ্টান পারিবারিক আইন অনুযায়ী সন্তানের প্রকৃত অভিভাবক পিতা। ফলে সন্তান মায়ের কাছে থাকলেও পিতার ধর্মবিশ্বাসেই তাকে বড় করতে হবে এমনকি মায়ের ধর্মবিশ্বাস ভিন্ন হলেও। মা যদি সন্তানকে বাবার ধর্মবিশ্বাসে বড় করতে ব্যর্থ হন তাহলে তিনি অভিভাবকত্ব হারাতে পারেন। দ্বিতীয়ত, মায়ের অর্থনৈতিক অবস্থা যদি ভালো না হয় তাহলে সন্তানের লালনপালন, ভরণপোষণ, প্রতিপালন, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদিতে ব্যাঘাত ঘটবে বলে যদি আদালত মনে করেন, তাহলে আদালতও সন্তানের পিতামহকেই গুরুত্ব দেবে। এক্ষেত্রে পিতামহের আর্থিক অবস্থা মায়ের চেয়ে স্বচ্ছল হতে হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৮৫ সালে গঠিত পারিবারিক আদালতে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টানসহ সকল ধর্মের নাগরিক সন্তানের অভিভাবকত্ব বিষয়ে মামলা করতে পারবেন।

লিখেছেনঃ

এডভোকেট লায়েকুজ্জামান মোল্লা
সিনিয়র এডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট

পারিবারিক আইন, ডিভোর্স ও অন্যান্য

পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে দুটো ভিন্ন চরিত্রের একসাথে জীবন পার করে দেওয়া সহজ না। মানিয়ে চলাই তাদের প্রিলিমিনারি সামাজিক শিক্ষা। মানিয়ে নিতে না পারলেও একে অপরকে ছেড়ে যাওয়া মুখের কথা নয়। আবার কিছু আইনী প্রক্রিয়াও রয়ে যায়। বদলে যাওয়া সম্পর্কের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন হ্য় সামাজিক ও আইনি সাহায্য। এসবের ঠিকুজি জানতেই ড.শাহনাজ হুদার মুখোমুখি লুক।

লুক: বাংলাদেশের মুসলিম আইনে তালাক দেয়ার ক্ষেত্রে স্বামীর অধিকার কতটুকু?

শাহনাজ হুদা: আমাদের দেশের মুসলিম আইন অনুযায়ী, তালাক দেয়ার ক্ষেত্রে স্বামীর অধিকার স্ত্রীদের চেয়ে বেশি।কিন্তু এটা বলা যাবে না যে, তালাক দেওয়া কেবল স্বামীর অ্যাবসল্যুট রাইট। তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে কিছু আই্নগত প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। নোটিশ প্রদান, সালিশ-বোর্ডের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা, নোটিশ দেওয়ার পর ৯০ দিন অপেক্ষা করতে হয়। এছাড়া আমাদের আইনে স্বামীর তালাক দেওয়ার অধিকারকে নিকাহনামার ১৯ নং অনুচ্ছেদের মাধ্যমে খর্ব করা সম্ভব। ১৯ নং অনুচ্ছেদের যথাযথ প্রয়োগের জন্য নিকাহ রেজিষ্ট্রারদের কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলা দরকার। দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদটিকে অবহেলা করে রেজিষ্ট্রাররা শুধ না শব্দটি লিখেই চলে যায়।

লুক: এই একই আইনে তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে স্ত্রীর অধিকার কতটুকু?

শাহনাজ হুদা: এ দেশে মুসলিম আইনে তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বামীর তুলনায় স্ত্রীর অধিকার অনেকখানি খর্ব করা হয়েছে। স্বামী স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হলে, দীর্ঘদিন স্বামী নিরুদ্দেশ থাকলে, স্বামী নপুংসক হলে ইত্যাদি কারণে স্ত্রী স্বামীকে কোর্টের মাধ্যমে তালাক দিতে পারে। এছাড়া নিকাহনামায় যদি স্ত্রীকে তালাকে তাওফিজের অধিকার দেওয়া হয়, তাহলে স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে পারবে।

লুক: তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রীর কী কী অধিকার রয়েছে?

শাহনাজ হুদা: স্বামী স্ত্রীকে তিন মাসের ভরণপোষণ ও মোহরানার টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবে। ভরণপোষণের ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রীর সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।

লুক: তিন মাসের ভরণপোষণ কি স্ত্রীর জন্য যথেষ্ট বলে আপনি মনে করেন?

শাহনাজ হুদা: এটা কোনভাবেই স্ত্রীর জন্য যথেষ্ট না। কিছু মুসলিম দেশে এই বিধান পরিবর্তন করা হয়েছে। যেমন মিশরে, স্বামী যদি স্ত্রীকে কোন উপযুক্ত কারণ না দেখিয়ে তালাক দেয়, তাহলে একবছরের ভরণপোষণ দিতে হয়। আবার কিছু দেশে স্ত্রীর পুনর্বিবাহ কিংবা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দিতে হয়।

লুক: বর্তমান সময়ে নারীর সমান অধিকারের কথা বলা হয়। সমান অধিকারের কথা বিবেচনা করলে স্ত্রীর ভরণপোষণের যৌক্তিকতা কতটুকু?

শাহনাজ হুদা: এক্ষেত্রে সমান অধিকারের কথা বললে আরো অনেক আইন পরিবর্তন করতে হবে। বিশেষ করে সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার দিতে হবে। কারণ, পিতা-মাতার মৃত্যুর পর মেয়েরা ছেলের অর্ধেক সম্পত্তি পায়। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির যে পরিমাণ পায়, স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্বামী তার দ্বিগুণ পায়। এগুলো পরিবর্তন করার সাথে সাথে নারীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। আমরা যদি এই পরিবর্তনগুলো করতে পারি, তাহলেই স্ত্রীর স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ কেন পাবে, এই প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারি। অন্যথায় নয়।

লুক: বিভিন্ন দেশ যেমন মিশরে কোর্টের অনুমতি ছাড়া স্ত্রীকে তালাক দেয়া সম্ভব না। বাংলাদেশে এরকম আইনের দ্বারা তালাকের অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব? হলে কতটুকু?

শাহনাজ হুদা: কোর্টের অনুমতি নিয়ে তালাক দিতে হলে এর অপব্যবহার অনেকখানি রোধ করা সম্ভব।কিন্তু এক্ষেত্রে দেশের মানুষকে শিক্ষিত ও সচেতন হতে হবে। যেটা এ মুহুর্তে বাংলাদেশে কষ্টসাধ্য ব্যাপার। প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে আমাদের অধিকাংশ লোকজন কোর্টে যাবে না।এবং তালাক না দিয়েই স্ত্রীকে রেখে চলে যাবে। এতে স্ত্রী ভরণপোষণও পাবে না আবার পুনরায় বিয়ে করার বৈধতাও পাবে না। আরেকটি বড়ো কারণ হলো, বাংলাদেশের বেশিরভাগ কোর্টের অ্যাকসেস টু জাস্টিস কতোটুকু, তা নিয়েই প্রশ্ন আছে।

লুক: বাংলাদেশে কিছুদিন থেকে গ্রামের তুলনায় শহরে স্ত্রী কর্তৃক তালাকের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?

শাহনজ হুদা: অতীতে গ্রামে তালাকের পরিমাণ বেশি ছিলো। বর্তমানের গ্রামের তুলনায় শহর এলাকার স্ত্রীরা বেশি তালাক দিচ্ছে।তালাকের ইতিবাচক দিক হলো, স্বামীর সংসারে অপমান অবহেলা সহ্য করার চেয়ে পৃথক হয়ে যাওয়াই নারীর জন্য ভালো। নারীদের মাঝে সামাজিক সচেতনতা ও আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধির কারণে পৃথক থাকতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করছে। যা পরে তালাকে রূপ নিচ্ছে।

লুক: বিদ্যমান মুসলিম আইন পুরোপুরি কার্যকর করে তালাকের ক্ষেত্রে নারীর অধিকার রক্ষা করা কতটুকু সম্ভব?

শাহনাজ হুদা: আমি মনে করি, পুরোপুরি না হলেও বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নারীর অধিকাংশ অধিকারই সংরক্ষণ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে তালাকের পদ্ধতি, যেমন সালিশি-বোর্ড গঠন, বোর্ডের কাছে উপযুক্ত কারণ দর্শানো, নোটিশ দেওয়া, ৯০ দিন অপেক্ষা করা- এগুলোর নিশ্চয়তা প্রদানের সাথে সাথে যারা এগুলো ভঙ্গ করবে তাদের বিচারের আওতায় আনলে অহেতুক তালাকের পরিমান অনেকখানি হ্রাস পাবে।

আমাদের বিদ্যমান আইন কার্যকর করার সাথে সাথে আমরা যদি সোশ্যাল প্র্যাকটিস চেঞ্জ করতে পারি তাহলে তালাকের ক্ষেত্রে স্বামী এবং স্ত্রী উভয়ের অধিকাংশ অধিকার সংরক্ষণ সম্ভব।

লুক: বাংলাদেশে অভিন্ন পারিবারিক আইন চালুর ক্ষেত্রে আপনার অভিমত কি?

শাহনাজ হুদা: ব্যক্তিগতভাবে আমি বাংলাদেশে অভিন্ন আইন চালুর পক্ষপাতী। কিন্তু, বাস্তবিক অর্থে এ মুহুর্তে এটা চালু করা অনেকখানি অসম্ভব। এটা চালু করতে গেলে মুসলিম-হিন্দু-খ্রীষ্টান, সকল ধর্মের অধিকাংশ পারিবারিক আইন পরিবর্তিত হয়ে যাবে। যা দেশের ধর্মীয় জনগোষ্ঠি সহজে মেনে নেবে না। অভিন্ন পারিবারিক আইন চালু করতে গেলে আমাদের শিক্ষা প্রসারের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।

লুক: বাংলাদেশের হিন্দু আইনে তালাকের ব্যাপারে আপনার কী অভিমত?

শাহনাজ হুদা: বাংলাদেশের হিন্দু আইনে শুধু ১৯৪৬ সালের নারীর পৃথক বসবাসের অধিকার আইন দ্বারা বিবাহবিচ্ছেদ সম্ভব। যদিও ভারতে ১৯৫৬ সালে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য পৃথক আইন করা হয়, যার মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ সম্ভব। বাংলাদেশের হিন্দু আইন সংস্কারের জন্য অনেকবার সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু, ধর্মীয় নেতাদের আপত্তির কারণে তা আজও  কার্যকর করা সম্ভব হয় নি। তবে, বর্তমানে হিন্দু স্বামী-স্ত্রীরা এফিডেভিটের মাধ্যমে নিজেরা তালাক নিচ্ছে। এক্ষেত্রে কোন আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।

লুক: তালাক পরবর্তী সময়ে সন্তানের কাস্টডি কেমন হওয়া উচিত?

শাহনাজ হুদা: বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে পিতাই সন্তানের গার্ডিয়ান। কিন্তু, ছেলেসন্তানের বয়স সাত বছর এবং মেয়ে সন্তানের পিউবার্টির পূর্ব পর্যন্ত কাস্টডিয়ান হবে মা। কিন্তু, এ ক্ষেত্রে কোর্টের অনেক ডিসক্রিয়েশনাল পাওয়ার আছে। কোর্ট সন্তানদের কাস্টডি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বেষ্ট ইন্টারেষ্ট অব দ্যা চাইল্ড বিবেচনা করবে। আর সন্তান যদি মতামত দেয়ার মতো অবস্থায় থাকে, তাহলে কোর্ট তার মতামত বিবেচনা করবে। এক্ষেত্রে আমি বলতে চাই, পারিবারিক আইনের সব ব্যাপারে কোর্ট যদি কাস্টডি নির্ধারণের মতো বেষ্ট ইন্টারেষ্ট বিধি বিবেচনা করে তাহলে সব ব্যাপারই সহজভাবে সমাধান সম্ভব।

তালাকের মতো স্পর্শকাতর এমনভাবে আইন প্রনয়ন করতে হবে, যাতে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের স্বার্থ রক্ষা হয়। কেউ যেন কাউকে হয়রানি করতে না পারে। একটা বিষয় আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, অনেক সাধ করে দুজন মানুষ ঘর বাঁধে। এটা ভেঙে যাওয়া কম কষ্টের না। তাই এমন কোন রিএ্যাকটিভ বা উস্কানিমূলক কিছুকরা উচিত হবে না যাতে অহেতুক তালাক বৃদ্ধি পায়।

লুক: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

শাহনাজ হুদা: ধন্যবাদ লুক।

# লুকের পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন নোমান হোসাইন ও আলাল আহমেদ