নারী-পুরুষের যৌন অধিকার বনাম বৈষম্যমূলক আইন!

একজন নারী যে কারও সাথে যে কোনও ধরণের যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে।  নারীর এ যৌনতায় আইনে কোথাও কোনও বাঁধা নেই। নারীকে দণ্ড দেওয়ার কোন বিধানও বাংলাদেশের আইনে নেই।  আবার পুরুষের ক্ষেত্রেও যৌন সম্পর্ক স্থাপনে আইনগত কোন বাঁধা নেই। বলা আছে, যে কোন প্রাপ্ত বয়স্ক কুমারী, বিধবা এবং বিবাহ বিচ্ছেদে একা হয়ে যাওয়া নারীর সাথে সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে।  নারী-পুরুষের এ যৌনতায় আইনে বাঁধা নেই কিন্তু সমাজে বাঁধা আছে, ধর্মে বাঁধা আছে, লালিত মনস্তত্ত্ব ও মূল্যবোধে বাঁধা আছে।  সেকারণে, সমাজে যৌনতার চৌর্যবৃত্তি অনেক বেশি। তবে পৃথিবীর অনেক দেশেই নর-নারীর যৌন সম্পর্ক একেবারেই জৈবিক, স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত ব্যাপার। সেখানে যৌনতা মানুষের মানবাধিকার হিসেবে বিবেচিত।

ভারতের সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি এ কে সিক্রি ২০১৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী জিন্দাল গ্লোবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আলোচনা সভায় বলেন মহিলার যৌন অধিকারের অর্থই হল তার পছন্দের পুরুষের সঙ্গে তিনি যৌন মিলন করবেন, তাকে তার স্বামী হতেই হবে, এমন কোনও মানে নেই। তিনি বলেন, একজন মহিলার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে তার গর্ভবতী হওয়ার বিষয়টি। তিনি তার নিজের শরীরের সঙ্গে কী করবেন আর কী করবেন না তা সর্ম্পূণ নির্ভর করছে সেই নারীর ওপর। এটা নারীর শরীর, তাই অধিকারও তারই।

পৃথিবীর সকল দেশেই যৌনতার সীমানা সেখানকার আইন, সামাজিকতা ও সাংস্কৃতিক বোধের দ্বারা নির্ধারিত। তবে সীমানাটি কোথাও বিস্তৃত, কোথাও সংকীর্ণ। যৌনতার ক্ষেত্রে অতি প্রাচীনকাল থেকে গড়ে ওঠা একটি সীমানা হচ্ছে বিয়ে। যৌন সম্পর্ক স্থাপন এবং বিয়ের ক্ষেত্রে বয়স আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মেয়ের বয়স ১৮ আর ছেলের বয়স ২১ আবার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞা থেকে পাই যে, ১৬ বছর বয়স যে কোন মেয়ের বিবাহের জন্য বিবেচনাযোগ্য একটি বয়স। পাশাপাশি ১৬-১৮ বছর বয়সের নারীদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যৌন মিলনকে এ আইন স্বীকৃতি প্রদান করেছে। আমাদের মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট হানিফ সেখ বনাম আছিয়া বেগম মামলা, যা ৫১ ডিএলআরের ১২৯ পৃষ্ঠায় এবং অন্য একটি মামলায়, যা ১৭ বিএলটিএর ২৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে যে, ১৬ বছরের অধিক কোনো মেয়েকে যদি কোনো পুরুষ বিয়ের প্রলোভন দিয়ে যৌনকর্ম করে তা হলে তা ধর্ষণের নামান্তর হবে না।

কোনও পুরুষ যদি ১৪ বছর কিংবা ১৪’র অধিক বয়সের কোনও নারীর সাথে (পারস্পরিক সম্মতিতে) যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে তবে তাকে দণ্ডবিধি অনুযায়ী ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত হতে হবে না। তবে ১৪ বছরের কম বয়সী কোনও নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তাকে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত হতে হবে। কারণ ১৪ বছরের কম বয়সী কোনও নারী যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অনুমতি দিতে পারে না। দণ্ডবিধির ধারা ৩৭৫ অনুযায়ী স্ত্রী ব্যাতিত ১৪ বৎসরের কম বয়স্ক কোনও নারীর সাথে তার সন্মতিক্রমেও যৌনকর্ম করলে তা ধর্ষণ বলে গণ্য হয়।

উপরের দুটি আইন বিশ্লেষণে আমরা যা পাই তাহলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী যৌন সম্পর্ক স্থাপনে সম্মতি দেবার বয়স ১৬ বছর। আর দণ্ডবিধি অনুযায়ী ১৪ বছর বয়স পূর্ণ হলে একটি মেয়ে কোনও পুরুষকে তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য সম্মতি দিতে পারে। অথচ বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুযায়ী নারীর ১৮ বছরের আগে বিয়ে করার অধিকার নেই।

একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনগ্রন্থ সে দেশের সংবিধান। আমাদের সংবিধানের ২৮ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবেন। আবার ২৮ (৪) অনুচ্ছেদ অনুসারে নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য রাষ্ট্র বৈষম্যমূলক বিশেষ বিধান প্রণয়ন করতে পারে। এদিকে ১৮ বছর বয়সী যে কোন নারী পুরুষ সাবালক-সাবলিকা হিসেবে ভোটার তালিকায় নাম উঠছে এবং তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন, নিজের মতামত প্রকাশ করছেন। অথচ জীবন সঙ্গী নির্বাচনে পুরুষের বয়স হতে হচ্ছে ২১ বৎসর।

দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারায় বিয়ের পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য ব্যাভিচারকে দুস্কর্ম এবং অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ আইনে বলা হয়েছে, “কোনও লোক যদি, অপর কোনও নারীর স্বামীর বিনা সম্মতিতে যৌনসঙ্গম করে, এরূপ যৌনসঙ্গম ধর্ষণের অপরাধ না হলে, সে লোক ব্যাভিচার করেছে বলে পরিগণিত হবে। এর জন্য ওই পুরুষকে যেকোনও বর্ণনার কারাদণ্ডে (যার মেয়াদ সাত বছর পর্যন্ত হতে পারে) বা জরিমানা দণ্ডে বা উভয় দণ্ডে শাস্তিযোগ্য হবে। এরূপ ক্ষেত্রে স্ত্রীলোকটির পরকীয়া কিংবা দুষ্কর্মের সহায়তাকারিণী হিসেবে শাস্তিযোগ্য হবে না”।  পরকীয়ার অপরাধ শুধু পুরুষের জন্য, নারীর জন্য নয়।  আবার নারী যদি অবিবাহিতা বা বিধবা হয় তাহলে পুরুষও কোনও শাস্তি পায় না।  কারণ এক্ষেত্রে মামলার বাদী হওয়ার মত কেউ থাকেনা।

তবে মহামান্য লাহোর হাইকোর্ট বলেছেন, অবিবাহিত পুরুষ ও স্ত্রীলোক যদি দীর্ঘদিন ধরে একত্রে বসবাস করে তাহলে বলা যাবে না যে, তারা ব্যাভিচারের অপরাধ করেছে। (পিএলডি ১৯৬২, ৫৫৮)।

দণ্ডবিধি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের মধ্যে বিয়ের বয়স নিয়ে বিরোধ আছে। এ বিরোধের ফলে একটি মেয়েকে নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। যেমন, প্রেমঘটিত কারণে কোনও কিশোরী যদি অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া তার প্রেমিককে বিয়ে করে তবে মেয়ের অভিভাবক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উক্ত প্রেমিক এবং তার অভিভাবকদের বিরুদ্ধে অপহরণ বা ধর্ষণ অথবা উভয় ধরনের মামলা করে এ অজুহাতে যে, তাদের মেয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক। বয়স প্রমাণের জন্য কোনও সনদপত্রের আইনগত বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা ও এর প্রয়োগ নেই বিধায় মেয়ে যদি প্রাপ্তবয়স্কও হয় তবুও এ ধরনের মামলা করার সুযোগ আছে। মামলা হবার পর মেয়েটিকে নিয়ে তার অভিভাবক, পুলিশ এবং তার প্রেমিক পক্ষের লোকজনদের মধ্যে টানাহেঁচড়া শুরু হয়। এর পরিণতিতে মেয়েটিকে প্রায়শঃ নিরাপদ হেফাজতের নামে জেলখানায় যেতে হয়। স্বেচ্ছায় বাল্যবিবাহকারী কিংবা বাল্যবিবাহের শিকার একটি মেয়ে যতকাল প্রাপ্তবয়স্কা না হবে তত কাল তাকে নিরাপত্তা হেফাজতের জন্য জেলে রাখার আদেশ দিতে পারে আদালত। এর ফলে হাজার হাজার মেয়ে দিনের পর দিন জেল খাটছে।  আবার পুরুষের বিয়ে করার অধিকার তৈরি হয় ২১ বছরে। তবে কম বয়সে বিয়ে করলেও ২১ বছর পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত পুরুষকে জেলে থাকতে হয় না। অথচ অল্প বয়সে কোনও মেয়ের বিয়ে হলে যতদিন না তার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয় ততদিন সেই মেয়েটিকে জেলে থাকতে হয়। মানুষ এখানে আইন মানতে চায় না। কিন্তু সমাজ বাস্তবতাকে মানে। ধর্মীয় বিশ্বাস বলছে, তুমি যদি যৌনতা চাও তবে বিয়ে কর। বয়স কোনও বিষয় নয়।  সুরা নিসা বলছে ‘ শিশুরা যখন স্বপ্নে বীর্যপাত করে তখন তাদের শৈশব অতিক্রম করে সাবালকের সীমায় পৌছে যায়।’

আমাদের আইন, রাষ্ট্র, সংবিধান ও সামাজিক আচরণে আজব সব বৈপরীত্য! পৃথিবীর তাবৎ সহানুভূতি ঢেলে দেওয়া হচ্ছে প্রেমিক-প্রেমিকার প্রতি; সাহিত্যে, কলায়, রসবোধে, জীবনের সর্বত্র কিশোর প্রেমকে উপজীব্য করা হচ্ছে; তরুণ মনস্তত্ব ও মূল্যবোধকে প্রেমের প্রতি সহানুভূতিশীল করে গড়ে তোলা হচ্ছে। অথচ নরনারীর প্রেমবোধের বিজ্ঞানকেই অস্বীকার করা হচ্ছে। অবৈজ্ঞানিক ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আইনে মানুষকে বেঁধে ফেলার উপকার ও অপকারের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার জন্য আইনজ্ঞ বিজ্ঞজনদের প্রতি অনুরোধ রইল। সবিশেষ রাষ্ট্রযন্ত্রের সমীপে নিবেদন এই, যে আইন মানবাধিকার রক্ষা করতে পারে না, যে আইন মানুষকে স্বাধীনতা বঞ্চিত করে, যে আইন সংবিধান সমুন্নত রাখতে পারে না, সেই আইন আর যাই হোক নারী-পুরুষের অধিকার ও সুবিধা-অসুবিধা রক্ষা করতে সক্ষম এ কথা বিশ্বাস করার কোনো যৌক্তিক অবকাশ নেই। কাজেই মানবিকতার দিক দিয়ে হলেও এ আইনের শীঘ্রই সংশোধনের প্রয়োজন। খুব অবাক হই, আমরা কীভাবে মানবিকতা ভুলতে বসেছি। একুশ শতকের দোরগোড়ায় যেখানে আমরা তথ্যপ্রযুক্তি থেকে শুরু করে মহাকাশেও পা বাড়িয়েছি, সেখানে আজও নারী-পুরুষের অধিকার, তাদের ইচ্ছাকে বেঁধে রেখে দিয়েছি। যৌনতাকে এখনও আমরা মানবিকতার চোখে দেখি না, এটা খুবই কঠোর বাস্তব।

লেখক: সিরাজ প্রামাণিক
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবীগবেষক ও আইন গ্রন্থ প্রণেতা।  
সুত্রঃ lawyersclubbangladesh

দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবছেন? আইন কি বলে আগে জানুন

জীবনের উত্থান পতনে যদি আবার বিয়ে করার প্রয়োজন হয় তখন কি চাইলেই আপনি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন? উত্তর হচ্ছে, আইন অনুযায়ী এক স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ে করা যাবে না। তবে কারও যদি স্ত্রী বর্তমান থাকাকালে আরেকটি বিয়ে করার প্রয়োজন হয়, তাহলে তাঁকে তাঁর বর্তমান স্ত্রী যে এলাকায় বসবাস করছেন, সেই এলাকার সালিসি পরিষদের কাছে আরেকটি বিয়ে করার অনুমতি চেয়ে আবেদন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাঁকে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ এবং এই বিয়েতে বর্তমান স্ত্রীর সম্মতি রয়েছে কি না, তা উল্লেখ করতে হবে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা পৌরসভার মেয়র দুই পক্ষের প্রতিনিধি নিয়ে সালিসি পরিষদ গঠন করে থাকেন।

সালিসি পরিষদের লিখিত অনুমতি নিয়েই কেবল দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে। সালিসি পরিষদে যদি বর্তমান স্ত্রী অনুমতি প্রদান না করেন, তাহলে কোনোভাবেই দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে না। আবার সালিসি পরিষদকেও নির্দিষ্ট কিছু বিষয় বিবেচনা করে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি প্রদান করতে হবে।

যেমন: ১. বর্তমান স্ত্রীর বন্ধ্যত্ব, ২. শারীরিক মারাত্মক দুর্বলতা, ৩. দাম্পত্যজীবন সম্পর্কিত শারীরিক অযোগ্যতা, ৪. মানসিকভাবে অসুস্থতা ইত্যাদি। কোনো কারণে যদি স্ত্রী পৃথক থাকতে চান বা আলাদা বসবাস করেন সে ক্ষেত্রেও স্ত্রীর অনুমতি নিতে হবে। তবে কোনো কারণে যদি স্ত্রী ঘরে আর না ফেরেন এবং দ্বিতীয়বার বিয়ে করার অনুমতিও প্রদান না করেন, তাহলে আইনসম্মতভাবে তালাক কার্যকর করার পরই পুনরায় বিয়ে করতে হবে।

শাস্তি
যে ব্যক্তি সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করেন, তিনি ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ (৫) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করবেন। আদালতে দোষী প্রমাণিত হলে দোষী ব্যক্তিকে এক বছর পর্যন্ত বিনা শ্রম কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। এ জন্য প্রথম স্ত্রীকে স্বামীর বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রমাণ দেখিয়ে ফৌজদারি আদালতে মামলা করতে হবে। আবার দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছে যদি আগের বিয়ের কথা গোপন করেন তাহলেও দণ্ডবিধি অনুযায়ী কঠিন শাস্তি পেতে হবে।

স্ত্রীকে অধিকারবঞ্চিত করা যাবে না
স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলেও প্রথম স্ত্রী সম্পূর্ণ মোহরানার টাকা দাবি করতে পারেন। স্বামী সম্পূর্ণ মোহরানার টাকা পরিশোধ করতে আইনত বাধ্য। বর্তমান স্ত্রীকে কাবিননামায় তালাকের ক্ষমতা দেওয়া হলে সরাসরি নতুবা আদালতে মামলা করে বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারেন। দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে প্রথম স্ত্রী আলাদা বসবাস করেও ভরণপোষণ পাবেন। কোনোভাবেই স্বামীর ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবেন না। আবার দ্বিতীয় বিয়ে করে ফেললে দ্বিতীয় স্ত্রীকেও তাঁর মোহরানাসহ যাবতীয় আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। উভয় পক্ষের সন্তানসন্ততিকেও প্রাপ্য ভরণপোষণ দিতে হবে। সব সন্তানই ভবিষ্যতে সমানভাবে উত্তরাধিকারীর সব অধিকার লাভ করবে। তবে মনে রাখতে হবে, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে দ্বিতীয় বিয়েটি অবৈধ হয়ে যাবে না। কিন্তু স্বামীকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।

লেখক: শুভ্র সিনহা রায়, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
সুত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো

বিয়ে নিয়ে প্রতারণা! – আইন অধিকার

বিয়ে নিয়েও প্রতারণার ঘটনা ঘটতে দেখা যায়।  অনেক সময় দুজন ছেলেমেয়ে নিজেদের ইচ্ছায় বিয়ে করেন।  বিয়ের কথা পরিবারের কাউকে জানান না।  কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই ছেলে বা মেয়ে বিয়ের কথা গোপন রেখে অন্য কোথাও পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী বিয়ে করে ফেলেন। আবার দেখা যায় দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক কোনো কারণে ভেঙে গেলে কোনো পক্ষ ভুয়া কাবিননামা তৈরি করে স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে দাবি করতে থাকে। আবার এমনও দেখা যায় আদৌ বিয়ে হয়নি অথচ বিয়ে হয়েছে, এ বলে মিথ্যা প্রমাণ দেখিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মতো সংসার করতে থাকেন। মেয়েটিকে আর ভালো না লাগলে কিংবা মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে ছেলেটি বিয়ে অস্বীকার করতে থাকে। এ ধরনের ঘটনাগুলোই বিয়ে-সংক্রান্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।  বিয়ে নিয়ে যদি প্রতারণা বা অন্য কোনো অপরাধ ঘটে তাহলে এর কি কোনো প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ আছে? অবশ্যই আছে। দণ্ডবিধি আইনে বিয়ে-সংক্রান্ত অপরাধের কঠিন শাস্তির বিধান করা হয়েছে।

যে শাস্তি রয়েছেঃ 
দণ্ডবিধির ৪৯৩ ধারা থেকে ৪৯৬ ধারা পর্যন্ত বিয়ে-সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের শাস্তির বিধান আছে, যার অধিকাংশ অপরাধই জামিন অযোগ্য।   ধারা ৪৯৩ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীকে প্রতারণামূলকভাবে আইনসম্মত বিবাহিত বলে বিশ্বাস করান, কিন্তু আদৌ ওই বিয়ে আইনসম্মতভাবে না হয় এবং ওই নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে অপরাধী ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ৪৯৪ ধারায় উল্লেখ আছে, যদি কোনো ব্যক্তি এক স্বামী বা এক স্ত্রী জীবিত থাকা সত্ত্বেও পুনরায় বিয়ে করেন, তাহলে দায়ী ব্যক্তি সাত বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

৪৯৫ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয় বা পরবর্তী বিয়ে করার সময় প্রথম বা আগের বিয়ের তথ্য গোপন রাখেন, তা যদি দ্বিতীয় বিবাহিত ব্যক্তি জানতে পারেন, তাহলে অপরাধী ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। ৪৯৬ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি আইনসম্মত বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা ব্যতীত প্রতারণামূলকভাবে বিয়ে সম্পন্ন করেন, তাহলে অপরাধী সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ ছাড়া কোনো মুসলমান ব্যক্তি ১ম স্ত্রী থাকলে সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া এবং প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করেন, তিনি ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ (৫) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করবেন। অভিযোগে দোষী প্রমাণিত হলে ব্যক্তিকে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

কোথায় কীভাবে আইনের আশ্রয় নিতে হবেঃ 
বিয়ে-সংক্রান্ত অপরাধের জন্য অভিযোগ থানা বা আদালতে গিয়ে চাওয়া যাবে। থানায় এজাহার হিসেবে মামলা দায়ের করতে হবে। যদি মামলা না নিতে চায় তাহলে সরাসরি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গিয়ে সরাসরি মামলা দায়ের করা যাবে। কেউ কেউ থানায় না গিয়ে সরাসরি আদালতে মামলা করে থাকেন। এতে কোনো সমস্যা নেই। আদালতে মামলা করার সময় যথাযথ প্রমাণসহ অভিযোগের স্পষ্ট বর্ণনা দিতে হবে এবং সাক্ষীদের নাম-ঠিকানাও দিতে হবে। আদালত অভিযোগকারীর জবানবন্দি গ্রহণ করে যেকোনো আদেশ দিতে পারেন। অনেক সময় অভিযোগ আমলে না নিয়ে প্রাথমিক তদন্তের জন্য নির্দেশ দিতে পারেন। কেউ যদি স্বামী বা স্ত্রীর পরিচয়ে নিজেদের অন্তরঙ্গ ছবি ফেসবুক বা অন্য কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে অথচ আদৌ কোনো বিয়ে সম্পন্ন হয়নি তাহলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে মামলা করার সুযোগ আছে এবং এ মামলা থানায় করতে হবে। এ ছাড়া ভুয়া কাবিননামা তৈরি করলে জালিয়াতির অভিযোগও আনা যাবে।

যে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবেঃ 
বিয়ে যেভাবেই সম্পন্ন হোক না কেন কাবিননামা কিংবা বিয়ের সব দলিল নিজের কাছে রাখা উচিত। কাবিননামার ওপর কাজির সিল স্বাক্ষর আছে কি না যাচাই করে নিতে হবে এবং কোন কাজির মাধ্যমে বিয়েটি সম্পন্ন হলো তার সঙ্গে যোগাযোগ করে সত্যতা যাচাই করে নেওয়া ভালো। মুসলিম বিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। এটা স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই মনে রাখতে হবে। বর্তমানে হিন্দু বিয়ের নিবন্ধনও ঐচ্ছিক করা হয়েছে। বিয়ের হলফনামা করা থাকলে তাও সংগ্রহে রাখতে হবে।

লেখক: তানজিম আল ইসলাম | আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
সুত্রঃ প্রথম আলো, জুন ০৮, ২০১৬

ভরণপোষণ পাওয়া আপনার অধিকার

তিথির (ছদ্মনাম) বিয়ে হয়েছে প্রায় তিন বছর। এর মধ্যে কোলজুড়ে এসেছে একটি সন্তান। বিয়ের পরই জানা গিয়েছিল স্বামী মাদকাসক্ত। এ থেকে বের করে আনার চেষ্টাও কম করেনি তিথি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। সন্তান জন্মানোর পর স্বামী তিথিকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেন। তিথিকে দেন না কোনো ভরণপোষণ, এমনকি একমাত্র সন্তানের জন্যও কোনো টাকা পাঠান না। তিথি লেখাপড়া তেমন একটা করেননি যে চাকরি করবেন, আবার বাবার বাড়ির আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। এখন কীভাবে তিথি আদায় করবেন নিজের আর সন্তানের ভরণপোষণ। তিথি হয়তো জানেন না, আইন তাঁর ভরণপোষণের অধিকার নিশ্চিত করেছে। মুসলিম আইনে আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা তাঁদের স্ত্রী, সন্তানসন্ততি, মা-বাবা, যাঁরা আর্থিকভাবে অসমর্থ, তাঁদের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।

ভরণপোষণ কারা পাবেন
স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে বিয়ে বর্তমান থাকা অবস্থায় ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার লাভ করেন। ছেলেসন্তান সাবালক না হওয়া পর্যন্ত এবং মেয়েসন্তান বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত বাবার কাছ থেকে ভরণপোষণ লাভ করার অধিকারী। ছেলেসন্তান সাত বছর পর্যন্ত এবং মেয়েসন্তান বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত যদি মায়ের কাছে কিংবা মায়ের মা, অর্থাৎ নানির কাছে থাকে, তবু বাবা তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য।

এ ছাড়া পঙ্গু, অক্ষম, পাগল এবং মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী সাবালক সন্তানও বাবার কাছে ভরণপোষণ পাবে। তবে সন্তান যদি অন্যায়ভাবে বাবার সঙ্গে থাকতে অস্বীকার করে কিংবা যে শিশু তার নিজস্ব সম্পত্তির আয় থেকে নিজের ভরণপোষণ করতে সক্ষম, সে শিশুর ভরণপোষণ দিতে বাবাকে বাধ্য করা যাবে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আলাদাভাবে বসবাস করলেও স্ত্রী স্বামীর কাছে ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার রাখেন। যেমন ১. স্ত্রীকে তাৎক্ষণিক দেনমোহর পরিশোধ না করলে ২. স্বামীর নিষ্ঠুরতার কারণে ৩. স্বামী যদি অভ্যাসগতভাবে খারাপ ব্যবহার করেন ৪. দীর্ঘকাল স্ত্রীর কাছ থেকে স্বামী দূরে থাকলে ৫. অনুমতি ছাড়া স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে।

পরিমাণ
ভরণপোষণের পরিমাণ স্বামী-স্ত্রীর সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সংগতির ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় নিকাহনামায় উল্লেখ থাকে, স্বামী মাসিক কত টাকা ভরণপোষণ হিসেবে দেবেন। সাধারণ অবস্থায় স্বামী তাঁর নিজ গৃহেই স্ত্রী বা স্ত্রীদের খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান দিয়ে থাকেন। আইনসংগত বা যুক্তিযুক্ত কারণে যখন স্ত্রী আলাদা বসবাস করেন, তখন স্বামী নগদ অর্থ দ্বারা ভরণপোষণ জোগাবেন।

তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী কেবল ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ পাবেন। অর্থাৎ, তালাক কার্যকর হওয়ার পর স্ত্রী মাত্র তিন মাসের জন্য ভরণপোষণ পাবেন। তবে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে যে ইদ্দত পালন করতে হয়, সেই সময়ের জন্য স্ত্রী কোনো ভরণপোষণ পাবেন না। গর্ভবতী থাকলে সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত যেহেতু তালাক কার্যকর হয় না, তাই সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে হবে।

আদালতে যাওয়ার আছে অধিকার
আইনসম্মত স্বামী যদি স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ না দেন, তাহলে পারিবারিক আদালতে প্রতিকার চাওয়া যায়। ১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ অনুযায়ী এ অধিকার রয়েছে। সন্তান ও বৃদ্ধ মা-বাবাও আদালতের মাধ্যমে ভরণপোষণ পাওয়ার জন্য মামলা করতে পারেন।

চেয়ারম্যান বা মেয়রের কাছেও আবেদন করা যায়
স্ত্রী খোরপোশ দাবি করে স্বামীর বিরুদ্ধে চেয়ারম্যানের বা মেয়রের কাছে আবেদন করতে পারবেন। আবেদন পাওয়ার পর চেয়ারম্যান বা মেয়র স্ত্রী ও স্বামী উভয় পক্ষের পছন্দমতো একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে সালিসি পরিষদ গঠন করবেন। সালিসি পরিষদ স্ত্রীর দাবির যৌক্তিকতা যাচাই করে ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ করে সিদ্ধান্ত দেবে এবং সেই মোতাবেক একটি প্রত্যয়নপত্র প্রদান করবে।


লেখক: তানজিম আল ইসলাম , আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
প্রথম আলো থেকে সংগ্রহীত