পারিবারিকভাবে আয়োজিত বিয়ে এবং এরপর…

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মনে হচ্ছে বাসায় আমার জন্য যে পরীক্ষা অপেক্ষা করছে সেই পরীক্ষার কোন প্রশ্নের উত্তরই আমি জানি না। কারণ এইমাত্র পারিবারিকভাবে ঠিক করা এক পাত্রের সাথে আলাপ করে এলাম আর অবজেকটিভ পরীক্ষার মত এখনই ওই পাত্রের প্রাপ্ত নম্বর আমাকে আমার পরিবারের কাছে বলতে হবে। যার উত্তর আমার জানা নেই। আপন মনে এসব ভাবতে ভাবতেই শীলা পৌঁছে গেল দরজার কাছে, কিন্তু বেল আর বাজাতে পারছিল না আসন্ন পরীক্ষার ভয়ে। এ ধরনের অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় বহু মেয়েকেই তার জীবনে এবং সে সময় তার পাশে দাঁড়াবার কেউ থাকে না। জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তের সামনে এসে অসহায়ের মত একাকী দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

এখনও প্রেমের বিয়ের পাশাপাশি পারিবারিকভাবেও প্রচুর নারীর বিয়ে ঠিক করা হয়। কিন্তু এ ধরনের ক্ষেত্রে একজন পাত্র ও পাত্রীর মধ্যকার দূরত্ব রয়ে যায়, একে অপরকে না বুঝে জীবনসঙ্গী হিসেবে মেনে নেন যা ভবিষ্যত্ জীবনের ক্ষেত্রে কখনও কখনও বেশ বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পারিবারিকভাবে বিয়ে ঠিক করার জন্য শহরে শহরে বহু ঘটক রয়েছে বা পত্রিকা খুললেই পাত্র চাই বা পাত্রী চাই এমন অনেক বিজ্ঞাপন আমাদের চোখে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায়, বিয়ে সংঘটনের জন্য ঘটকরা দুই পক্ষেরই বহু তথ্য একে অপরের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে যা পরে প্রকাশিত হলে পারিবারিক দ্বন্দ্বের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন বিয়ের আগে পাত্র বা পাত্রীর কারও সাথে কোন ধরনের প্রেমের সম্পর্ক, নানা ধরনের সমস্যা বা অসুস্থতা এসব। ঘটকালিকে ব্যবসা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ায় এ ধরনের সমস্যা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগে আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবই ঘটকালির কাজটি করতেন। কিন্তু এখন কখনও কখনও সম্পূর্ণ অজানা দুই ভিন্ন পরিবারের মধ্যেও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় বাণিজ্যিকভাবে ঘটকালির মধ্য দিয়ে; যেমনটি শুনছিলাম মোনার কাছে।

একজন ঘটকের সাথে মোনার (ছদ্মনাম) বিয়ের জন্য যোগাযোগ করা হয়েছিল। তাদের মাধ্যমেই আতিকের সাথে ওর পরিচয়। ওদের প্রথম দেখা হয় টি.এস.সিতে। আতিকের বাবা, মা বা পরিবারের কাউকেই চিনত না মোনার পরিবার। যখন দেখা করতে যায় মোনার মনে হচ্ছিল সারা জীবন অবিবাহিত থাকাও এর চেয়ে ভাল। মোনা বলে, প্রথম দিনে ভাইবা পরীক্ষা দিলাম। আমার পছন্দ- অপছন্দ, রান্না-বান্না পারা না পারা, আগের জীবন, ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা ইত্যাদি নানাকিছু। আমি একটু চাপা স্বভাব আর পরিবেশ খুব অস্বস্তিজনক হওয়ায় তার কাছ থেকে কিছুই উদ্ধার করতে পারলাম না। তাই প্রথম দিন শেষে দেখা হওয়া সত্ত্বেও আতিকের ব্যাপারে আমার জ্ঞান ঘটকের দেয়া বায়োডাটা পর্যন্তই রয়ে গেল, যদিও ওর আমার সম্পর্কে জ্ঞান অনেক বাড়ল। বাসায় এসে চাপ যে, মাস্টার্সের রেজাল্ট দিয়ে দিয়েছে এখনই বিয়ে করতে হবে, তাই দেরি না করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাসার সবাই এ বিয়েতে একমত যেন এক বোঝা থেকে মুক্তি। বাবার তাই এক কথা, এত বোঝাবুঝির কিছু নেই বিয়ে কর। মনে হল জুয়া খেলছি জীবন নিয়ে। পরিবেশের চাপে পড়ে রাজি হলাম। পরে জানলাম সিগারেট, নেশা, আগে ক্লাসমেটের সাথে প্রেমের সম্পর্ক এসব নানা তথ্য। যার কিছুই বিয়ের আগে আমার জানা ছিল না। ঘটক বলেছিল এসব কোন সমস্যাই নেই, যার সবই মিথ্যা। মানুষকে সরল মনে বিশ্বাস করে ভুল করেছিলাম। তাই সেই ভুলকে সাজা হিসেবে মেনে নিয়েই জীবন চালিয়ে যাচ্ছি।

তাই পারিবারিকভাবে আয়োজিত বিয়ের ক্ষেত্রে এক পরিবারের অন্য পরিবার সম্পর্কে কিছু হলেও জানা থাকলে ভাল। নইলে নিজেদের খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করতে হবে, শুধু বাণিজ্যিক কোন সংগঠনকে বিশ্বাস করা উচিত না। যেহেতু একজন মেয়েকে তার সারাজীবন কাটাতে হবে তাই তাকে বিয়ের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নেবার এবং নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেবার স্বাধীনতা দিতে হবে। এক্ষেত্রে পারিবারিকভাবে কোনরূপ প্রভাবিত করার চেষ্টা করা উচিত নয়। কেননা প্রত্যেকের জীবন প্রত্যেকের। অনেক সময় নিজের পছন্দসই ছেলে বা মেয়েকে পাবার জন্য নিজেকে অপরের কাছে পরিবর্তিত করে পরিবেশন করে থাকে বা পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারে একে অপরকে ভুল তথ্য দিয়ে থাকে। যা পরস্পরের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করে। নিজে যেরকম সে রূপকে অপরের সামনে তুলে ধরতে হবে, কেননা এক সময় না এক সময় সত্য প্রকাশ পাবেই। যা সম্পর্ক ভাঙ্গা গড়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

পারিবারিকভাবে আয়োজিত বিয়ের ক্ষেত্রে নতুন বাসা, নতুন পরিবারের সাথে খাপ খাওয়ানোর পাশাপাশি সম্পূর্ণ অচেনা নতুন একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে মেনে নিতে হয়। বছরের পর বছর বাবা- মায়ের সাথে থেকে যে স্বভাব গড়ে উঠেছে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে রাতারাতি তা বদলানো সম্ভব নয়। আবার দুটি পরিবার কখনই এক হতে পারে না। তাই বাবার বাড়ির মত শ্বশুরবাড়িও একইরকম হবে, সব মিলে যাবে এমন কল্পনাও করা অর্থহীন। বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাই বুঝে চিন্তা করে নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার মন-মানসিকতা তৈরি করে নিতে হবে। জীবনসঙ্গী নির্ধারণে শুধু সে নয় তার পরিবারকেও বুঝতে হবে। কেননা বিয়ের পর শুধু তাকে নয় তার পরিবারকেও আপন করে নিতে হবে। মেয়েটির অবস্থা বিবেচনা করে শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকেও এক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

লিখেছেনঃ সামিহা সুলতানা অনন্যা
সুত্রঃ ইত্তেফাক 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।