মনের রসায়ন ও বিয়ে

মনস্তত্ত্বের কথা হবে, এদিকে ফ্রয়েডের কথা আসবে না, তা কি হয়? তবে এক্ষেত্রে একটা মজার উদ্ধৃতি দেওয়া যাক! মেয়েদের প্রতি হালকা কটাক্ষ আছে এখানে। আসলে শুধু এই দেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই বিয়ের ব্যাপারটা সমাজের প্রেক্ষিতে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়ে এসেছে। বহু যুগের শিকড়, সুতরাং একবারে তো সবটা উপড়ে ফেলা যাবে না। এই উপমহাদেশে বিয়ের মনস্তত্ত্ব ছেলে এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে অনেকখানিই আলাদা হয়ে গিয়েছে, তার কারণও সেই প্রোথিত মানসিকতা। দু-তিন দশক আগেও সাধারণভাবে বিয়ে মানে একজন পুরুষের সঙ্গিনী প্রয়োজন, যাঁর সঙ্গে সমাজস্বীকৃত শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে, সন্তানধারণে সক্ষম হবেন এবং স্বামীর সঙ্গে যিনি পরিবার পরিজনেরও দেখভাল করবেন। উলটোদিকে একটি মেয়ে বড় হয়, উপযুক্ত স্ত্রী, মা এবং পুত্রবধূ হওয়ার জন্য। মানসিকতার গঠনও হতে থাকে সেরকমই। এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে দেশের একটি বিশেষ অংশ এখন অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে। সমাজের অনেক স্তরে না হলেও মোটামুটি শিক্ষার আলো যেসব অংশে সঠিকভাবে পৌঁছেছে, সেখানে বিয়ের প্রধান স্তম্ভ এখন পারস্পরিক সমঝোতা, বর ও কনের শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক বোঝাপড়া। আমরাও আলোচনা বরং এখান থেকেই শুরু করি।

বিয়ে ও সমাজ

সমাজ শুধু বিয়ে নয়, আরও অনেক সম্পর্কেই হস্তক্ষেপ করে। সমাজ যে কোনও সম্পর্কেরই একটা নিয়ম বেঁধে দিতে চায়। যেমন, স্বামী বা স্ত্রী-র সম্পর্ক, পিতামাতার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক, ভাই ও বোনের সম্পর্ক এবং এরকম আরও নানা সম্পর্কের সমীকরণে একটা মাপকাঠি ঠিক করে দিতে চায় সমাজ। বিয়ে তার ব্যতিক্রম কিছু নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা সমাজের বাঁধা ছকে চলি বলেই সেটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রথমেই মনে রাখা দরকার যে, কোনও সামাজিক চাপ হিসেবে বিয়েতে রাজি হলে মুশকিল। মন থেকে তেমন সায় নেই, এদিকে একটি বিশেষ বয়সে পৌঁছেছি বলে এবং সকলে বলছে বলে আমাকে বিয়ে করে নিতে হবে, এমনটা যেন না হয়। বিয়ে করব বলে যদি মনস্থির করেন, তা হলে কিছুটা পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতা ও কিছুটা মানসিক পরিণতির সাহায্য নিয়ে বুঝে নিতে হবে, বিয়ে করার সঙ্গে-সঙ্গে কী কী জিনিস জীবনের সঙ্গে জুড়তে চলেছে। প্রয়োজন হলে সঙ্গীর সঙ্গে আলোচনা করে নিন। তিনিও বিয়ে করতে পুরোপুরি মানসিকভাবে প্রস্তুত কি না, সেটাও জানা দরকার। বিয়ের পর পরিবারের সঙ্গে থাকবেন, না স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকবেন, সেই প্রস্তুতিও বিয়ের আগে নেওয়াই বোধহয় ভাল। যে কোনও সম্পর্ক তৈরি করা উচিত, তা টিকিয়ে রাখার জন্যই। সেই আত্মবিশ্বাস নিজের আছে কিনা, যাচাই করে দেখা দরকার।

বিয়ের আগের পরিস্থিতি

কেউ ভালবেসে বা দীর্ঘ পরিচিতির পরে বিয়ে করেন, কেউ কমদিনের পরিচয়ে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, বিয়ের আগে অন্যের পরিবারকে কতখানি জেনে নেওয়া দরকার। শারীরিক কারণে কিছু ডাক্তারি পরীক্ষা আজকাল আমরা সকলেই করি। ভবিষ্যতে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে আনার ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন তো আছেই। তা ছাড়াও অন্যের পরিবারের সকলের সঙ্গে মিশলে মনের দিক থেকেও একধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকে। সবসময় যে তা ১০০ শতাংশ বোঝা যায়, তা নয়। কিন্তু আন্দাজ করা যেতে পারে। যাঁরা বিবাহ করবেন বলে স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ধরে নেওয়া যায় যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস ও মনের জোর রয়েছে যে কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতিকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। অনেক কাপলই আছেন, যাঁরা পরস্পরের জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত থাকেন। কিন্তু যাঁদের ক্ষেত্রে দ্বিধা কাজ করে, তাঁরা একবার পরস্পরের পারিবারিক দিকটাও দেখে নিতে পারেন। কতটা মানিয়ে নেওয়া আপনার পক্ষে সম্ভব হবে, তা জানা থাকলে উভয়েরই ভাল।

শারীরিক সম্পর্ক ও বিয়ে

এখনও আমাদের দেশের অধিকাংশ কাপলের ক্ষেত্রে বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ক ঘটে না। ফলে জানা সম্ভব হয় না ফিজ়িক্যাল কম্প্যাটিবিলিটি কীরকম হতে পারে। এটা এমন একটা বিষয় যে, আগে থেকে আলোচনা করেও কোনও লাভ হয় না। ফলে এক্ষেত্রে বিয়ের পরে যদি সব ঠিকঠাক না থাকে, তা হলে বিয়ের সম্পর্ক ভেঙেও যেতে পারে। তবে এই নিয়ে চাপ নেওয়ারও কিছু নেই। দীর্ঘদিনের সম্পর্কে যাঁরা আছেন, তাঁরা এই বিষয়ে নিজেদের বুঝে নিতে পারেন। নতুনদের ক্ষেত্রে কম্প্যাটিবিলিটি ক্লিক না করলে নিজেদের বোঝাপড়ার দিকে নজর দিতে হবে। প্রয়োজন হলে ডাক্তারের পরামর্শও নেওয়া যেতে পারে।

বিয়ে ও লিভ-ইন

বিয়ে ও দীর্ঘদিনের স্থায়ী লিভ-ইন সম্পর্কের খুব বেশি তফাত নেই, কিছু আইনি জটিলতা ছাড়া। কারণ সমাজ ও পরিপার্শ্ব সিরিয়াস সহবাসকেও প্রাধান্য দেয়। সম্পর্ক ভেঙে গেলে দু তরফেই মানসিক ও সামাজিকভাবে একইরকম হ্যাংওভার থেকে যায়। তবে বিয়ের ক্ষেত্রে ডিভোর্সের ব্যাপারটা সবসময় মসৃণ হয় না। লিভইন-এ সেই ‘ঝামেলা’ নেই। তবে আমাদের দেশে এখনও লিভ-ইন কাপল বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন মূলত দুটো কারণে। প্রথমত এখনও বাড়ির লোকেরা দীর্ঘদিনের লিভ-ইন মেনে নিতে পারেন না। একটা চাপ সৃষ্টি করেন। দ্বিতীয়ত লিভ-ইন অবস্থায় সন্তানধারণের ব্যাপারে সমাজ এখনও ততটা প্রস্তুত নয়। সন্তানের পরিচয়কে সামাজিক স্বীকৃতি দিতেও অনেকেই শেষপর্যন্ত বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন।

সবশেষে বলে রাখা ভাল, পুরো আলোচনা করা হয়েছে সাধারণ কিছু পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে। বিয়ে অত্যন্ত ব্যক্তিগত একটি সম্পর্ক। সুতরাং তার মনস্তাত্ত্বিক আলোচনাও ব্যক্তিবিশেষে নির্ভর করে, কেস টু কেসে সেটা আলাদাও হয়ে যায়। তাই নিজেদের সমস্যা দুজন বিবাহযোগ্য মানুষই তাঁদের মানসিক পরিণতি দিয়ে সবচেয়ে ভাল বুঝতে পারবেন। সেইমতোই তাঁদের পরবর্তী পদক্ষেপ সুনিশ্চিত করা প্রয়োজন।