সকালে রুটি-ভাজি, না দুধ-কর্নফ্লেকস?

এক মগ কফি হাতে নিয়ে আয়েশ করে যখনই একজন বসলেন টেলিভিশনের সামনে, তখনই আরেকজন এসে একরকম ছিনিয়ে নিলেন রিমোটটা, তিনি তাঁর পছন্দের অনুষ্ঠান দেখবেন। এক দিন পছন্দের নাটক না দেখলে কী হয়, পরে তো এটি আবার দেখাবেই। কিংবা খেলার স্কোর কি ইন্টারনেট থেকে জেনে নেওয়া যায় না? স্বামীর সকালের নাশতায় রুটি-ভাজি না হলে চলছেই না, কিন্তু স্ত্রী শুরু করেছেন দুধ-কর্নফ্লেকস দিয়ে নাশতার চল। দিনের পর দিন খেতে হবে অপছন্দের খাবার? নাশতার টেবিলে একজন মুখ হাঁড়ি করে খাবার নাড়াচাড়া করছেন, এ দৃশ্যই বা কত দিন সহ্য করা সম্ভব? একসঙ্গে সিনেমা দেখতে যাওয়া হবে, কিন্তু কোনটা? ডিজনির নতুন অ্যানিমেশন সিনেমা, নাকি নতুন জেমস বন্ড? আড়াই ঘণ্টা কি ঝাড়া বসে থাকা সম্ভব সিনেমা হলে শুধু অন্যজনের পছন্দের মূল্য দিতে? ঘুমিয়ে পড়ার সুযোগও তো নেই।

একজন জানালা বন্ধ করে ঘুমাতে পারে না, আর আরেকজন জানালা খোলা রেখে ঘুমাতে পারে না। এই দুজনের বন্ধনই হলো বিয়ে। ঔপন্যাসিক জর্জ বার্নার্ড শ এ কথা বলে দিয়েছেন বহু আগেই। তাহলে ‘জানালা খোলা’ আর ‘জানালা বন্ধ’-এর দল কীভাবে দিনের পর দিন বাস করছে একসঙ্গে? মনোবিজ্ঞানীর মতে, ‘সমঝোতা, অন্যের রুচিকে গ্রহণ করার মানসিকতা, আর ভালোবাসা তো থাকতেই হবে।’

দুই পরিবার, দুই সংস্কৃতি, দুই রকমের বেড়ে ওঠা—এমন দুজন মানুষ যখন বিয়ের বন্ধনে জড়ান, তখন তাঁদের পরস্পরের এই পার্থক্যকেই সম্মান করতেই হবে। বিয়ের আগে থেকেই এর জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখা ভালো। তবে অবশ্যই মনে রাখুন, এটি দুজনের বেলাতেই সত্য। একজন শুধু সমঝোতা, ত্যাগ করেই যাবেন, অন্যজন শুধু উপভোগ করবেন—এমন সম্পর্ক ইতিবাচক হতে পারে না। এমনই মত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মেখলা সরকারের।

মেখলা বলেন, একজনের একতরফা চেষ্টায় হয়তো সাময়িকভাবে সমস্যার সমাধান হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এভাবে দিনের পর দিন চললে দুজনের মাঝে তৈরি হবে বড় ফাঁক। সম্পর্কে কোনো একজনের প্রাধান্য থাকাটা ঠিক নয়, বরং দুজনের মধ্যে থাকা চাই সহযোগিতা ও শ্রদ্ধা। অবশ্যই কখনো কখনো প্রাধান্য দিতে হবে অন্যের পছন্দ, কিন্তু তাই বলে নিজেকে একদম বদলে ফেলাও ভালো নয়।

নিজেদের দাম্পত্যে রুচির তফাতটা বড় হয়ে উঠতে দেন না বলেই জানালেন রাশেদ হাসান (ছদ্মনাম)। ‘পার্থক্য যেমন আছে, তেমনি দুজনের কোনো কোনো জায়গায় মিলও তো আছে। আমি আর আমার স্ত্রী দুজনই বেড়াতে খুব পছন্দ করি। আবার ওর আর আমার পছন্দের খাবার ভিন্ন। যেমন: সে চিতল মাছ মোটেই খায় না, তবে আমার পছন্দ বলে রেঁধে দেয়। আর আমিও খেয়াল রাখি, ঘন ঘন যেন বাড়িতে এই মাছ কেনা না হয়। আবার আমি বুঝি যে বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়গুলোতে আমার আর ওর মতের বড় পার্থক্য আছে, ওর সঙ্গে তাই সচরাচর সাহিত্য, সিনেমা এগুলো নিয়ে আলোচনা করি না। এসব কথা বলার জন্য আমার বন্ধুরা তো আছেই।’ বলেন তিনি।

দুজনের পছন্দ দুই রকম মানে কিন্তু এই নয় যে, কারও রুচি খুব ভালো, অপরজন একবারেই নিম্ন রুচির। ‘স্বামী বা স্ত্রীর কোনো কিছু ভালো না লাগলেও খুব সমালোচনা করা ঠিক নয়। নেতিবাচক কোনো কথা বলার চেয়ে বরং চুপ করে থাকাও ভালো। অথবা একটু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিজের পছন্দ জানাতে পারেন। যেমন: একজন হয়তো বাড়ির পর্দা কিনেছেন, কিন্তু সেটা অন্যজনের পছন্দ হচ্ছে না। সরাসরি এ কথা না বলে বরং বলতে পারেন, দেখতে যেমনই হোক, বেশ ভালো দামে পেয়েছ এটা।’ বলেন মেখলা সরকার।এক জায়গায় হয়তো মিল হচ্ছে না স্বামী-স্ত্রীর, কিন্তু অন্য নানা গুণ হয়তো আছে তাঁর। পরস্পরের কমতিগুলোর দিকে নজর না দিয়ে বরং ইতিবাচক ব্যাপারগুলোকে উপভোগ করতে শিখুন না।

দৈনিক প্রথম আলো হতে সংগ্রহিত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।