নারীরা কেন পরকীয়ায় আসক্ত হয়, জৈবিক ব্যাখ্যা কি ?

প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।  কিন্তু উত্তর এত সোজাসাপ্টা নয়। ভাবছি এ নিয়ে কিছু আলোচনা করার চেষ্টা করলে মন্দ হয় না, কী বলেন! আসলে নারী পুরুষ উভয়ের মধ্যেই যেমন একগামিতা দৃশ্যমান, তেমনি দৃশ্যমান বহুগামিতাও। নারী পুরুষ উভয়ের মধ্যেই লংটার্ম বা দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক করার মনোবাসনা যেমন আছে, তেমনি সুযোগ এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় উঠে আসে শর্টটার্ম বা স্বল্পমেয়াদী সম্পর্কের মনোবাঞ্ছাও।  পুরুষের মধ্যে বহুগামিতা বেশি, কারণ অতীতের শিকারী-সংগ্রাহক সমাজে শক্তিশালী এবং প্রতিপত্তিশালী পুরুষেরা যেভাবে নারীর দখল নিত, সেটার পর্যাক্রমিক ছাপ এখনো ক্ষমতাশালী পুরুষদের মধ্যে লক্ষ্য করলে পাওয়া যায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে নারীরা পরকীয়া করে না, কিংবা তাদের মধ্যে বহুগামিতা নেই।

প্রভাবশালী কিংবা ক্ষমতাশালী পুরুষেরা যেমন পরকীয়া করতে উন্মুখ থাকে, তেমনি, ক্ষমতাশালী কিংবা প্রভাবশালী পুরুষের স্ট্যাটাস আবার নারীর কাছে পছন্দনীয়। কোন নারীর বর্তমান সঙ্গির চেয়ে যদি তার প্রেমিকের পদমর্যাদা বা স্ট্যাটাস ভাল হয়, কিংবা প্রেমিক দেখতে শুনতে অধিকতর সুদর্শন হয়, কিংবা যে সমস্যাগুলো নিয়ে একটি নারী তার পার্টনার কিংবা স্বামীর সাথে অসুন্তুষ্ট, সেগুলোর সমাধান যদি তার প্রেমিকের মধ্যে খুঁজে পায়, নারী পরকীয়া করে। তাই আমেরিকায় আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার, নিউট গিংরিচ, বিল ক্লিন্টন কিংবা বাংলাদেশে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কিংবা হুমায়ূন আহমেদ যখন পরকীয়া করতে চেয়েছে, তারা সেটা করতে পেরেছে, কারণ নারীরাও তাদের মত  যশস্বী কিংবা ‘হাই স্ট্যাটাসের’ কেউকেটাদের সাথে সম্পর্ক করতে প্রলুব্ধ হয়েছে। নারীর আগ্রহ, অনুগ্রহ কিংবা চাহিদা ছাড়া পুরুষের পক্ষে পরকীয়া করা সম্ভব নয়, এটা বলাই বাহুল্য। তাই বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের চোখে নারীর একগামিতার ব্যাপারটি এক ধরণের ‘মিথ’ বই কিছু নয়, আগেই বলেছি লং টার্ম এবং শর্ট টার্ম স্ট্র্যাটিজি নারী পুরুষ সবার মধ্যেই আছে। বহু কারণেই এটি নারী পরকীয়া করতে পারে, আগ্রহী হতে পারে বহুগামিতায়।  নারীর পরকীয়ার এবং বহুগামিতার ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অনুকল্প বা হাইপোথিসিস প্রস্তাব করেছেন বিজ্ঞানীরা, এর মধ্যে রয়েছে –রিসোর্স হাইপোথিসিস, জেনেটিক হাইপোথিসিস, মেট সুইচিং হাইপোথিসিস, মেট স্কিল একুজেশন হাইপোথিসিস, মেট ম্যানুপুলেশন হাইপথিসিস ইত্যাদি[1]।  দু একটি বিষয় এখানে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

জৈবিক কারণেই অসতর্ক কিংবা অপরিকল্পিত যৌনসম্পর্কের ক্ষেত্রে (casual sex) নারীরা পুরুষদের মত প্রজননগত উপযোগিতা পায় না । তারপরেও নারীরা পরকীয়া করে, কিংবা হতে পারে বহুগামী,  কারণ  নারীদের ক্ষেত্রে বহুগামিতার একটি অন্যতম উপযোগিতা হতে পারে, সম্পদের  তাৎক্ষনিক যোগান।  শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, খাদ্যের বিনিময়ে তারা পুরুষ শিম্পাঞ্জিকে যৌনতা প্রদান করে থাকে। গবেষকেরা লক্ষ্য করেছেন, নারী শিম্পাঞ্জিরা সেই সব পুরুষ শিম্পাঞ্জিদের প্রতিই যৌনতার ব্যাপারে থাকে সর্বাধিক উদার যারা খাদ্য যোগানের ব্যাপারে কোন কৃপণতা করে না। শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রে কোন কিছু সত্য হলে মানব সমাজেও সেটা সত্য হবে, এমন কোন কথা নেই অবশ্য। কিন্তু তারপরেও বিজ্ঞানীরা আমাজনের মেহিনাকু (Mehinaku) কিংবা ট্রোব্রিয়াণ্ড দ্বীপপুঞ্জের (Trobriand Island) ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠিদের মধ্যে গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, সেখানেও পুরুষেরা নারীদের জন্য  (অনেকটা শিম্পাঞ্জিদের সমাজের মতোই) রকমারী খাদ্য, তামাক, বাদাম, শঙ্খের মালা, বাহুবন্ধনী প্রভৃতি উপঢৌকন সংগ্রহ করে নিয়ে আসে, আর বিনিময়ে নারীরা যৌনতার অধিকার বিনিময় করে। যদি কারো কাছ থেকে উপঢৌকনের যোগান বন্ধ হয়ে যায়, তবে নারীরাও সে সমস্ত পুরুষের সাথে যৌনসম্পর্ক বন্ধ করে দেয়[2]।  সম্পদের যোগানের সাথে যে নারীর যৌনতা প্রদানের একটা অলিখিত সম্পর্ক আছে, তা জানার জন্য অবশ্য আদিম সমাজে যাওয়ার দরকার নেই। আধুনিক সমাজেও সেটা লক্ষ্য করলে পাওয়া যাবে।

সবচেয়ে চরম উদাহরণটির কথা আমরা সবাই জানি -পতিতাবৃত্তি। নারী যৌনকর্মীরা অর্থসম্পদের বিনিময়ে যৌনতার সুযোগ করে দেয় পুরুষদের – এটা সব সমাজেই বাস্তবতা।  এই বাস্তবতা থেকে পুরুষদের বহুগামী চরিত্রটি যেমন স্পষ্ট হয়, তেমনি হয় আর্থিক লাভের জন্য নারীর যৌনতা বিক্রির সম্পর্কটিও[3]।  যৌনকর্মী শুধু নয়, আমেরিকায় সাধারণ মেয়েদের মধ্যে গবেষণা করেও দেখা গেছে, যে সমস্ত নারীরা  শর্ট টার্ম বা স্বল্পমেয়াদী সম্পর্কে জড়াতে ইচ্ছুক, তারা আশা করে যে, তার প্রেমিক অর্থ কড়ির দিক থেকে কোন কৃপণতা দেখাবে না, অনেক ধরণের দামী উপহার সামগ্রী  উপঢৌকন হিসেবে নিয়ে আসবে,   বিলাসবহুল  জীবন যাত্রায় অভ্যস্থ হবে, নিয়মিতভাবে ভাল ভাল রেস্টুরেন্টে তাকে আপ্যায়ন করবে, এবং সর্বোপরি যে কোন ধরণের সম্পদের বিনিয়োগে থাকবে উদার[4]। কৃপণ স্বামীকে যাও বা মেয়েরা কিছুটা হলেও সহ্য করে, অ্যাফেয়ার বা পরকীয়ায় আগ্রহী কৃপণ  যৌনসঙ্গিকে কখনোই নয়। অ্যাফেয়ার বা পরকীয়ার ক্ষেত্রে ছেলেদের কৃপণতা মেয়েদের কাছে গ্রহণীয় কিংবা পছন্দনীয় নয়, কারণ তারা সঙ্কেত পেতে শুরু করে যে, তার সঙ্গিটি হয়তো ভবিষ্যতেও তার জন্য সম্পদ বিনিয়োগে সে রকমভাবে আগ্রহী নয়। এই মানসিক অভিরুচিগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সম্পদের তাৎক্ষণিক আহরণ  নারীদের ক্ষেত্রে এক ধরণের অভিযোজন জনিত উপযোগিতা  দিয়েছে, যা নারীরা অনেক সময় পরকীয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে চায়।

নারীদের পরকীয়ার ব্যাপারে আরো একটি লক্ষ্যনীয় প্যাটার্ন পাওয়া গিয়েছে, যেটা পুরুষদের থেকে কিছুটা আলাদা। বহুক্ষেত্রেই দেখা গেছে, নতুন সঙ্গির সাথে অপরিকল্পিত যৌনসম্পর্কের (casual sex) মাধ্যমে নারীরা  সঙ্গিটিকে ভবিষ্যৎ স্বামী হিসেবে মূল্যায়ন করে নিতে চায়।  সে জন্যই এমনকি স্বল্পমেয়াদি সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বহুগামী, বোহেমিয়ান  ধরণের ছেলের সাথে সম্পর্ক করতে নারীরা প্রাথমিকভাবে অনিচ্ছুক থাকে;  অতীতে যদি পুরুষটির বহু নারীর সাথে সম্পর্ক কিংবা আসক্তি থেকে থাকে, তা নারীটির কাছে  তা এক ধরণের অনাকাংক্ষিত সংকেত নিয়ে উপস্থিত হয়।  এর কারণ, স্বল্পমেয়াদী সম্পর্কে জড়ালেও তার অবচেতন মনে থাকে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের আকাংক্ষা, যার নিরিখেই সে  সাধারণতঃ উপরোক্ত বৈশিষ্টগুলো বিচার করে থাকে।  তার সঙ্গির বহুগামিতা কিংবা অতীতে বহু নারীর প্রতি আসক্তির  অর্থ  তার চোখে হয়ে উঠে তার সাথে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক রচনার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততার নিয়ামক।  অর্থাৎ, সে ধরে নেয় এ ধরণের পুরুষেরা ‘ভবিষ্যৎ স্বামী’ হিসেবে উপযুক্ত নয়।  মোটা দাগে, ভবিষ্যৎ স্বামীর মধ্যে যে গুণাবলীগুলো  প্রত্যাশা করে, ঠিক সেগুলোই একটি নারী তার যৌনসঙ্গির মধ্যে খুঁজতে চায়[5]।  দুটি ক্ষেত্রেই মেয়েরা চায় তার পুরুষ সঙ্গি হবে দয়ালু, রোমান্টিক, সমঝদার, দুর্দান্ত, স্বাস্থ্যবান, রসিক, বিশ্বস্ত এবং সম্পদের বিনয়গের ব্যাপারে থাকবে উদার। সেজন্যই বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী ডেভিড বাস তার ‘বাসনার বিবর্তন’ (The Evolution Of Desire) বইয়ে বলেন[6],

উভয় ক্ষেত্রেই মেয়েদের অভিরুচির এই অপরিবর্তনীয়তা ইঙ্গিত করে যে, নারীরা অনিয়মিত যৌনসঙ্গিকে হবু স্বামী হিসবেই দেখে এবং সেজন্য দুইক্ষেত্রেই বেশি পদপর্যাদা আরোপ করে।

বহু সমাজে আবার দেখা গেছে, যে সমস্ত সমাজে সহিংসতা খুব বেশি, নারীরা বিবাহ-বহির্ভূত যৌনসম্পর্ক করে নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারটা চিন্তা করে। স্বামীর বাইরে গোত্রের অন্য  কোন পুরুষের সাথে যদি নারীর কোন ‘বিশেষ বন্ধুত্ব’ গড়ে উঠে তবে সে স্বামী বাইরে থাকলে বা অন্য কোন সময়ে বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করতে পারবে।  এ ব্যাপারটা সাধারণভাবে প্রানীজগতের মধ্যে প্রচলিত আছে। যেমন, সাভানা বেবুনদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে  বারবারা স্মুটস সহ অন্যান্য বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে,  এই ধরনের বেবুনদের সমাজে একটি নারী বেবুনের সাথে প্রাথমিক বা মূল সঙ্গির বাইরেও একজন বা দু’জন  সঙ্গির সাথে ‘বিশেষ ধরনের’ সম্পর্ক গড়ে উঠে, এবং সেই সঙ্গি বা সঙ্গিরা অন্য বেবুনদের উত্যক্ত করার হাত থেকে নারী বেবুনটিকে রক্ষা করে[7]।  ‘পর-পুরুষের’ সাথে যৌনতার বিনিময়ে মূলতঃ জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নারী বেবুনটি। এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞানী রবার্ট স্মিথ তার একটি গবেষণাপত্রে বলেন[8] –

‘প্রাথমিক সঙ্গিটি সবসময় নারী বেবুন কিংবা তার সন্তানের পাশে থেকে থেকে তাকে রক্ষা করতে পারে না। তার অনুপস্থিতিতে অন্য কোন পুরুষের সাথে নারীটির ‘বিশেষ কোন সম্পর্ক’ থাকলে তা তার বেঁচে থাকায় বাড়তি উপযোগিতা নিয়ে আসে। এভাবে নারীটি অন্য কোন পুরুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে নিজের এবং নিজের সঙ্গির জিন রক্ষা করার ক্ষেত্রে এক ধরণের স্ট্র্যাটিজি তৈরি করে’।

এ ধরণের স্ট্র্যাটিজি মানব সমাজে বর্তমানে খুব বেশি দৃশ্যমান না হলেও বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আদিম শিকারী সংগ্রাহক কিছু সমাজে যেখানে নারীদের উপর পুরুষালী সহিংসতা, আগ্রাসন, ধর্ষণ খুবই বেশি, সেখানে নারীরা এ ধরণের ‘অতিরিক্ত যুগল বন্ধনের’ মাধ্যমে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে[9]।

সঙ্গি রদবদল বা ‘মেট সুইচিং’ও হতে পারে আরেকটি বড় কারণ যার কারণে একটি নারী পরকীয়া করতে পারে।  স্পটেড স্যাণ্ড পাইপার (বৈজ্ঞানিক নাম Actitis macularia) নামে আমেরিকার মিনেসোটার হ্রদে দৃশ্যমান এক ধরণের পাখিদের মধ্যে সঙ্গি রদবদলের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যমাত্রায় পাওয়া গিয়েছে। জীববিজ্ঞানী মার্ক কলওয়েল এবং লিউস ওরিং প্রায় চার হাজার ঘন্টা ধরে এই পাখিদের জীবনাচরণ পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, এ ধরণের পাখিদের মধ্যে সঙ্গি রদবদল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা[10]। সঙ্গি রদবদলের মাধ্যমে বর্তমান সঙ্গির চেয়ে আরো আকর্ষণীয় সঙ্গিকে খুঁজে নেয় একটি নারী স্পটেড স্যাণ্ড পাইপার।  মানব সমাজেও কিন্তু এ ব্যাপারটি লক্ষ্য করলে খুঁজে পাওয়া যাবে।  বর্তমান সঙ্গির চেয়ে অন্য কাউকে অধিকতর আকর্ষণীয়, সুদর্শন কিংবা কাংক্ষিত মনে হলে, কিংবা বর্তমান সঙ্গির স্ট্যাটাসের চেয়ে উঁচু সামাজিক পদমর্যাদাসম্পন্ন  কেউ তার সাথে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠলে নারী তার সাথেও পরকীয়ায় জড়াতে করতে পারে। পরকীয়া  করতে পারে যদি নারীর বর্তমান সঙ্গি যদি অসুস্থ হয়, পঙ্গু হয়, শারীরিক ভাবে অক্ষম হয়, যুদ্ধাহত হয় কিংবা মুমুর্ষু হয়।

বাংলাদেশে বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকের চাঞ্চল্যকর মুনীর-খুকুর পরকীয়া আর তাকে কেন্দ্র করে শহীদ সাংবাদিক কন্যা রীমা হত্যাকাণ্ডের কথা নিশ্চয় অনেকেরই মনে আছে। মধ্যবয়সী খুকু পরকীয়া প্রেম শুরু করেছিলেন ডঃ মেহেরুন্নেসার পুত্র মুনীরের সাথে।  খুকুর স্বামী ছিলেন পক্ষাঘাতগ্রস্থ এবং অসুস্থ।  স্বামীর এ শারীরিক পরিস্থিতি খুকুকে চালিত করেছিলো মুনীরের সাথে পরকীয়ায় জড়াতে, আর প্ররোচিত করেছিলো মুনীরকে রীমা হত্যায়। কাজেই নারী শুধু পরকীয়া করে না, প্রয়োজনে পরকীয়ার কারণে হত্যায়  প্ররোচনা দেওয়া শুধু নয়, নিজ হাতে হত্যা পর্যন্ত করতে পারে।  কিছুদিন আগে  পরকীয়ার কারণে আয়শা হুমায়রা কীভাবে তার নিজের সন্তান সামিউলকে নির্দয়ভাবে হত্যা  করে লাশ ফ্রিজবন্দি করে পর বাইরে ফেলে দিয়েছিলো, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিনের পর দিন ধরে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।  পরকীয়ার কারণে মায়ের নিজ সন্তান হত্যা হয়ত খুব চরম এবং ব্যতিক্রমী উদাহরণ, কিন্তু আকর্ষনীয় সঙ্গির জন্য বর্তমান সঙ্গিকে ত্যাগ, কিংবা স্বামীর তুলনায় আরো ‘উৎকৃষ্ট’ কারো সাথে লুকিয়ে ছাপিয়ে পরকীয়া তা নয়। এ ব্যাপারটা সব সময়ই এবং সব সমাজেই ছিল। পয়সাওয়ালা কিংবা সুদর্শন, স্বাস্থ্যবান, আকর্ষনীয়, মনোহর কিংবা উঁচু পদমর্যাদাসম্পন্ন  সঙ্গির জন্য পুরাতন সঙ্গিকে ত্যাগ মেয়েদের মধ্যে এক সময় একধরনের অভিযোজনগত উপযোগিতা দিয়েছিলো, অন্ততঃ হেলেন ফিশারের মত নৃতত্ত্ববিদেরা তাই মনে করেন[11]।  সেই আদিম শিকারী সংগ্রাহক সমাজের কথা চিন্তা করুন, যেখানে একটি নারীকে ‘বিয়ে করতে’ হয়েছিলো এক দুর্বল শিকারীকে যার চোখের দৃষ্টি ছিল ক্ষীণ, শিকারে অযোগ্য এবং  স্বভাবে কাপুরুষ। এ ধরনের সম্পর্কে থাকা নারীরা মানসিক অতৃপ্তি মেটাতে হয়তো পরকীয়া শুরু করেছিলো সুস্থ সবল, স্বাস্থ্যবান তরুণ কোন সাহসী শিকারীর সাথে –  ‘মিস্টার গুড জিন’ পাবার এবং ভবিষ্যত সন্তানের মধ্যে তা রেখে যাবার প্রত্যাশায়।  ভাল জিনের জন্য সঙ্গিবদলের ব্যপারটি যদি আদিম শিকারী সংগ্রাহক পরিস্থিতিতে নারীদের একধরণের স্ট্র্যাটিজি হয়ে থাকে, তবে সেটি এখনকার সময়েরও বাস্তবতা হতে পারে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।  র‍্যান্ডি থর্নহিলের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে এই ‘গুড জিন’ অনুকল্পের সত্যতা পাওয়া গিয়েছে[12]। গবেষণায় দেখা গেছে নারীরা যখন পরকীয়া করে তখন  প্রতিসম চেহারার প্রতি আকর্ষিত হয় বেশি[13]।  প্রতিসম চেহারা সবসময়ই একটি ভাল ‘ফিটনেস মার্কার’ হিসেবে বিবেচিত।  প্রেমিকের চেহারা প্রতিসম হওয়া মানে – তার প্রেমিকের চেহারা আকর্ষনীয়, তার শারীরের গঠন উন্নত, সে পুরুষালী, বুদ্ধিদীপ্ত, চৌকষ, স্বাস্থ্যবান এবং রোগজীবাণু থেকে মুক্ত[14]।  তাই যে নারী স্বামীকে রেখে প্রতিসম বৈশিষ্ট্যের প্রেমিকের পেছনে ছুটছে, তার ‘প্রস্তর যুগের মস্তিস্ক’  আসলে প্রকারান্তরে ‘ভাল জিন’ নিজ সন্তানের জন্য নিশ্চিত করে রাখতে চাইছে।

ভাল জিনের জন্য প্রলুব্ধ হয়ে পরকীয়া করার এই জেনেটিক হাইপোথিসেরই আরেকটি প্রচলিত রূপ হচ্ছে ‘জোশিলা পোলা’ বা ‘সেক্সি সন’ অনুকল্প। এই অনুকল্পটি ১৯৭৯ সালে প্রস্তাব করেছিলেন কুইন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী প্যাট্রিক ওয়েদারহেড এবং রালি রবার্টসন। এই অনুকল্প অনুযায়ী মনে করা হয় যে, সুদর্শন পুরুষের সাথে নারী পরকীয়া করে কিংবা স্বল্পমেয়াদী যৌনসম্পর্ক স্থাপন করে কারণ, অবচেতন মনেই তার মাথায় থাকে যে,  তার সন্তানও হয়ে উঠবে ঠিক একই রকম মনোহারী  গুণাবলীর অধিকারী।  পরবর্তী প্রজন্মের নারীরা তার সন্তানের এই প্রীতিকর বৈশিষ্টগুলো দিয়ে অনেক বেশি পরিমাণে আকৃষ্ট হবে, ফলে যাদের মধ্যে এই গুণাবলীগুলোর অভাব রয়েছে তাদের তুলনায় তার সন্তান অনেক বেশি প্রজননগত সফলতা অর্জন করতে পারবে।  বেশ কিছু সাম্প্রতিক জরিপে এই তত্ত্বের স্বপক্ষে কিছুটা হলেও সত্যতা মিলেছে। দেখা গেছে, নারীরা যখন পরকীয়ায় আসক্ত হয় তখন তাদের একটা বড় চাহিদা থাকে স্বামীর চেহারার চেয়ে প্রেমিকের চেহারা অনেক বেশি আকর্ষনীয় হতে হবে[15]।

শুধু ভাল জিন, ভাল চেহারা বা ভাল সন্তানের জন্যই নয়, নারীরা আরো বহু কারণেই পরকীয়া করতে পারে। সামাজিক স্ট্যাটাস তার মধ্যে একটি। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন বিবাহিত নারী যখন অন্য কোন পুরুষের সাথে পরকীয়া করে, সেই পুরুষের স্ট্যাটাস, প্রতিপত্তি, সামাজিক অবস্থান প্রভৃতি তার বর্তমান স্বামীর চেয়ে অনেক বেশি থাকে [16]। প্রখ্যাত ব্যবসায়ী এবং ২০১২ সালের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী (পরে নির্বাচনী ক্যাম্পেইন থেকে সরে দাঁড়ানো ) ডোনাল্ড ট্রাম্প  বছর খানেক আগে এক অপরিচিত মডেল মার্থা মেপেলের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লে  রাতারাতি মার্থা মেপল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। মিডিয়ার পাবলিসিটি তো ছিলোই, সাথে সাথে নানা ধরণের আর্থিক বিনিয়োগ, গনমান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রবেশের অধিকার সহ বিভিন্ন পদমর্যাদা ভোগ করতে থাকেন।  বাংলাদেশেও এরশাদ সাহেব যখন রাস্ট্রপতি থাকাকালীন সময়ে জিনাত মোশারফ সহ বহু নারীর সাথে পকীয়ায় মত্ত ছিলেন, তখন সে সমস্ত নারীরাও রাতারাতি বহু রাজনৈতিক এবং সামাজিক সুযোগ সুবিধা পেয়ে গিয়েছিলেন। এ সমস্ত নারীরা এমন সব মহলে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কিংবা সভায় প্রবেশ করে যেতেন অবলীয়ায়, যেগুলোতে সাধারণ মানুষদের জন্য প্রবেশ ছিলো অকল্পনীয়।  প্রেমের অর্থনীতির বাজারে কোন কেউকেটা বা বিখ্যাত লোক যখন কোন পরিচিত নারীর সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়ায়, তখন সে যত অখ্যাতই আগে থাকুক না কেন, মানুষ ভেবে নেয় নারীটি নিশ্চয় ‘স্পেশাল’। সে রাতারাতি চলে আসে আলোচনা আর ক্ষমতার কেন্দ্রে। নারীটি পায় নতুন পরিচিতি, আর সামাজিক এবং বন্ধুমহলে ঘটে তার ‘স্ট্যাটাসের উত্তোরণ’।

যে কারণেই নারী পরকীয়া করুক না কেন, প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ সারা ব্ল্যাফার হার্ডি  মনে করেন যে, নারী-পরকীয়ার ব্যাপারটা মানবেতিহাসের সূচনা থেকেই এমনভাবে জড়িত ছিলো যে, সেটাকে অস্বীকার করা বোকামিই[17]।  অন্য প্রানীর ক্ষেত্রে যেমন, শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রে আমরা জানি সেখানে নারীরা বহুগামী। হার্ডি তার গবেষণাপত্রে শিম্পাঞ্জিদের উদাহরণ হাজির করে দেখিয়েছেন যে, বহুগামিতার মাধ্যমে নারী শিম্পাজিরা ডারউইনীয় দৃষ্টিকোন থেকে দুটি উদ্দেশ্য পূরণ করে -এক, অন্য পুরুষের সাথে সম্পর্কের মাধ্যমে তারা নিশ্চিত করে সদ্যজাত সন্তানকে কেউ ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে হত্যা করবে না, আর দুই – সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে গোত্রে এক ধরণের ‘ধোঁয়াশা’  তৈরি করা; যার ফলে সকল পুরুষ শিম্পাঞ্জিই নিজেকে তার অনাগত সন্তানের পিতা ভেবে নারী এবং শিশুটিকে রক্ষা করে চলতে চেষ্টা করবে।

হার্ডি মনে করেন শিম্পাঞ্জির জন্য যে ব্যাপারটি সত্য, মানুষের বিবর্তনীয় পথ পরিক্রমাতেও সে ব্যাপারটা কিছুটা হলেও প্রায় একই রকমভাবে সত্য হতে পারে।  পুরুষের অপেক্ষাকৃত বড় শুক্রাশয় এটাই ইঙ্গিত করে যে, বিবর্তনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নারীরা একগামী নয়,  বরং বহুগামীই ছিল।  একই প্রবন্ধে নারী বহুগামিতার আরো একটিও বড় সাক্ষ্য আমরা পেয়েছি পুরুষের পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগ কীলকাকৃতি হওয়ার এবং সঙ্গমকালীন সময়ে উপর্যুপরী লিঙ্গাঘাতের মধ্যেও। সঙ্গির যদি একই সময়ে আর কারো সাথে সঙ্গমের সম্ভাবনা না থাকতো তবে এগুলো একটি পুরুষের পুরুষাঙ্গের বৈশিষ্ট্য হিসেবে শরীরে জায়গা করে নিতো না। বহু মানুষের শুক্রানুর প্রতিযোগিতায় সঙ্গির গর্ভে নিজের সন্তানের পিতৃত্ব নিশ্চিত করতেই এই শারীরিক বৈশিষ্ট্য আর প্রক্রিয়াগুলো পুরুষের দেহে তৈরি হয়েছে।  সেখানে আমরা আরো দেখেছিলাম যে, দম্পতিদের দীর্ঘদিন আলাদা করে রেখে তারপর সঙ্গমের সুযোগ করে দিলে পুরুষের বীর্য প্রক্ষেপণের হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘদিন পৃথক থাকাকালীন সময়ে স্ত্রীর পরকীয়ার সম্ভাবনার থেকে যাবার কারণেই এ ব্যাপারটা ঘটে বলে মনে করা হয়। শুধু পুরুষের দেহে নয়, পরকীয়ার এবং বহুগামিতার বহু আলামত লুকিয়ে আছে নারীর নিজের দেহেও। অর্গাজম বা চরম পুলক এমনি একটি বৈশিষ্ট্য। রবিন বেকার এবং মার্ক বেলিসের যুগান্তকারী একটি গবেষণা থেকে জানা গেছে যে সমস্ত নারীরা পরকীয়ায় জড়িত থাকে তারা চরম পুলক লাভ করে বেশি এবং তারা  পরকীয়ার সময় তাদের স্বামী বা নিয়মিত সঙ্গির চেয়ে অনেক বেশি শুক্রাণু যোনিতে ধারণ করে রাখে[18]।

এ তো গেল জীববিজ্ঞানের কথা। এর বাইরে ইতিহাস, ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য অনুসন্ধান করলেও আমরা দেখতে পাই মানব সমাজে নারীর কামস্পৃহা কখনোই কম ছিলো না। বরং নারীর কামস্পৃহা বেশি বলেই নারীকে ‘ছিনাল’, ‘মাগি’, ‘খানকি’, ‘বেশ্যা’,  ‘কামুকী’, ‘কামার্ত’, ‘নটিনী’, ‘রাক্ষুসী’  প্রভৃতি নানা শব্দ তৈরি করতে হয়েছে পুরুষতন্ত্রকে, এবং কামুক নারীকে বশীভূত রাখতে তৈরি করেছে নানা ধর্মীয় এবং সামাজিক বিধি নিষেধের দেওয়াল।  হিন্দু পুরাণ এবং সাহিত্যে আমরা দেখেছি কীভাবে সুপুরুষ রামচন্দ্রকে দেখে রাবণের বোন শূপর্ণখা কামার্ত হয়ে পড়েছিল, কিংবা মহাভারতে সুঠামদেহী অর্জুনকে দেখে কামার্ত হয়ে পড়েছিলো নাগ রাজকন্যা উলুপী, তাকে সরাসরি দিয়েছিলো দেহমিলনের প্রস্তাব[19]  –

‘হে পুরুষশ্রেষ্ঠ! আমি তোমাকে অভিষেকার্থ গঙ্গায় অবতীর্ণ দেখিয়া কন্দর্পশরে জর্জরিত হইয়াছি। এক্ষণে তুমি আত্মপ্রদান দ্বারা এই অশরন্য অবলার মনোবাঞ্ছা পরিপূর্ণ কর।’

মহাভারতের বহু নারী চরিত্রই বহুচারিনী এবং বহুগামিনী। পাঁচ স্বামী নিয়ে ঘর করা দ্রৌপদী তো আছেনই, তার পাশাপাশি সত্যকামের মাতা জবালা, পাণ্ডব জননী কুন্তী থেকে শুরু করে স্বর্গের অপ্সরা উর্বসী, রম্ভা সকলেই ছিলেন বহুপুরুষাসক্ত।  কামাসক্ত নারীর উদাহরণ এবং তাদেরকে অবদমনের নানা পদ্ধতি অন্য ধর্মগুলোতেও আছে। ইসলামে হিজাব এবং বোরখার ব্যবহার মুলতঃ কামাসক্ত নারীকে ‘পর্দানশীন’ রাখার জন্যই মনে করা হয়। মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার বহু মুসলিম দেশে আধুনিক যুগেও নারী খৎনা নামের একটি কুৎসিৎ রীতি প্রচলিত আছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নারীর ভগাঙ্গুর কেটে ফেলা হয়, যাতে নারীর কাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে পুরুষেরা।  খ্রীষ্ট ধর্মের প্রাথমিক উৎসগুলো অনুসন্ধান করলেও দেখা যায়, তালমুদিক লেখকেরা স্ত্রীকে কামাসক্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন, আর  সদুপদেশ দিয়ে বলেছেন – আদর্শ স্বামীর কর্তব্য হচ্ছে নিয়মিত সঙ্গমের মাধ্যমে স্ত্রীর কামকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।

ইতিহাস এবং সভ্যতার এই বিশ্লেষণমূলক উদাহরণগুলো থেকে মনে হয়, নারীর কামাসক্তির ব্যাপারটা পুরুষদের জানা ছিলো কিংবা তাদের উদ্বিগ্ন করেছে সবসময়ই।  নৃতাত্তিক সারা ব্ল্যাফার হার্ডি সেজন্যই মনে করেন, শিম্পাঞ্জিদের মত মানুষও যখন বনে জঙ্গলে থাকতো,  মুলতঃ গাছ গাছালিই ছিলো বসতি, তখন আমাদের নারীরাও ছিলো বহুগামী। তারাও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা ভেবে বহু পুরুষের সাথে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ তৈরি করতো, তারাও সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে  ধোঁয়াশা তৈরি করতে চাইতো বেঁচে থাকার এবং নিজ সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজনেই।  কিন্তু অরণ্য পর্বের পরে যখন মানুষ যখন প্রায় চার মিলিয়ন বছর আগে তৃণভূমিতে নেমে আসে, এবং যুগল বন্ধনের মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনে অভ্যস্থ হয়ে যায়, তখন থেকেই নারীর যৌনতাকে অবদমিত করা হয়।  আর ব্যাপারটা আরো ত্বরান্বিত হয় মানুষ যখন পৌঁছোয় কৃষিপর্বে, তখন সম্পদশালী হয়ে ওঠে বিভিন্ন গোত্র। একসময় ওই সম্পদ অধিকারে চলে আসে গোত্রপতিদের; তারা হয়ে ওঠে সম্পদশালী, উদ্ভাবন ঘটে ব্যক্তিগত মালিকানার। সম্পদ যত বাড়তে থাকে পরিবারে নারীদের থেকে গুরুত্ব বাড়তে থাকে পুরুষদের, পুরুষ সৃষ্টি করে পিতৃতন্ত্রের প্রথা, নারী পরিনত হয় পুরুষের সম্পত্তিতে। আগেই আমরা জেনেছি – যেহেতু পিতৃতন্ত্রের মূল লক্ষ্য থাকে ‘সুনিশ্চিত পিতৃত্বে সন্তান উৎপাদন’  সেজন্য, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে জৈবিক এবং সামাজিক কারণেই বহুগামী স্ত্রীকে ‘হুমকি’ হিসেবে দেখা হয়। স্ত্রী বহুগামী হলে তার প্রভাব পড়ে ভূ-স্বামীর জমি জমা,  অর্জিত সম্পত্তিতে, তার সামাজিক পদপর্যাদায়।

সনাতন কৃষিভিত্তিক সমাজে আসলে নারীকে যাচাই করা হয় দুটি  বৈশিষ্টের নিরিখে – এক, নারী তার বাপের বাসা থেকে যৌতুক, দাউরি প্রভৃতি নিয়ে এসে স্বামীর সম্পত্তিতে কতটা মূল্যমান যোগ করতে পারবে, আর দুই, – তার শারীরিক সৌন্দর্য আর শরীর-স্বাস্থ্য (গর্ভ) স্বামী এবং তার পরিবারের বীজ বপন এবং তা বয়ে নিয়ে যাবার  জন্য কতটা উপযুক্ত।  তাই দেখা যায় বহু কৃষিভিত্তিক সমাজে পুরুষের বহুগামিতার ব্যাপারে আইন কানুন শিথিল হলেও নারী বহুগামিতাকে সব সময়ই অধিকতর নিন্দনীয়ভাবে দেখা হয়; এমনকি বহুগামী স্ত্রীকে শারিরীক নিগ্রহ এমনকি হত্যা করা হলেও খারাপ চোখে দেয়া হয় না। উদাহরণ হিসেবে প্রাচীন টাইগ্রিস ইউফ্রেটিস অববাহিকায় গড়ে উঠা কৃষিভিত্তিক সভ্যতা থেকে জানা যায়, সেখানে সাধারণভাবে মনে করা হত নারীরা স্বামীর ‘অনুগামী’ থাকবে, তারা চিরকাল থাকবে স্বামীর সাথে একগামী সম্পর্কে আস্থাশীল।   পুরুষেরা কিন্তু তা নয়। তার ছিলো বহুগামী। আর পুরুষের বহুগামিতাকে ততটা খারাপ চোখে দেখা হত না। দেখা হত মেয়েদেরটাই। যে সসমস্ত স্ত্রীরা স্বামীর অনুগত না থেকে পরকীয়ায় মত্ত হতো, তাদের নাক কেটে ফেলা হত।  চীন জাপান এবং ভারতের অনেক জায়গাতেই পুরুষের পতিতাবৃত্তি, রক্ষিতা রাখা কিংবা গণিকা সম্ভোগ প্রভৃতিকে ‘এডাল্ট্রি’ হিসেবে গন্য করা হয় না, কিন্তু বহু জায়গায় এখনো বহুগামী নারীকে বেত্রাঘাত আর পাথর ছুঁড়ে হত্যার বিধান প্রচলিত আছে।  এমনকি পশ্চিমেও বিংশ শতাব্দীর আগে নারীদের বহুগামিতার  কারণে স্বামীর বা পরিবারের আগ্রাসন থেকে তাকে রক্ষা করার কোন শক্ত রাষ্ট্রীয়  আইন কানুন ছিলো না।  বরং অবাধ্য, বহুগামী আর কামার্ত স্ত্রীকে নিগ্রহ, নির্যাতন আর হত্যাকে পরোক্ষভাবে উদযাপনই করা হতো সামাজিকভাবে।  পরবর্তীকালের নারীবাদী আন্দোলন, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা  এবং মানবিক আইন কানুনের প্রবর্তন নারীদের এই নিগ্রহ থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দিয়েছে।

বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে,  মানব প্রজাতি শতকরা একশ ভাগ একগামিতার জন্য কিংবা শতভাগ বহুগামিতা – কোনটির জন্যই বিবর্তনগত ভাবে অভিযোজ্য হয়নি।  ইতিহাসের পরিক্রমায় আমরা যেমন গরিলাদের মতো হারেম করে চলা আকবর বাদশাহর সন্ধান পাই তেমনি আবার সন্ধান পাই একদ্বারপত্নিক বহু মানুষেরই। এরশাদের মত লুল পুরুষও আবার সমাজে কম নেই। নারীদের ক্ষেত্রেও মহাভারতের দৌপদি থেকে শুরু করে ক্লিওপেট্রা, কিংবা অধুনা ব্রিটনী স্পিয়ার্স, প্যারিস হিল্টন কিংবা লিজ টেলর পর্যন্ত বহুগামী নারীর সন্ধানও খুঁজলেই পাওয়া যাবে, যেমনি পাওয়া যাবে সীতার মত কেবল একস্বামী নিয়ে মত্ত কঠোর অনুরাগী স্ত্রীও। পাওয়া যাবে ছল চাতুরী প্রতারণাপ্রবণ কিংবা কামকাতুরা নারীর দৃষ্টান্তও। সেজন্যই হেলেন ফিশার তাঁর “প্রেমের বিশ্লেষণ” (Anatomy of Love) বই এ লিখেছেন [20] –

‘এমন কোন সাক্ষ্য প্রমাণ নেই যে মেয়েরা যৌনতার ব্যাপারে লাজুক ছিলো কিংবা তারা গোপন যৌন অভিযান এড়িয়ে চলে। বরং পুরুষ ও নারী উভয়েই এক মিশ্র প্রজনন কৌশল প্রদর্শন করে; একগামিতা এবং বহুগামিতা দুটোই আমাদের স্বভাবজাত অভ্যাস’।

গবেষক / লেখকঃ  অভিজিৎ রয় 

তথ্যসূত্র:
[1] D.M. Buss, Human Mating Strategies, Samfundsokonomen, 4, 47-58, 2002.
[2]Bronisław Malinowski, The Sexual Life of Savages in North-Western Melanesia, London, 1929
[3] N. Burley, & R. Symanski. Women without: an evolutionary and cross- cultural perspective on prostitution. In R. Symanski, The immoral landscape. Toronto: Butterworths, 1981.
[4] D. M. Buss, & D. P. Schmitt, Sexual strategies theory: An evolutionary perspective on human mating. Psychological Review, 100, p 204–232,1993.
[5] David Buss, The Evolution Of Desire – Revised 4th Edition, Basic Books , 2003
[6] “The constancy of women’s preferences in both scenarios is consistent with the theory that women see casual mates as potential husbands and thus impose high status for both”, quoted from David Buss, The Evolution Of Desire – Revised 4th Edition, Basic Books , 2003, p 88.
[7] Barbara B. Smuts, Sex and Friendship in Baboons, Harvard University Press, 1999
[8] R. L. Smith, (Ed.) Sperm Competition and the Evolution of Animal Mating Systems. Academic Press, New York. 688 pp, 1984.
[9] B. Smuts, Male aggression against women: An evolutionary perspective. Human Nature 3:1-44,1992.
[10] M.A. Colwell, & L.W. Oring. Extra-pair mating in the spotted sandpiper: A female mate acquisition tactic. Animal Behavior 38:675-684, 1989.
[11] Helen Fisher, Anatomy of Love: A Natural History of Mating, Marriage, and Why We Stray, Ballantine Books 1994
[12] S.W. Gangestad, R. Thornhill, The evolutionary psychology of extra-pair sex: The role of fluctuating asymmetry. Evolution and Human Behavior 18: 69—88, 1997.
[13] “Women choose symetrical men as affair partmers more than asymetrical men” – quoted on Randi Thornhil’s most important finding, (Ref. David Buss, The Evolution Of Desire – Revised 4th Edition, Basic Books , 2003)
[14] R. Thornhill and S.W. Gangestad,  Do women have evolved adaptation for extra-pair copulation? Pp. 341-368 in Evolutionary Aesthetics, K. Grammer and E. Voland, eds. Springer-Verlag, Berlin, Germany, 2003.
[15] Douglas T  Kenrick, Gary E Groth, Melanie R Trost and  Edward K Sadalla, Integrating evolutionary and social exchange perspectives on relationships: Effects of gender, self-appraisal, and involvement level on mate selection criteria, Journal of Personality and Social Psychology, Vol 64(6), Jun 1993, 951-969.
[16] R. R. Baker, , & , M. A. Bellis, Human sperm competition: copulation, masturbation, and infidelity. London: Chapman & Hall,1995.
[17] Sarah Blaffer Hrdy, Empathy, Polyandry, and the Myth of the Coy Female, in Ruth Bleier, ed., Feminist Approaches to Science,  New York: Pergamon, pp. 119-146, 1986
[18] R. R. Baker,  & , M. A. Bellis, Human sperm competition: Ejaculate manipulation by females and a function for the female orgasm, Animal Behavior, 46, 887–909.
[19] মহাভারত, আদিপর্ব, ২১৪ অধ্যায়
[20] Helen Fisher, Anatomy of Love: A Natural History of Mating, Marriage, and Why We Stray, Ballantine Books, 1994