হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা উচিত

আমাদের দেশে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের বিয়ে তাদের শাস্ত্রমতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। হিন্দুধর্মাবলম্বীদের বৃহত্তম দেশ ভারত হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন ও বিচ্ছেদসংক্রান্ত আইন বহু আগেই (১৯৫৫) প্রণীত হয়ে বলব আছে। এমনকি ভারতের একজন বিধবাও দ্বিতীয় দার পরিগ্রহ করতে পারেন। আমাদের দেশে হিন্দু বিবাহবিচ্ছেদ ও বিধবা বিবাহ প্রচলন আইন প্রণীত না হওয়ায় আইনগতভাবে কোনো হিন্দু পুরুষ বা মহিলা বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন না এবং একজন বিধবাও আবার বিয়ে করতে পারেন না। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হলেও সারা জীবন ক্ষেত্রবিশেষে পৃথক বাসস্থানে অবস্থান করতেও বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন না। অনুরূপভাবে একজন যুবতী হিন্দু মহিলা তাঁর স্বামী রোগে-শোকে বা দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করলেও আবার বিয়ে করতে পারেন না। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে প্রণীত হিন্দু বিধবা বিবাহ প্রচলন আইন (১৮৫৬) ভারতে আইন হিসেবে গৃহীত হলেও আমাদের দেশে আদৌ এ ব্যাপারে কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়নি।

হিন্দু নারীদের বিয়েসংক্রান্ত প্রতারণা, বিয়ে-পরবর্তী দালিলিক প্রমাণ সৃষ্টির লক্ষ্যে ও সহজে হিন্দু নারীদের আইনি সুরক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন হিন্দুধর্মাবলম্বীদের জন্য ঐচ্ছিক রেখে ‘হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন-২০১২’ সংসদে পাস করা হয়। বিদেশ ভ্রমণ, অভিবাসন ইত্যাদি ক্ষেত্রেও বিবাহ নিবন্ধন-সম্পর্কিত দালিলিক প্রমাণ একটি অপরিহার্য বিষয়। ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৫ ধারার মাধ্যমে মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক এবং নিবন্ধন না করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মুসলিম শরিয়া আইন অনুসারে মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ ঘটানো যায় এবং বিধবা মুসলিম নারীও আবার বিয়ে করতে পারেন।

কোনো কোনো হিন্দু ধর্মীয় নেতার মতে, হিন্দু বিয়ে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণে সাত পাকে বাঁধা বিধায় এ বিয়ের মাধ্যমে আত্মার সঙ্গে আত্মার, মাংসের সঙ্গে মাংসের ও অস্থিতে অস্থিতে মিলন ঘটায়। বিয়ের নিবন্ধন আইন প্রণীত হলে হিন্দু বিয়ের মূল ভিত্তি নষ্ট হবে বলেও তাঁদের ধারণা। নিবন্ধনের ফলে একজন হিন্দু মহিলার একজন হিন্দু পুরুষের সঙ্গে শুধু সম্পর্ক স্থাপিত হবে, স্বামীর অবর্তমানে স্বামীর পরিবারের কোনো দায়বদ্ধতা থাকবে না—এমনটাই দাবি তাঁদের। অনেকেই এটাকে খোঁড়া যুক্তি হিসেবে উড়িয়ে দিতে চান। তাঁদের বক্তব্য হলো, বিবাহ নিবন্ধন হিন্দু বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-নীতিতে কোনোভাবেই খর্ব করবে না। বিবাহ নিবন্ধনের মাধ্যমে শুধু বিয়ে প্রমাণের জন্য একটি অতিরিক্ত দালিলিক প্রমাণ সৃষ্টি হবে।

আইনের ৬ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘হিন্দু ধর্ম, রীতি-নীতি ও আচার-অনুষ্ঠান অনুযায়ী হিন্দু বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর ওই বিবাহের দালিলিক প্রমাণ সুরক্ষার উদ্দেশ্যে, বিবাহের যেকোনো পক্ষের নির্ধারিত পদ্ধতিতে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধক নির্ধারিত পদ্ধতিতে বিবাহ নিবন্ধন করিবেন।’ অনেক আইনজ্ঞ ও বিশিষ্টজনের মতে, কোনো আইন ঐচ্ছিক হতে পারে না, আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য হলো আইনে বিধিবিধান প্রতিপালনের বাধ্যবাধকতা। তাঁদের মতে, হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হলে সাত পাক ঘোরা ও অন্যান্য আচার পালনে কোনো সমস্যা হবে না। গত ২৩ ডিসেম্বর প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন না থাকার কারণে কাননবালার বিড়ম্বনা তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, ১৭ বছর আগে কাননবালাকে তাঁর দুই সন্তানসহ ফেলে রেখে তাঁর স্বামী চলে যান এবং দ্বিতীয় বিয়ে করেন। গাজীপুরের স্বামী পরিত্যক্ত কাননবালা এখন একজন আশ্রয়হীন ভাসমান নারী। কাননবালার দাবি, তাঁদের বিবাহের নিবন্ধনমূলক কোনো দালিলিক প্রমাণ না থাকায়ই তাঁর স্বামী তাঁকে এবং সন্তানদের অস্বীকার করার শক্তি পেয়েছেন। কাননবালা তাঁর জীবনের ঘটনাপ্রবাহ থেকে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার দাবি তুলেছেন সরকারের কাছে। দেশের আর্থ-সামাজিক ধর্মীয় ও যুগের চাহিদার কারণে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা উচিত বলে মনে করি।