ভালোবাসা, সম্পর্ক ও বিশ্বাস

যে কোন ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি অতিরিক্ত স্নেহ প্রায় সময় খুবই আনন্দদায়ক হতে পারে।  এমন কি কোন কাজ কিংবা খাদ্যের প্রতিও।  আর এই অতি আনন্দদায়ক অনুভূতিই হলো ভালবাসা। পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর সম্পর্ক হচ্ছে ভালবাসার সম্পর্ক। ভালবাসার কাঁধে ভর করেই দাঁড়িয়ে থাকে একেকটি সম্পর্ক। আর তাতে আস্তর হিসেবে প্রলেপ পরে বিশ্বাসের আর অনুভূতির। এভাবেই জুড়ে থাকে ভালবাসা জগত-সংসারে। ভালবাসা, যা কখনও লুকিয়ে রাখা যায় না। যদিও সময় ও পরিবেশের ক্ষেত্রে এর প্রকাশভঙ্গি একরকম হয় না। এটি হলো একটি মানবিক অনুভূতি এবং আবেগকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতা। বিশেষ কোন মানুষের জন্য স্নেহের শক্তিশালী বহির্প্রকাশ। খুবই আশ্চর্য লাগে যখন দেখা যায় এই ভালবাসার জন্য কেউ তার পরিবার পরিজন ত্যাগ করে, বন্ধুদের ত্যাগ করে। ভালবাসার শক্তি আসলে অপরিসীম।  তা না হলে সবচেয়ে কাছের মানুষদের কিভাবে ত্যাগ করা যায়!

বর্তমানে এটি এখন খুব বেশি মাত্রায় লক্ষণীয় যে ভালবাসার গভীরতা আজ আর আগের মতো নেই।  যেটুকু ভালবাসা দেখা যায় তাও নিজের স্বার্থের জন্য।  বয়ফ্রেন্ড কিংবা গার্লফ্রেন্ড থাকা আজ একটা স্ট্যাটাস।  ফলস্বরূপ ভালবেসে বিয়ে করে অতি দ্রুত বিচ্ছেদ হওয়া যেন অতি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ব্যাপার হয়ে গিয়েছে। ঠিক কোথায় যেন আমরা সবাই ধীরে ধীরে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছি।  যেখানে আমাদের ভালবাসা, বিশ্বাস, আস্থা সব হারিয়ে যাচ্ছে।  তাই তো ইংরেজ সাহিত্যিক উইলিয়াম শেকসপিয়ার যথার্থই বলেছিলেন, ‘সবাইকে ভালবাস, বিশ্বাস করো অল্প কয়েকজনকে।’

আজ কালকার প্রেমে পড়ার কাহিনী শুনলে দেখে যায় তারা কখনও মনের বিবেচনায় একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয়নি। তাদের প্রেমে পড়ার ইতিহাস থেকে দেখা যায় কেউ কোন অনুষ্ঠানে গিয়েছে সেখানে প্রথম দেখাতেই প্রেম। কিংবা একই সঙ্গে লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করে সেই থেকেই প্রেম। কিংবা অপরিচিত মোবাইল থেকে মেসেজ/ভয়েস শুনে প্রেম। কিংবা সামান্য আকর্ষণ থেকে জন্ম নেয় ভালবাসা যা সত্যিকার অর্থে দীর্ঘস্থায়ী নয়।  সত্যিকারের ভালবাসা আসলে এভাবে গড়ে ওঠে না।  সে তো অনেক সাধনা ও ত্যাগের ফল। আর এখন এ ত্যাগ ও সাধনা স্থানে স্থান করে নিয়েছে অনেকের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে। এমনকি নির্মম বর্বরতার খবরও শোনা গিয়েছে।  স্বার্থসিদ্ধির চরম অভিব্যক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে এটি। যার ফলে টিকে থাকছে না কোন সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরে। সম্পর্ক তৈরি করা যত না সহজ, সেটি রক্ষা করা তারচেয়ে অনেক বেশি কঠিন। ছোট একটি ভুলই একটি সম্পর্ক শেষ করে দেয়। আর সম্পর্কের এ টানাপোড়েনে দু’পক্ষই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর সেটি মূলত মানসিক দিক দিয়ে।

ভালবাসার মূল ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস।  কারণ সত্যিকারের ভালবাসায় বিশ্বাসের কোন কমতি থাকে না।  প্রেমে পড়া কিংবা প্রেম করা যতটা সহজ, প্রেমের সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখা কিংবা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ততটা সহজ নয়।  শুধু আবেগ নয়, প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, দায়িত্ববোধ ও বিশ্বাস।  যখন একজন ভেবে নেন যে তার সঙ্গী ঠিক তার মতো করে ভাবছেন, তবে সম্পর্ক হয় দীর্ঘস্থায়ী।  আর উল্টোটা হলেই তৈরি হতে থাকে অভিমানের পাহাড়।  কিন্তু দিনের পরে দিন এ রকম চলতে থাকলে, কয়েকদিন বাদে দেখা যায় যে, সম্পর্কের মধ্যে চলে আসে দূরত্ব।  আর এই দূরত্ব থেকেই সৃষ্টি হয় সম্পর্কে ভাঙ্গন।

তাই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন শ্রদ্ধাবোধ এবং মতামতের গুরুত্ব দেয়া ও পছন্দ-অপছন্দের খোঁজখবর রাখা। এগুলো সম্পর্ককে আরও বেশি গভীর করে তোলে। তাই ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে যতটা সম্ভব ভাল ব্যবহার করাই শ্রেয়। এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে এগুলো যেন কৃত্রিম না হয়। সবকিছুর উৎসস্থল যেন হয় আন্তরিকতা। মনে রাখতে হবে, আদর্শিক দিকে মিল থাকলে ভালবাসার মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হয়, একে অন্যের মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়। একটা সুনির্দিষ্ট ধারণা প্রতিষ্ঠিত করলে দু’জনের আপ্রাণ চেষ্টা ভালবাসার গভীরতা আরও বাড়িয়ে দেয়। একটি সম্পর্ক চারা গাছের মতো।  সেই গাছকে যেমন যত করে বড় করে তুলতে হয়, ঠিক তেমনি সম্পর্কের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একটু যত, বিশ্বাস এবং অনেকখানি ভালবাসার প্রয়োজন হয়।

ভালবাসাহীন পৃথিবীতে কেউই চায় না বাঁচতে।  সবাই চায় একটুখানি ভালবাসা যেখানে আস্থা, আবেগ, আর বিশ্বাস নতুন করে প্রাণে জোয়ার যোগাবে। জীবনে দুঃখ আসবে, দুর্দশা আসবে, বাধা আসবে, বিপত্তি আসবে কিন্তু তাতে কি! ভালবাসার শক্তি সব বাধা ভেঙ্গে দেবে।  শেখাবে নতুন করে বাঁচতে। তাই আমাদের উচিত সঙ্কীর্ণ ভালবাসাকে আকাশের মতো উদার করে কার্পণ্যতাকে দূর করা। বিখ্যাত লেখক ডেল কার্নেগী লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীতে ভালবাসার একটি মাত্র উপায় আছে… সে হলো প্রতিদানের আশা না করে ভালবেসে যাওয়া।’ আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আদর্শিক মনোভাব এবং সৎ চিন্তা করা।